অপরাধী | রহস্য গল্প

পরের দিন সকালে, রথিনকাকার থেকে একটা চিঠি লিখিয়ে নিয়ে আমরা গেলাম আলিপুর জেলে। সেখানে গিয়ে তনুশ্রীর সাথে সাখ্যাত করলাম। কি বিচিত্র মেয়েরে বাবা, জেল খাটছে, কিন্তু বিষদাঁত ভাঙে নি। বাবা গিয়ে প্রশ্ন করলেন – আপনি কি সত্যিই খুনটা করেছিলেন মিস তনুশ্রী!

মেয়েটি উত্তরে বললেন – আর একমাস জেল খাটা বাকি বলে এসেছেন, আরো তিন বছর জেল খাটানোর জন্য!

বাবা একটু গম্ভীর হয়ে এবার প্রশ্ন করলেন – সত্যিই কি আপনি খুনটা করেছিলেন? নাকি আপনাকে ফাঁসানো হয়েছে!

তনুশ্রী আবারও কড়া ভাবে জবাব দিল – আপনি একটা জেলে এসে, একটা জেল খাটা মানুষের সাথে দেখা করছেন, তা কি এমনি এমনি সেই মানুষটা জেলে বসে বসে পচছে!

বাবা – আপনি যদি একটু সহযোগ করতেন, তাতে আপনারই ভালো হতো।

তনুশ্রী – সহযোগ! (একটা বিশ্রী হাসি) করলে কি হবে, এই যে তিন বছর আমার জেলে কাটলো, সেই সময়টা ফিরিয়ে দেবেন আপনি?

বাবা – আপনি জেলে এসেছেন তখন আপনার বয়স ২০, এজ পার পুলিশ রেকর্ড, অর্থাৎ আপনার বয়স এখন ২৩। আপনার সামনে কিন্তু প্রচুর জীবন পরে রয়েছে। আপনি সহযোগ করলে, আপনার বাকি জীবনটা ঠিক থাকতেও পারতো।

তনুশ্রী – আর না করলে? … আপনি কে আমি জানিনা? সিয়াইডি চিফের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন শুনলাম। তা মিস্টার, যেই হন না কেন আপনি, একটা জিনিস কান খুলে শুনে রাখুন। একজন জেল ফেরদ আসামীর বাকি জীবন কেমন কাটে, তা এই তিন বছর জেলে থেকে ভালো করেই জেনে গেছি আমি। তাই আর নতুন করে কনো গপ্প শোনাতে আসবেন না আমাকে!

বাবা – আগেও বুঝি এমন কনো গল্প শোনানো হয়েছিল আপনাকে?

তনুশ্রী – আপনি কি চাইছেন বলুন তো আমার থেকে?

বাবা – খুনটা কে করেছিল, সেটা তো আপনি জানেন। তাহলে মুখ বন্ধ করে, নিজের নামে সমস্ত এলিগেশন কেন মেনে নিলেন?

তনুশ্রী – এই যে মশাই শুনুন, আমি না কেসটা নিজে নিজে লড়াই করিনি; আমার একজন উকিল ছিল। তিনি আমাকে ডিফেন্ড করতে পারেননি। … তিনি বলার চেষ্টা করেছিলেন, এটা একটা এক্সিডেন্ট, যেখানে আমার ব্যবহার করা সেফটিপিন অনিকের কানের নিচে ফুটে গেছিল। সে এমনও বলেছিল যে আমি খুনটা করিনি, আর মার্ডার বা ডেথ সিনারিওতে ছিলামও না। … অনিককে দুশ্চরিত্র প্রমাণ করে, বলার চেষ্টা করেছিল যে সঙ্গমের পর, যখন বিছনায় পরে যায়, তখন সেফটিপিনটা এক্সিডেন্টালি ঢুঁকে যায় কানের পিছনে।

বাবা – কিন্তু শেষ রক্ষে হয়নি। … আর যখন দেখলেন উনি যে, আপনাকে বাঁচানো যাচ্ছেনা, তখন আপনার উপরই সেই সঙ্গমের হামলা হয়েছিল, আর সেটার থেকে আপনি নিজেকে বাঁচাতে গিয়ে এমন একটি বিপদের মধ্যে ফেঁসে গেছেন, এই কথা বলতে, আপনার সাজা মাত্র তিন বছর অবধি সীমিত হয়ে যায়। … আচ্ছা একটা কথা বলুন, তিন বছরের জেল শুনে আপনি কি চমকে গেছিলেন?

তনুশ্রী – না, উল্টোদিকের উকিল মানে সরকারি উকিল খুবই জাঁদরেল ছিলেন, আমাদের উকিল উনার সামনে দাঁড়াতেও পারছিলেন না। … আমি তখনই বুঝে গেছিলাম, আমার জেল হবেই। প্রথমে তো ভেবেছিলাম ফাঁসি হবে, কারণ আমি ভাবতাম খুন করলেই ফাঁসি হয়। পরে দেখলাম তিন বছরের জেল হলো।

বাবা – আর ফাঁসির জায়গায় মাত্র তিনবছর জেল শুনে আপনার কেমন লাগে? মানে হতাশ লাগে, নাকি কষ্ট হয়, নাকি অবাক হয়ে যান!

তনুশ্রী – আপনি কি রিপোর্টার! রিপোর্টারের মত প্রশ্ন করছেন। যখন আমার নামে এলিগেশন লাগলো, তখন রিপোর্টাররা ঠিক এই ভাবেই প্রশ্ন করেছিল আমাকে।

বাবা – হ্যাঁ রিপোর্টার, আমি যাদের কে অহেতুক বা অন্যায় ভাবে ক্রিমিনাল সাজানো হয়েছে, তাদের চিত্রকে সামনে আনি, যাতে তাঁদেরকে পুনর্বাসন দেওয়া হয়, আর তাঁদের বাকি জীবনটা নষ্ট না হয়ে যায়।

তনুশ্রী – প্রয়াস খুব ভালো। এরকম অনেকেই আছে এখানে।

বাবা – আর তার মধ্যে আপনিও একজন তাই তো?

তনুশ্রী – দেখুন আমি এখন যদি বলি আমি নির্দোষ, তাহলে কি হবে আমার! … আপনি কি গতি করে দেবেন আপনার?

বাবা – হুম গতি করে দেব, তবে আমি না, অন্য একজন আপনার গতি করতে চান। … তবে তার জন্য আপনাকে তো আমাদের সাথে সহযোগিতা করতে হবে না! … আমি ধারনা করার চেষ্টা করছি, তিন বছর কেউ ক্রাইম না করে জেল খাটলে, তার ভিতরে কতটা বিতৃষ্ণা এসে যায়, যদিও পুরোটা ধারনা করতে পারছিনা।

তনুশ্রী – এই মিস্টার যানতো আপনি, আপনার কথাতে আমি বড্ড কনফিউজ হয়ে যাচ্ছি!

বাবা – ঠিক যেমন সেই সময়ে লাগছিল, যখন আপনি বুঝতে পারছিলেন যে আপনি মিথ্যে কেসে ফেঁসে যাচ্ছেন। কি তাই তো? … আপনাকে বলা হয়েছিল, আপনাকে বাঁচিয়ে নেওয়া হবে। কিন্তু তা করা হলো না, সেই নিয়ে আপনার দুঃখ বা রাগ হয়নি!

তনুশ্রী – চেষ্টা উকিলসাহেব অনেক করেছিলেন, কিন্তু পারেন নি।

বাবা – হুম প্যারাকুয়েট আপনি কি করে পেলেন?

তনুশ্রী – কি কুয়েট! … প্যারাকুয়েট জিনিসটা আবার কি? আর আমার এই খুনের সাথে সম্পর্কই বা কি?

বাবা – আচ্ছা, ছাড়ুন অসব। আপনি নিজেকে না বেকসুর বলতে রাজি নন। ঠিকই আছে, তিন বছর জেল খাটা হয়েই যখন গেছে আর নির্দোষ থেকে লাভ কি! … ওসব ছাড়ুন, আপনার নামে তো খুনের অভিযোগ উঠেছিল, মানলাম, কিন্তু আপনার ভাই, মানে অনিক ভদ্রের উপর যে দুশ্চরিত্র হবার আরোপ এসেছিল, সেটা কতখানি ঠিক বা বেঠিক, সেই কথা আমাকে একটু বলবেন?

তনুশ্রী – মিথ্যে কথা। … ডাহা মিথ্যে কথা। প্রথম যখন কথাটা শুনেছিলাম, তখন পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে উঠেছিল আমার। কিন্তু সেই কথার জেরেই আমার সাজাকে জজসাহেব ৮ বছর থেকে ৩ বছরে করে দেন।

বাবা – একটা অপ্রিয় প্রশ্ন করতে পারি কি! … আসলে এটা জানাটা খুব দরকার আমার জন্য।

তনুশ্রী – সব প্রশ্ন তো অপ্রিয়ই করছেন। আরো একটা করুন।

বাবা – আপনার সাথে কি কনোদিনও অনিকের …

তনুশ্রী চেঁচিয়ে উঠলো – না … কনোদিনও না। আমার ভাই ছিল। এবং বড়দার থেকেও বেশি স্নেহ করতো অনিক। … অনিক দুশ্চরিত্র ছিলনা, কনোদিনও ছিলনা; না আমেরিকায় থাকতে, আর না এখানে আসার পর।

বাবা – সরি, আমি জানতাম, এই প্রশ্নটা আপনার অত্যন্ত অপ্রিয় হবে। সত্যি বলতে উত্তরটাও আমি জানতাম। কিন্তু প্রশ্নটা করার কারণ এই যে, আপনার ভাইয়ের পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট অনুসারে, উনার মৃত্যুর কিছু মিনিট আগেই, উনার বীর্যপাত হয়, এবং উনার যৌনাঙ্গ থেকে কনো স্ত্রীর যৌনাঙ্গের অবশেষও পাওয়া গেছে। তাই প্রশ্ন করলাম। … কিছু কি আলোকপাত করতে পারবেন এই ব্যাপারে!

তনুশ্রী এই প্রশ্নের কনো উত্তর দিলো না। ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে আর আমার দিকে তাকালো খালি। … অনেকক্ষণ ধরেই তাকিয়ে ছিল; শেষ মুহূর্তে যখন দেখা করার সময় শেষ হয়ে গেছে বলে, মহিলা জেলার পুলিশ ওকে ভিতরে নিয়ে যাচ্ছিল, তখনও তনুশ্রীর ওই মুখটা দেখেছিলাম আমি। যেন বিস্ময়ে হতবম্ব হয়ে গেছিল ও।

আমি আর বাবা ফরে এলাম। বাবাকে গাড়ি চালানোর সময়েও বললাম – তনুশ্রী ওই কথাতে হতবাক হয়ে গেল কেন?

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8