ষষ্ঠম পর্ব – ধুয়াশা
সেখানে যাওয়া একরকম কেন পুরপুরিই সার্থক। মলয় ভদ্র সরাসরি বলে দিলেন, তিনি শুধু জানতেন যে অনিকের আমেরিকাতে কনো প্রেমিকা হয়েছিল, যে ওকে ধোঁকা দিয়েছিল, কিন্তু সেই মেয়েকে কোনদিনও দেখেননি উনি।
সেই কথা শুনে আমরা অথৈজলে পরে গেছিলাম, কিন্তু উনার স্ত্রী সুনয়না ভদ্র বললেন, “উনি অনিকের থেকে জেনেছেন সেই মেয়ের ব্যাপারে। … তবে তিন জনের মধ্যে কোন মেয়েটি সেই মেয়ে, সেই ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। …
উনার কথা অনুসারে, তিনটি মেয়ের সাথে অনিক খুব ঘনিষ্ঠ ছিল, একজন মনিকা যে আমেরিকাতেই থাকে এখনো, একজন মহিমা এবং একজন রিম্পি। রিম্পি আর মহিমার এড্রেস তো উনি দিতে পারলেন না, তবে উনি বললেন, একজন সাউথ সিটিতে থাকে, আর অন্যজন নিউটাউনে রোহরা হাইটসে থাকে। অন্যদিকে মলয় ভদ্র বললেন, এই দুইজনের মধ্যেই কেউ হবে, কারণ আমেরিকা থেকে ওঁর গার্লফ্রেন্ড, তাঁদের এখানে আসার প্রায় দেড় বছর আগেই ফিরে এসেছেন।
যথেষ্ট তথ্যই পেয়েছি বলে আমাদের দুইজনেরই মনে হলো। বাবা রথিনকাকার সাহায্য নিয়ে রিম্পি আর মহিমার পুরো ডিটেলস বার করে নিলেন আমরা বালি থেকে হাওড়া আসার আগেই। তাই হাওড়া এসেই, আমরা উনাদের কন্ট্যাক্ত করে, উনাদের বাড়িতে একে একে চলে গেলাম। কিন্তু আমাদের আশার বারাভাতে ছাই পরে গেল। কারণ এই দুইজনেই যা বলল, তা আমাদেরকে পুরো গুলিয়ে দিল।
প্রথম আমরা গেছিলাম মহিমার কাছে, সে থাকে সাউথ সিটির একটা লাকজুরিয়াস এপার্টমেন্টএ। মহিমা সিংহরায় তাঁর পুরো নাম। সে বলল, অনিক খুবই ব্রিলিয়ান্ট ছেলে ছিল, আর ওঁর ক্লাসমেট ছিল। আমেরিকাতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছিল, তারপরে কি যে এক মেয়ের খপ্পরে পরলো, সেই মেয়ের সাথে এতটাই ঘনিষ্ঠ হয়ে গেল যে, পড়াশুনা আর হোলই না ওঁর দ্বারা। আমরা বললাম, সেই গার্লফ্রেন্ডের নাম কি রিম্পি!
মহিমা উত্তরে বলল – না না রিম্পি তো ওঁর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বন্ধু। … ও এখন নিউটাউনে থাকে। বিয়ে করেছে সে, একটা সন্তানও আছে। … অনিক এতটাই ভালোছিল পড়াশুনাতে যে, রিম্পি ওঁর ব্যাচমেট হওয়া সত্ত্বেও, অনিকের কাছেই পড়তো।… আমিও ওঁর ব্যাচমেট ছিলাম, একাধিকবার কেন, বেশির ভাগ সময়ে আমরা একসঙ্গেই যেতাম অনিকের কাছে পড়তে; অনেক সময়ে আমরা কলেজের লনেও পড়েছি।
বাবা বললেন – আপনি ওঁর গার্লফ্রেন্ডকে কনোদিন দেখেন নি!
মহিমা – না, ওঁর দাদা নাইট জব করতো, আর সেই মহিলা ওঁর কাছে এই রাত্রিতেই আসতো, আর ওঁর সাথে ও শারীরিক ভাবে এতটাই ইন্টিমেট হয়ে গেছিল যে, সেটাই ওঁর কাছে নেশা হয়ে যায়, আর পড়াশুনা থেকে মন উঠে যায়। … আমরা কেউই ওঁর গার্লফ্রেন্ডকে দেখিনি, তবে আমরা ওকে বোঝাতাম যাতে, ও সেই মহিলার থেকে সরে আসে, কারণ সেই মহিলা ওঁর কেরিয়ার শেষ করে দিচ্ছে।
বাবা – নাম জানেন না সেই মহিলার?
মহিমা – সুনা বলে ডাকতো অনিক।
বাবা – দেশে ফিরে এসেছেন কবে?
মহিমা – এই তিন বছর হলো। এসেই আমরা প্রথম অনিকের সাথে দেখা করেছিলাম। ওঁর দাদা আসলে প্রচুর টাকা কামায়, তাই ওঁর কেরিয়ার শেষ হতেও ও পথে বসে গেল না। আমার ক্ষেত্রে এমন হলে, আমি শেষ হয়ে যেতাম।
বাবা আর আমি সেখান থেকে এবার নিউটাউন যাই। নিউটাউনে গিয়েও যেমন মহিমা বলল, তেমনই একটা গল্প শুনলাম, তবে আরো কিছু যোগ হয়েছিল। রিম্পি বললেন, তিনি বড়লোক বাপের মেয়ে, তাই বিদেশে পড়তে চলে গেছিলেন। অনিক মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজে অসাধারণ। সে না থাকলে, মহিমা হয়তো পড়া শেষ করতে পারতো, কিন্তু তাঁর কনসেপ্টই বসিয়েছে অনিক।
বাবা বললেন – আপনারা দেশে ফিরেও ওঁর সাথে যোগাযোগ করেছিলেন?
রিম্পি – অনিকের সাথে দেখা করার জন্য ঠিক যাইনি। অনিকের বোন তনুশ্রী, অদ্ভুত গান গায় ও, আর তেমন সুন্দর ছবি আঁকে। আর শুধু তাই নয়, উচ্চদর্শনও মেয়েটার। … আমাদের খুব কাছের একজন। অনিকের গার্লফ্রেন্ড ওকে ছেড়ে, আমেরিকা ছেড়ে চলে যাবার পর, প্রায় এক বছর অনিকের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে, ওঁর দাদা, ওকে আর ওঁর বোন তনুশ্রীকে নিয়ে দেশে ফিরে আসে। … তারপর আমরা প্রায় এক বছর ওখানে ছিলাম, আর ফিরে এসে অনিকের সাথেও দেখা করতে যাই, আর বিশেষ করে ওঁর বোনের সাথে।
বাবা – সুনা নামছিল না মেয়েটির?
রিম্পি – ওই নামে অনিক ডাকতো। আমরা কনোদিনই তেমন ইন্টারেস্ট দেখাইনি। … ও নিজে থেকেই আমাদের যা বলতো, তা শুনতে হতো, কারণ আমরা ওঁর থেকে মেশিন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখতাম। … ওই মেয়ের সাথে অনিকের অতিরিক্ত শারীরিক সম্বন্ধ হতো, আর সেটাই বোধহয় নেশা হয়ে যায় অনিকের কাছে।
বাবা – আচ্ছা সেই মহিলাও কি স্টুডেন্ট ছিলেন?
রিম্পি – না না, অনিকের থেকে বড়। কনো একটা পেস্টিসাইড কোম্পানিতে চাকরি করতো। … দাঁড়ান, ওঁর হাতের একটা ছবি আছে … মানে অনিক আমাদেরকে দিয়েছিল ছবিটা, আর বলে চলেছিল, ত্বক দেখ না। … ত্বক দেখলেই প্রেমে পরে যাবি। … দাঁড়ান একটু দাঁড়ান, একটু খুঁজতে দিন। অনেক দিন আগের ছবি তো। … ফোন পালটাইনি, তাই থাকার তো কথা। …
বেশ খানিকক্ষণ ফোন নিয়ে ঘাটাঘাটি করে, শেষে বলে উঠলেন – এইতো পেয়েছি… অনিকের মুখ আর সেই মেয়ের হাত। … ব্যাস, এর থেকে বেশি কিছু জানিনা আমি। বাবা ছবিটা নিয়ে নিলেন। আমরা ফিরেই আসছিলাম, তখন বাবা আবার লিফটের কাছ থেকে ফিরে গিয়ে বললেন, “সুনয়না ভদ্র বলে কারুকে চেনেন বা চিনতেন?”
রিম্পি দুইচারবার মুখে করে আওরালো, সুনয়না! … ভদ্র! … না এমন কারুর নাম তো আমি জানিনা! … কে বলুন তো, মানে আমার কি জানা উচিত ছিল ইনাকে?
বাবা – হুম তেমনই একটা, কারণ তিনি আপনাদের চেনেন। আপনাদের নাম আমি তাঁর থেকেই জানি, মলয় ভদ্রের স্ত্রী।
রিম্পি বললেন – না তো, আমরা অনিকের দাদার নামটাই খালি জানি। যতবার অনিকের বাড়ি গেছি, ততবার উনাকে খালি ঘুমোতেই শুনেছি। দেখিনি কনোদিন, পাসের রুমের দরজা বন্ধ করে উনি ঘুমাতেন, কারণ রাত্রে উনার জব ছিল।
বাবা – আর অনিকের গার্লফ্রেন্ডকে আপনারা কেউ কনোদিন দেখেন নি! কি কাজ করতেন উনি!
রিম্পি – কনো একটা গাছে দেওয়ার পেস্টিসাইড কোম্পানিতে কাজ করতেন উনি। রাত্রে, অনিকের দাদা চলে গেলচ উনি আসতেন। পরমা সুন্দরী নাকি, তনুশ্রীর মুখে শুনেছি, কারণ অনিক ছাড়া একমাত্র তনুশ্রীই তাঁকে দেখেছে। তনুশ্রীর সাথে আলাপও ছিল।
বাবা – কোম্পানিতে কি কাজ করতেন জানেন?
রিম্পি – না জানিনা (হেসে বললেন) অনিক নিজেও জানতো কিনা আমার সন্দেহ।
বাবাও একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন – অনিকের চরিত্র কেমন ছিল? আর ওঁর বোনের সাথে ওঁর সম্পর্ক কেমন ছিল?
রিম্পি – ওঁর গার্ল ফ্রেন্ড ছাড়া, সকলের সাথে অনিক খুব সুন্দর ভাবে মিশত, মানে অন্য কনো মেয়ের প্রতি খারাপ নজর ওঁর ছিল না। … না, এমনকি এই যে কিছু বছর আগে, অনিকের সাথে দেখা হয়েছিল, তনুশ্রীর সাথে দেখা করতে যাবার সময়ে, তখনও অনিকের নজরের মধ্যে খারাপ ভাব ছিল না। … না, মানে একটা মেয়ে এটা খুব ভালো বুঝতে পারে। রাস্তাঘাটে চলতে চলতে, একটা স্পষ্ট ধারনা হয়ে যায় এই ব্যাপারে আসলে।
বাবা – হুম, আচ্ছা তনুশ্রীর সাথে জেলে দেখা করতে গেছিলেন আপনারা?
রিম্পি – আমি গেছিলাম। মহিমা একটু মিডিল ক্লাসেই বড় হয়েছে, ওঁর একটু আইন, পুলিশ, জেল, এসব থেকে ভয় আছে। আর তাছাড়াও আমেরিকায় একবার ওকে অকারণেই, একজন বিদেশির অহেতুক অভিযোগে তুলে নিয়ে যায়। আধঘণ্টার মধ্যেই পুলিশ ওর বিরুদ্ধে অভিযোগ ভুয়ো জেনে, ওকে ছেড়ে দেয়, কিন্তু সেই আধঘণ্টাতে যা হাল হয়েছিল ওঁর, তারপর থেকে ও পুলিশের নাম শুনলেই একটু দূরে থাকে। … তবে আমি গেছিলাম।
বাবা – আপনার মনে হয়, তনুশ্রী দোষী, মানে অনিকের সাথে তনুশ্রীর সম্পর্ক কেমন ছিল?
রিম্পি – তনুশ্রী আমাকে বলেছিল, মৃত্যুর আগের দিন রাত্রে, অনিকের কান পরিষ্কার করে দিচ্ছিল ইয়ারবাড দিয়ে। তারপর কিছু একটা নোংরা বার করতে না পারার জন্য অনিক সেফটিপিন আগিয়ে দেয়। সেই সেফটিপিন দিয়ে কান খুঁচিয়ে পরিষ্কার করার সময়ে, অনিকের পায়ে কিছু কামড়াচ্ছিল বলে, ছটফট করে ওঠে, আর তারপর সেফটিপিনের মুখটা খুলে অনিকের কানের পাশে গেঁথে। … বরোলিন গরম করেও দিয়েছিল কানে। সামান্য ব্যাথাও ছিল, আর একটু ফুলে গেছিল, কিন্তু এর জন্য যে অনিকের প্রাণ চলে যাবে, সেটা না অনিক আর না তনুশ্রী, কেউই ভাবতে পারেনি।
বাবা – আর সম্পর্ক!
রিম্পি – সম্পর্ক ভাইবোনের যেমন হয়। একে অপরকে চোখে হারাতো।
বাবা – এমন কি কনো সম্ভাবনা থাকে যে তনুশ্রীর সাথে অনিকের শারীরিক সম্পর্ক … না মানে …
রিম্পি – না না… এ মা! … কি বলছেন? দুজন দুজনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল ওরা, আর … ছি ছি, না না… এটা আমাকে কেউ বিশ্বাস করতে বললেও, আমি বিশ্বাস করবো না। …
বাবা – অনেক ধন্যবাদ, আপনার সময় দেবার জন্য।
আমরা বাড়ি চলে এলাম। আর বাবা সোফায় বসে চিন্তায় ডুবে গেলেন।
