প্রথম পর্ব – বোরিং কেস
সিমলা থেকে ঘুরে এসেছি, প্রায় দুইমাস হয়ে গেছে। … শুধুই বাড়িতে বসে রয়েছি। বাবাও কনো কেস নিচ্ছেন না, আর তাই আমারও কনো জায়গায় যাওয়া হচ্ছে না। আসলে বাবাকে সামান্য কেসে কেউ ডাকেন না; উনার সম্বন্ধে ইম্প্রেসানটাই এমন হয়ে গেছে সবার যে, দাসগুপ্তকাকু বা ঘটককাকু কেউই বাবাকে আর সামান্য কেস দিতে চান না। পয়সার চিন্তা নেই, আগের দুই কেসে বাবা যা অর্থ রোজগার করেছেন, তা সমস্ত কেরিয়ার মিলিয়েও নাকি তিনি রোজগার করেন নি, এমনই তাঁর দাবি।
হ্যাঁ, মায়ের সাথে একদিন চা খেতে খেতে বাবা বলছিলেন আমি আড়াল থেকে শুনেছি। তিনি বলছিলেন, মিলি তো পুরো মা লক্ষ্মী হয়ে অবতরণ করেছে আমার প্রফেসানে। ও যেই কেস থেকে আমার সাথে লেগেছে, তবে থেকে আমার খালি উপার্জনই হচ্ছে। কোচির কেসে এক লাখের উপর উপার্জন হয়েছে, আর আশ্রমের কেসে তো ১৬ লাখ টাকা। একটা কেসে ১৬ লাখ টাকা উপার্জন ভাবা যায়!
কথাটা শুনে ভালোও লাগে, একটু গর্বও হয়, তারপর মনে হয়, বাবা এই পারিশ্রমিক ডিসার্ভ করেন। উনি নিজের মুল্যয়ন নিজে করতে পারেন না বলেই, এতো কম টাকায় কাজ করেন উনি। যাইহোক, আপাতত দুই মাস ধরে আমি প্রচণ্ড বোর হচ্ছিলাম। আর বাবা একটা কথা বলেন না, ‘যাহা তোমার মনের মধ্যে চলিবে, তাহাই বাহিরে হইবে’। ঠিক তেমনই হলো।
বাবার কাছে এবার এলো একটা বোরিং কেস। কি! না একটা লেখক মারা গেছেন, সেটার কভারেজ করতে হবে। রহস্যজনক মৃত্যু হতো, তাও মানা যেত, স্বাভাবিক মৃত্যু। দিন সাতেক ধরে বমি পায়খানা হচ্ছিল, ডাক্তার দেখায়নি, তাই মারা গেছেন। … ধুর, মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।
যাই হোক, মজুমদার কাকু এসে বেল বাজিয়ে চা খেয়ে, ১০ হাজার টাকা এডভান্স দিয়ে, আর ওই বোরিং কেসটা বাবার হাতে সঁপে দিয়ে চলে গেলেন। … আমি বাবাকে বললাম – এই কেসটা করবে তুমি! এতে তো কনো তদন্তই নেই!
বাবা হেসে বললেন – চল দেখি, হতেও তো পারে, তদন্তের আছে, কিন্তু তদন্ত হচ্ছে না।
আমি – মানে? … আর যদি থাকেও, তদন্ত না করতে চাইলে, তোমাকে তদন্ত করতে দেবে নাকি?
বাবা – তেমন বুঝলে, মজুমদারকে কনভিন্স করতে হবে। ভাব তো, সবাই যেখানে বলছে সাধারণ মৃত্যু, প্রভাতসন্দেশ যদি ছাপে যে, এটা একটি রহস্যজনক মৃত্যু, তবে পেপারটার সেল কি ভাবে বেড়ে যাবে!
আমি মাথা নেড়ে বললাম – এই কেসের মধ্যে তোমার মনে হয় কিছু রহস্য থাকতে পারে!
বাবা – শীর্ষদা, মানে শীর্ষ দাস একজন প্রখ্যাত লেখক ছিলেন। পর পর তিনবছর বাংলার বেষ্ট সেলার ছিলেন উনি। আর উনার বয়সই বা কতো? ৪৪-৪৫ এর বেশি নয়। … একবার ভেবে দ্যাখ, একটা মানুষ কতটা ফ্রাস্ট্রেটেড হলে তবে ৭ দিন ধরে এমন ভুগেও ডাক্তার না দেখিয়ে থাকেন। … হতেও তো পারে যে, উনি কনো একটা বিশয়ের কারণে, জীবন সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে, জেনেশুনে মৃত্যুকে নিজের কাছে আস্তে দিয়েছিলেন। কি পারে না!
আমি এত খতিয়ে ভাবিনি আসলে। যাই হোক, আশার কিরণ না থাকলে হয়তো বাবাকে বলেই দিতাম, তুমি যাও আমি যাবো না। … কিন্তু বাবা ওই যে আশার কিরণ দেখালেন, তারপরেই সিদ্ধান্ত নিলাম, না যাই বাবার সাথে, কে জানে, হয়তো কিছু ইন্টারেস্টিং রয়েছে। পরে ইন্টারেস্টিং বেরুলে, আমি কেসের প্রথমটা মিশ করে যাবার কারণে, পুরো থ্রিলটাই হারিয়ে ফেলবো। … এমন ভেবে, বাবার সাথে গেলাম।
জায়গাটা পর্ণশ্রী, বেহালা। তাই পৌছাতে আমাদেরকেও বেশ একটু বেহাল হতে হলো। পৌঁছে দেখলাম, লোকসমাগম রয়েছে, বেশ কিছুটা। … সাংবাদিক রয়েছেন, জনা ছয়েক। চৌরাস্তা থানার ওসি রয়েছেন, যদিও চিনতাম না, বাবা কথা বললেন বলে জানলাম। আর দেখলাম, একটা বচসা চলছে। একটু পর্যবেক্ষণ করে জানলাম, শীর্ষবাবুর ছেলেকে কিছু একটা কনভিন্স করার চেষ্টা করছেন, থানার ওসি।
বাবাকে অন্য রিপোর্টাররাও চেনেন, আর দেখলাম বেশ মান্য করেন। তাঁরা বাবার উদ্দেশ্যে বললেন, এই সামান্য কেসে তুমি! কি ব্যাপার!
বাবা হেসে বললেন – মজুমদারের বায়নাক্কা, কিচ্ছু করার নেই।
থানার ওসির সামনে যেতে, মিস্টার গাঙ্গুলি বাবার উদ্দেশ্যে বললেন – আরে বিজয়! … কি সৌভাগ্য, এখন তো তুমি একজন আমাদের কাছে এফিসিয়েন্সির ম্যাসকট হয়ে গেছো। … কিন্তু এখানে? কি ব্যাপার। উনাকে চিনতে নাকি?
বাবা – চিনতাম তো অবশ্যই। … দু-দুবার ইন্টার্ভিউও নিয়েছি আগে। … কিন্তু শেষ একটি বছর ধরে, উনি কেমন যেন একটা গাঢাকা দিয়ে দিয়েছিলেন, তাই না! …যাই হোক, আমি এখানে ফান্ডেড, মানে প্রভাতসন্দেশের মজুমদারের রিপোর্টার হয়ে এসেছি।
ওসি স্যার এবার শীর্ষবাবুর ছেলে, বিশিষ্টকে মাধ্যম করে বাবাকে বললেন – আরে কি করে বোঝাই বলো তো ইনাকে বিজয়! … একা মানুষ, সাতদিন ধরে নাকি ভুগছিলেন, তাই মারা গেছেন। … কিছু কিছু উনার সহকর্মী লেখকের থেকে এই তথ্য জানলাম। কিন্তু এর কনো প্রত্যক্ষদর্শীই তো নেই। … এবার একজন সাক্সেসফুল লেখক, উনার তো শত্রুর, মানে কম্পিটিটারের অভাব নেই। … তাই একটু খতিয়ে দেখতে হবেনা! … বলছি উনাকে পোস্ট মর্টামের কথা, উনি কিছুতেই রাজি হচ্ছেন না!
বাবা – ডাক্তার কি ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন!
ওসি স্যার কিছু বলার আগেই, বিশিষ্টবাবু বললেন – হ্যাঁ, উনি তো সকালে এসেই দিয়ে গেছেন।
বাবা – উনি কি আপনাকে ফোন করেছিলেন? মানে, না হলে আপনি জানলেন কি করে উনি মারা গেছেন! না কি আপনি রোজ আসতেন, বাবার সাথে দেখা করতে?
বিশিষ্ট বাবু বললেন – আমি মাসে একদিনের বেশি আস্তে পারতাম না। আমার প্রাইভেট ফার্মে চাকরি। ওর থেকে বেশি সময় আমি পেতাম না। … কাল সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ বাবার একটা কল এসেছিল, যদিও মিটিংএ ছিলাম, তাই ধরতে পারিনি। … ফোন ব্যাক করলাম তখন রাত্রি ন’টা হবে। ফোন রিং হয়ে গেল, কেউ ধরলেন না। … আজ সকালেও একবার ট্রাই করি, তখনও কলে পাইনি। তাই চাকরির জন্য বেড়িয়ে প্রথম বাবার কাছে আসি। দেখি দরজায় তালা দেওয়া নেই। ভিতরে গিয়ে দেখি বাবা মাটিতে বিছনায় ঠেসান দিয়ে, চোখ উলটে পরে রয়েছেন।
বিশিষ্টবাবু বলতে থাকলেন, আমার হাউজ ফিসিসিয়ানকে ডাকলাম। সে আস্তে বললো, কাল রাত্রেই মৃত্যু হয়ে গেছে, এই ৮টা নাগাদ। … ডেথ সার্টিফিকেটেও তেমনটাই লিখেছেন, এই দেখুন।
এই বলে বাবার হাতে ডেথ সার্টিফিকেটটা ধরিয়ে দিলেন।
বাবা একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, কিন্তু বিশিষ্টবাবু! হয় ডাক্তার আপনার সময় বাঁচানোর চক্করে, নয় নিজের বুদ্ধিতেই মিথ্যে কথা বলেছেন যে!
বিশিষ্ট বাবু – মানে!
বাবা – মানেটা এই যে, শীর্ষদার মৃত্যু বিষক্রিয়ায় হয়েছে। ভালো করে দেখুন গাঙ্গুলিদা, উনার দেহে হাল্কা হাল্কা নীলাভাব এবার প্রকাশ পাচ্ছে। … আর দ্বিতীয়কথা এই যে, উনার মৃত্যু আজকে সকালেই হয়েছে। … এই ঘণ্টা দুই-তিন আগে। … বিষের প্রভাবে মৃত্যু, তাই শরীর তাড়াতাড়ি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। … সরি টু সে, মিস্টার বিশিষ্ট দাস, বাট ইওর ফাদারস্ ডেথ ঈশ নট আ ন্যাচারাল ডেথ।
ওসি, মিস্টার গাঙ্গুলি এবার মরদেহকে একবার ভালো করে নিরীক্ষণ করে দেখে বাবার উদ্দেশ্যে বললেন – বিজয়, ইট মিনস্, আওয়ার ডিপার্টমেন্ট ওয়াজ রাইট। … তুমি যদি ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে হতে, তবে তো ভাই, আচ্ছা আচ্ছা দুধে অফিসারকে ধুল চাটিয়ে দিতে! … আমি এতক্ষণ এখানে রয়েছি, আমার নজরেই আসেনি!
বাবা – সরকারি ডাক্তার দিয়ে প্রথম চেক করিয়ে নাও গাঙ্গুলি। … আমার নজরে যা এসেছে, তাই বললাম। একবার সরকারি ডাক্তার আমার কথাকে সম্মতি দিলে, তবেই পোস্ট মর্টামের চিন্তা করো।
ওসি স্যার কিছু ফোন কল করলেন। প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলো, তারপর একটি মেডিকাল টিম এলো। বাবা মুখটা একটু বেজার করেই বললেন – বললাম, আগে ডাক্তার দেখিয়ে নিতে, সোজা ফরেনসিক টিম নিয়ে হাজির!
তবে ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন। এই ফরেনসিক টিমে, বাবার একজন গুনমুগ্ধ ফ্যান ছিলেন। উনার নাম ডক্টর প্রতিভা সিং। বয়স বেশি হবে না, এই আমাদের থেকে বছর ৬একের বড় হবেন। উনিই ফরেনসিক টিমটার নেতৃত্ব করছিলেন। বাবাকে দেখেই উনি চিনতে পেরে সামনে এসে, নিজের মাস্কটা সরিয়ে হিন্দিতে বললেন – স্যার! … স্যার বিজয় সিন হে না আপ!
বাবা ভ্রুটা কুঁচকে বললেন – স্যার! … আমায় আবার কবে নাইট উপাধি দেওয়া হলো!
মিশ সিং হেসে বাংলা হিন্দি মিশিয়ে বললেন – স্যার, এখন তো ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট, ফরেনসিক, সারে জায়গা পে, আপনার হি চর্চা হচ্ছে। আমি পার্সোনালি স্যার, আপনার কাজ করার তারিখা দেখকে, যাকে বলে ইয়ে স্পেলবাউন্ড। …
ওসি স্যার মাঝে একটু গদগদ হয়ে বলে উঠলেন – আরে বিজয়ই তো প্রথম বলল, কেসটা নর্মাল ডেথ নয়। … হাই, আমি চৌরাস্তা থানার ওসি, অখিলেশ গাঙ্গুলি।
মিস সিং একটা মুচকি হেসে, সরকারি ডাক্তারের দিকে তাকালেন। সরকারি ডাক্তার দেখে বললেন, মিস্টার গাঙ্গুলি, ইউ আর রাইট। হি হ্যাজ বিন পয়েজেনড্। আর হ্যাঁ, ওর মৃত্যু আজ সকাল ৭টার দিকে হয়েছে।
বিশিষ্ট বাবু, এখানে এতক্ষণ কি যে হচ্ছিল, সেই নিয়ে বেশ চাপে ছিলেন। … এবার হতবম্ব হয়ে গিয়ে বললেন – বাবাকে বিষ দেওয়া হয়েছে! … কে দেবে! কেন দেবে! … বাবার তো কনো শত্রু নেই। বাবার স্বভাবই শত্রুতা করা নয়। … তবে?
বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। আর এবার ওসি গাঙ্গুলি স্যার বললেন – তাহলে মিস্টার দাস, এবার তো পোস্ট মর্টাম করতে দেবেন, কি দেবেন তো?
বিশিষ্ট বাবু একটু সকড্ ছিলেন। সেই ভাবেই বললেন – হ্যাঁ, সে তো করতেই হবে। কিন্তু কে?
ফরেনসিক ডিপার্টমেন্ট নিজেদের সমস্ত স্যাম্পেল কালেক্ট করে নিয়ে চলে গেলেন, বিভিন্ন স্থান থেকে। বাবাকেও দেখলাম, ফরেনসিকের সাথে পিছনে পিছনে ঘুরছিলেন। কি কালেক্ট করছেন, শুধুই দেখছেন। একটিও প্রশ্ন করছেন না।
শুধু সমস্ত স্যাম্পেল কালেক্ট করার পরে বললেন ওই মিশ সিংকে – আচ্ছা ম্যাডাম, আপনাদের তো সমস্ত স্যাম্পেল কালেক্ট করা হয়ে গেছে। এবার আমি কি কিছু দেখতে পারি এখানে! …
মিশ সিংকে কিছু বলতে না দিয়ে, গাঙ্গুলি স্যার বললেন – বিজয়, তুমি যেকোনো সময়ে এসেই, এখানে নিজের কাজ করতে পারো, আই গিভ ইউ ডা পারমিশন। বাট হ্যাঁ, যখন আসবে, আর যখন বেরুবে, তখন আমাকে একটা করে হয়াটস্অ্যাপ মেসেজ দিয়ে রাখবে। জাস্ট ফর ফর্মালিটি।
মিশ সিং এবার বাবার কাছে এসে আবার নিজের মাস্ক খুলে বললেন – স্যার, আপনার সাথে এককাপ কফি পি শাকতে হে! … নেহি মাতলাব। আপ কো ইতনা পাস সে দেখ রাহা হু, তো যদি একটু আলাপ করে রাখতে পারতাম। …
বাবা হেসে বললেন – মিট মাই ডটার অ্যান্ড মাই এসিস্ট্যান্ট, মিলি। … আপনি তো এখন ডিউটিতে। টাইম আর প্লেস বলুন। … ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, আপনি আমার বাড়িতেও অফিস শেষে চলে আস্তে পারেন। … আমার পেশার অন্তরালে আরো এক কারিগর আছেন, আমার স্ত্রী। তাঁর সাথেও আলাপ করে নিতে পারবেন, আর কফিটাও হয়ে যাবে।
মিশ সিংকে দেখলাম, খুব উত্তেজিত। বাবার কাছ থেকে ফোন নম্বর নিলেন। বাবাও উনার ফোন নম্বর শেভ করে নিলেন নিজের ফোনে। … সেদিনই সন্ধ্যাবেলায় আসবেন, এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেন। আর শেষে, বডিটা পোস্ট মর্টামে পাঠানোর পুরো ব্যবস্থা করে দিলেন।
সেদিন সন্ধ্যাবেলায়, আমাদের বেলেঘাটার বাড়িতে এক নয়, দুই-দুইটি অতিথির আগমন ঘটে। এঁদের মধ্যে একজন অবশ্যই মিশ সিং, যিনি পরবর্তীতে আমার খুব কাছের বন্ধু হয়ে ওঠেন, এখনও আছেন। তবে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় অতিথি। প্রথম অতিথি ছিলেন মিস্টার দাস, অর্থাৎ মিস্টার বিশিষ্ট দাস।
দরজা খুললেন মা। আসলে মা ভেবেছিলেন, মিশ সিং এসেছেন। … বাবাকে কতবার মা বলেছেন, একটা আইহোল লাগাতে। বাবার আর সেটা লাগিয়ে দেওয়ার সময় হয়না। মা সেইদিনই রাত্রে বাবাকে বিরক্ত হয়ে বলছিলেন, এমন সমস্ত ব্যাপারে ডিলে করো না, যেন মনে হয়, কারিগর নয়, তুমি নিজেও আইহোলটা লাগাবে। … কাজ হয়েছিল, মায়ের কথাতে। পরের দিন সকালেই কাঠের লোক এসে, আইহল লাগিয়ে দিয়ে যান।
কিন্তু সেই দিন তো আইহোল ছিলনা। তাই মা-ই মিস্টার বিশিষ্ট দাসকে দরজা খুলে দিলেন। মা স্বাভাবিক ভাবেই তাঁকে চিনতে পারেন নি। তাই বাবা এগিয়ে গেছিলেন। একদেখায় বাবা চিনতে পেরে, নিজে থেকেই বললেন – আসুন মিস্টার দাস। ভিতরে আসুন।
মা বুঝতে পারলেন, বাবার ক্লায়েন্ট। তাই চা চাপাতে চলে গেলেন। বাবার সামনের বড় সোফায় বসলেন মিস্টার দাস, আর আমি আর বাবা, সোফার দুটি সিঙ্গেল চেয়ারে বসলাম। কথা পারলেন, বিশিষ্ট বাবুই।
বিশিষ্টবাবু – ওসি গাঙ্গুলিবাবুর থেকে আপনার নাম, এড্রেস আর আপনার বিশয়ে জেনে এসেছি। … আমি চাই, আপনি আমার বাবার কেসটা হ্যান্ডেল করুন।
বাবা – আপনার ডাক্তারকি আপনারই কথা মত, কনোরকম পরীক্ষা না করেই, ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে দিলেন?
বিশিষ্টবাবু – পুরোটা আমার কথায় নয়। … প্রথমে উনিই বললেন, যে বাবা আর নেই, তারপর বললেন, শরীর যেই ভাবে ঠাণ্ডা হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে, উনি রাত্রেই মারা গেছেন। … আমি তারপর উনাকে বলি, আমি রাত্রে আর সকালে ফোন করেছি, কেউ ওঠায়নি। … তারপর আমি জিজ্ঞেস করি, কি হয়েছিল। উনি বললেন, ভুগছিলেন তো উনি বেশ কিছুদিন ধরে। ডাক্তার দেখান নি নাকি! … আমি বললাম, এই ব্যাপারে আমি তো কিছু জানিই না! … তো উনি বললেন স্বভাবিক মৃত্যু। তাই আমি বললাম, ডেথ সার্টিফিকেট করে দিতে, যাতে ফালতু ঝামেলা না হয়, আর আমাকে অফিস থেকে ছুটি নিতে না হয়। তাই উনি করেন। এতে উনার কনো দোষ নেই স্যার। … আর আমিও যদি জানতাম যে স্বভাবিক মৃত্যু নয়, তবে আমি নিজেই পুলিশ ডাকতাম।
বাবা একটা গম্ভীর মুখ করে বললেন – ডাক্তারের সাথে একবার তো দেখা করতেই হয়। … একটা ডাক্তার হয়ে, উনি কি করে বুঝলেন না যে এটি বিষক্রিয়া! … এনি অয়েজ। এবার আমাকে আপনার বাবার ব্যাপারে কিছু বলুন।
বিশিষ্টবাবু – স্যার, আমার বাবা বরাবরই একটু চুপচাপ। কম কথা বলেন। মায়ের দেহান্ত হয়েছে পাঁচ বছর আগে। তারপর থেকে বাবা সম্পূর্ণ ভাবেই চুপ হয়ে গেছিলেন। … আমি সপ্তাহে একবার যেতাম বাবার কাছে। তবে ইদানীং, মানে মাস চারেক আগে, আমাকে একটা কেম্পেনের চিফ করে দেওয়ায় অত্যন্ত কাজের চাপ বেড়ে গেছে। তাই মাসে একদিনের বেশি সময় করতে পারতাম না।
মা চা-বিস্কুট, আর মিষ্টি-জল দিতে, ভদ্রলোক একটু জল খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে বলতে থাকলেন। … বাবার আগের বই পাবলিশ হয়েছে অক্টোবরে, পুজোর ঠিক আগে আগে। গল্পের নাম ছিল … কি যেন!
বাবা – বঙ্গে দুর্গাপূজার প্রবর্তন।
ভদ্রলোক চোখ উঠিয়ে বললেন – হ্যাঁ, হ্যাঁ। … আসলে বইটই একদমই পড়া হয়না। … সেই বইটা এবারে বইমেলাতে মার্কেটিং করে, দিশা পাবলিকেশন। দিশা থেকে প্রতিবারই আমাকেও যেতে বলে। এবারেও বলেছিল। বাবা প্রতিদিন থাকেন বইমেলার সময়টাতে। আমি এবারে একদিনই কনোভাবে যেতে পেরছিলাম। … বইমেলা ঘুরিও নি। শুধু দিশা পাবলিকেশনের স্টলেই গেছিলাম। উনারা আমার খাতিরযত্ন ভালোই করলেন। আসলে বাবার থেকে ওরা কম ব্যাবসা করেছে! … কিন্তু বাবা ছিলেন না।
এবার চায়ে একচুমুক দিয়ে, হাতে কাপের ডিশ সমেত কাপ ধরে বললেন – আমি প্রশ্ন করেছিলাম বাবা নেই কিনা। উনারা বললেন, হ্যাঁ আসলে উনি একটা বইয়ের কাজে খুব ব্যস্ত। তাই একদিনই মাত্র এসেছিলেন। বুঝলাম যে সেই বইটারও পাবলিকেশন হাউজ ওরাই হবে, তাই এতো আগ্রহ ওদের। আর সত্যি জানেন, বাবা যেন অক্টোবরের পর থেকে কেমন একটা একঘরে করে নিয়েছেন নিজেকে। কোথাও যাননা, কারুর সাথে বিশেষ যোগাযোগও রাখেন না। …
বাবা – উনার কনো কো-রাইটারের সাথে আপনার যোগাযোগ আছে!
বিশিষ্টবাবু – উমম্, তেমন তিন চার জন আছেন। … মানে, আমি ভুলেই গেছিলাম। আজকে বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে আমাকে ফোন করেন তাঁরা। তাই মনে পরে। সুন্দর স্যন্যাল আছেন, পবিত্র দাসগুপ্ত আছেন, আর আছেন ভবানী দেবী। … ইনারা আমাকে আজ দুপুরে ফোন করে বাবার মৃত্যুর জন্য শোক জ্ঞাপন করার সময়ে বলেন, শেষ এক সপ্তাহ ধরে বাবা নাকি অসুস্থ ছিলেন। আর বাবার সাথে শেষ উনাদের কথা হয় তিনদিন আগে। সেদিন তিনি বলেন, তাঁর এই শরীরের অবস্থায়, তাঁর সেবা করার জন্য ঈশ্বর নাকি কারুকে পাঠিয়ে দিয়েছেন। … তবে, তেমন কারুর তো কনো দেখাসাখ্যাত পেলাম না। হয়তো বাবারই মনের ভুল হবে!
বাবা – ঠিক আছে। আপনি আজকে আসুন। আপনার ফোন নম্বর আর এড্রেসটা দিয়ে যান। … আপনার অফিসেরটাও দেবেন। খুব আর্জেন্ট হলে, আপনাকে এমনি ফোনে নাও পেতে পারি। তখন আপনার অফিসের নম্বরে ডায়াল করে নেব।
বিশিষ্টবাবু – স্যার, আপনার ফিজটা কতো। … আর কতো অগ্রিম দেব?
বাবা – ফিজ! … আমি তো কনো প্রফেশনাল টিকটিকি নই দাদা। … তাই আমার ফিজ কি করে থাকতে পারে! … রিপোর্টার আমি। … সেই সূত্রে দুচারটে কেস আমার হাত দিয়ে সল্ভড্ হয়ে যায়। যখন হয়ে যায়, তখন কেসটাতে যার ইন্টারেস্ট ছিল, সে খুশী হয়ে যা দেয়, সেটাই আমার উপার্জন।
বিশিষ্টবাবু এবার ব্যাগ থেকে একটা খাম বারকরে বললেন – এতে একটা ৫০০টাকার বান্ডেল আছে। কেস শেষ হলে, আপনি বলবেন, আর কত দেব।
বাবা টাকাটা নিতে একটু ইতস্তত করছিলেন। তাই আমি সেই টাকাটার দিকে হাত বারিয়ে বললাম – আমি উনার এসিস্ট্যেন্ট। আমায় দিন টাকাটা। উনি আমার হাতে দিয়ে দিলেন। বাবা যে আমার এই কীর্তিতে খুব খুশী হয়েছিলেন, তা নয়, তবে মা খুশী হয়েছিলেন।
বিশিষ্টবাবু চলে গেলে, মা-ই সেই ব্যাপারে কথা পারলেন – সবাই টাকার কথা আগে বলে। আর তোমাকে টাকা দিতে এলেও নাও না! … ফ্রি সার্ভিস দাও না গিয়ে। … সংসার চালাবেও কি ফ্রি সার্ভিসিং দিয়েই!
বাবা একটা গভীর নিশ্বাস ছেরে বললেন – মধু, সমস্ত ব্যাপারকে একটু খতিয়ে দেখতে শেখো এবার। একটা লেখকও একটা রিপোর্টারের মত, অনেক সময়েই কনো সত্য উদ্ঘাটনে নেমে পরেন। যদি এমন দেখা যায় কেস সল্ভ করার সময়ে যে, যেই সত্যকে উনি উদ্ঘাটন করতে যাচ্ছিলেন, সেই সত্যকে আমিও প্রকাশ করতে পারবো না। … তখন! … তখন এতো পয়সা নিয়ে, আমি কি উত্তর দেব? আসামি ফসকে গেছে, তাই বলবো? …
আমার দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন – যতক্ষণ না কেসের সমাধান হচ্ছে, ততক্ষণ ওই টাকার খামটা যত্ন করে তুলে রেখে দিবি। … সমাধান হয়ে গেলে, তারপর মায়ের হাতে তুলে দিবি।
আমি আজ্ঞা পালন করতে, আমার আলমারিতে টাকাটা ঢুকিয়ে রাখলাম। সেটা রেখে ফিরে আস্তে যাবো, তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠতে, আমি এগিয়ে গিয়ে দরজাটা খুললাম। সামনে দেখলাম, একটা ফরসা লম্বা আর একটু রোগাটে চেহারার একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখের দিখে তাকাতে বুঝলাম, মিশ সিং। সকালে গ্রাউন পরে ছিলেন, তাই এখন দেখে চিনতে পারিনি। ভিতরে নিয়ে এনে বসালাম সোফায়।
বাবাই প্রথম কথা বললেন – ডাইরেক্ট অফিস থেকে?
মিশ সিং – না স্যার, বাড়ি গিয়ে ফ্রেস হয়ে এসেছি। … আসলে মরার শরীর নিয়ে ঘাটাঘাটি তো। তাই ওই ড্রেসে কোথাও যাইনা; জীবাণু প্রচুর থাকে। …
বাবা এবার মায়ের দিকে ঈসারা করে প্রতিভা সিংকে বললেন – উনি আমার স্ত্রী, এবং আমার সমস্ত কাজের নেপথ্যে থাকা কারিগর, মাধবি সিংহ। … আর মাধবি, উনি হলেন ফরেনসিক অফিসার, মিশ প্রতিভা সিং। … শীর্ষবাবুর কেসটা উনিই হ্যান্ডেল করছেন, মানে মেডিকাল দিকটা।
মাকে দেখলাম মিষ্টি করেই আলাপ করলেন, যেমন তিনি সব সময়ে করেন। কিন্তু আমার মনের মধ্যে একটা কথা বারবার আসছিল। … এমন অনেকেই বাবার সাথে আলাপ করেন, কিন্তু বাবা তো কারুকে বাড়িতে আস্তে বলেন না! … এই মেয়েকে আস্তে বললেন কেন? … এতটা গুরুত্ব তো বাবা কনো মেয়েকে দেন না!
