অপরাধী | রহস্য গল্প

বাড়ি না ফিরে আমরা তিনজনে সরাসরি চলে গেলাম সৌরভ বাবুর বাড়ি। মুকুল যেমন বলেছিল, ঠিক সেই খানেই ছিল পোস্ট মরটেম রিপোর্ট। সোহম সেই খান থেকে রিপোর্ট বার করে বাবার হাতে দিলে, বাবা সেটি উলটেপালটে দেখে নিয়ে, বললেন, “এটি কি আমি নিয়ে যেতে পারি!”

সোহম বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই। আমি এর কিই বা বুঝবো! আপনি নিয়ে যান”।

বাবা এবার রিপোর্ট নিয়ে সরাসরি সৌরভবাবুর সামনে গিয়ে, তিনি যেই চেয়ারে বসেছিলেন, তাঁর হাঁটুর কাছে বাবা বসে বললেন, “তনুশ্রী কি নির্দোষ কাকাবাবু! … আমি বিজয়। বিজয় সিংহ। উকিল ছিলেন, তাই নিশ্চয়ই আমার নাম শুনেছেন আপনি। … যদি তনুশ্রী নির্দোষ হয়, তবে আমি তার নির্দোষ হবার প্রমাণ জড়ো করবোই আর তা আপনার সামনে রেখে দেব। কথা দিলাম কাকাবাবু”।

আমরা সেখান থেকে চলে এলাম এবার। বাড়ি এসে, বাবা রিপোর্টটি পড়লেন ভালো করে। তারপর বেশ জমিয়ে একটা সিগারেট টানলেন। সিগারেট টেনে, সোফায় মাথাটা হেলিয়ে দিলেন বাবা। বুঝলাম, রিপোর্টের এনালিসিস করছেন মনের মধ্যে। আমি একবার কাছে গিয়ে বললাম, “রিপোর্টটা আমি একবার দেখতে পারি কি?”

বাবা চোখ বন্ধ করেই, হাত বাড়িয়ে রিপোর্টটা তুলে আমার মুখে সামনে ধরলেন। আমি এবার রিপোর্টটা নিয়ে চোখ বলাতে থাকলাম। আমার দেখা প্রথম পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট। দেখে কিছু তেমন বুঝতেও পারলাম না; শুধু এটুকুই বুঝলাম ভিক্টিমের পেটে প্যারাকুয়াট পাওয়া গেছে, আর ভিক্টিমের কানের পাশে একটা শিরা ছিরে গেছিল।

বাবাকে প্রশ্ন করলাম – এবার কি করনীয়? আর বাবা এই প্যারাকুয়াট জিনিসটা কি?

বাবা গম্ভীর হয়ে বললেন – আমেরিকায় পাওয়া যায় একরকম কীটনাশক, যা অত্যন্ত বিষাক্ত। মুখে চলে গেলে, ৫ মিনিটের মধ্যে মৃত্যু অবধারিত।

আমি বললাম – কিন্তু তনুশ্রী তো আমেরিকা যায়নি!

বাবা – হুম সেই ব্যাপারে তো সিওর নই, কিন্তু অনিক আর মলয় তো গেছিল। … এমনও তো হতে পারে যে অনিক নিজে এই বিষটা খেয়েছিল!

আমি – তারমানে এটা একটা সুইসাইডের কেস!

বাবা ঠোঁট উলতে বললেন – মার্ডারও হতেই পারে। অনিক চরিত্রহীন ছিল, আর তনুশ্রীর সাথে নোংরামি করার চেষ্টা করেছিল, সেই জন্য মলয় ওকে বিষ দিয়ে দেয়, এও তো হতে পারে!

আমি – এরমানে মৃত্যু ওই বিষের জন্যই হয়েছিল, আর কানের পিছনে সেফটিপিন ফোটানোর জন্য নয়, তাই তো?

বাবা – কানের পিছনে পিন ফুটিয়ে একটি টিসুকে ডেমেজ করে দেওয়া হয়েছে। আর যেই সেফটিপিনের মাধ্যমে সেটা করা হয়েছে, সেটাতে তনুশ্রীর ফিঙ্গার প্রিন্ট পাওয়া গেছে, এটা তো সঠিক, কিন্তু এই পিন ফোটানোর জন্য খুব বেশি হলে, ভয়ানক ব্যাথা হতে পারে, মৃত্যু নয়।

আমি – আর মিস্টার সৌরভ পণ্ডিত, সেই বিষের ব্যাপারে জানতেন না বলে, পুরো দোষটা তনুশ্রীর উপর চাপিয়ে দেন। আর পরে সেটার ব্যাপারে জানতে পেরে, তনুশ্রীর জন্য খারাপ লাগতে শুরু করে!

বাবা – হতে পারে, এমনই সমস্ত কিছু হয়েছে। আসলে আমাদের দেশের আইন অদ্ভুত। সত্য গোপন করার জন্য বা সত্য বিকৃত করার অপরাধে এখানে সাজা হয়, কিন্তু একজন উকিল যখন সেই একই সত্য গোপন বা বিকৃত করেন, তখন তাঁর কনো সাজা হয়না। … যাই হোক, এখনই কনো কনক্লুসানে আসা উচিত নয়। … হ্যাঁ, যদি সৌরভ পণ্ডিত হনেস্ট উকিল হন, তবে এই বিষের ব্যাপারে না জানার জন্য, সেই দিকে তাকানো বন্ধ করে দেন এমন হতেই পারে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রে বিরোধী পক্ষের উকিলের কি ভূমিকা?

একটু থেমে থেকে বাবা বললেন, একবার মুকুলকে ফোন লাগা তো, বিরোধীপক্ষের উকিলের ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা চেয়ে নে। আমি বাবার আদেশ পালন করলাম। বিরোধী পক্ষের উকিলের নাম আর ফোন নম্বর লিখে নিয়েছি। বাবা সেটার দিকে চোখ বুলিয়ে বললেন – ইনার সাথে যোগাযোগ করার আগে, একবার আলিপুর জেল থেকে ঘুরে আসাটা বেশি দরকার। একবার তনুশ্রীর বয়ানটাও তো শোনা প্রয়োজন।

আবার বললেন – না, একবার ওই উকিলের সাথে কথা বলেনি। বারবার জেলে যাওয়া যাবেনা। … একবারে গিয়ে, অনেক কিছু কথা বার করে আনতে হবে। … কি নাম সেই উকিলের?

আমি – জয়ন্ত ভৌমিক।

বাবার নির্দেশে ফোন লাগালাম। রিং হতে বাবার হাতে ফোনটে ধরিয়ে দিলাম। দুই পক্ষেরই কথা লিখছি এবার, যদিও ওই দিকে কি বলা হয়েছে, বাবার থেকে আমি ফোন রাখার পরে জানি।

বাবা – হ্যালো ব্যারিস্টার ভৌমিক!

ভৌমিক – হ্যাঁ, আপনি!

বাবা – আমি একজন রিপোর্টার, বিজয় সিংহ।

ভৌমিক – রিপোর্টার না সরকারের বিশ্বস্ত গোয়েন্দা! … আমি কি ঠিক আন্দাজ করছি!

বাবা – হ্যাঁ, একদমই ঠিক ধারনা করেছেন।

ভৌমিক – হ্যাঁ বলুন। নিশ্চয় কনো কেসের জন্য!

বাবা – হ্যাঁ, আপনার মনে নাও থাকতে পারে, বছর তিনেক আগের কেস; আপনার মক্কেলের ৩ বছরের জেল হয়; নাম তনুশ্রী ভদ্র।

ভৌমিক – তনুশ্রী … তনুশ্রী… কেসের সামারিটা একবার বলতে পারবেন প্লিজ!

বাবা – সে কি, উকিলরা তাঁদের মক্কেলদের কখনো ভোলেন না শুনেছি। … একটি ছেলে অনিক ভদ্রের কানের পাসে পিন ফুটিয়ে হত্যা করে আপনার মক্কেল।

ভৌমিক – ও আচ্ছা, আচ্ছা মনে পরেছে। … না না, আপনি ঠিকই বলেছেন, উকিলরা নিজের মক্কেলদের কখনো ভোলেনা। আসলে তনুশ্রী ভদ্রের মকদ্দমা আমি করেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমার মক্কেল ছিলেন, সুনয়না দত্ত। আসলে তনুশ্রীর কাছে কেস লড়ার পয়সা কোথায় ছিল; তাই কেসের পয়সা দিয়েছিল, আর আমাকে এপোয়েন্ট করেছিলেন মিস সুনয়না।

বাবা – আচ্ছা, উনি এই কেসের সাথে কনো ভাবে কি যুক্ত!

ভৌমিক – না কনো ভাবেই নয়; আসলে উনি তখন ছিলেন মলয় ভদ্রের হবুস্ত্রী, আর এখন তিনি উনার স্ত্রী। … মলয়ের বোনের কেস বলে, সুনয়না আমাকে এপোয়েন্ট করে দেয় এই কেসে। আসলে মলয় তখন সবে সবে আমেরিকা থেকে ফিরেছিল। তাই ওঁর কনো উকিল চেনা ছিলনা। তাই ওঁর ফিয়ন্সে সেই ব্যাপারে সাহায্য করার জন্যই আমাকে এপয়েন্ট করেন।

বাবা – ও আই শি। … আচ্ছা ভৌমিকবাবু, আপনি অনিক ভদ্রের পোস্ট মর্টেম রিপোর্টটা নিশ্চয়ই দেখেছিলেন, তাই না!

ভৌমিক – হ্যাঁ তা তো দেখেছিলাম নিশ্চয়ই। আসলে অনেকদিন হয়ে গেছে তো, এখন সেসব আর মনে নেই তেমন।

বাবা – আচ্ছা আচ্ছা। … আচ্ছা একটা কথা বলতে পারবেন আমাকে। আপনারা তো অনেক কেসই লড়েন, বিষ হিসাবে প্যারাকুয়েট ব্যবহার করা হয়েছে, এমন কনো দিন শুনেছেন!

ভৌমিক – কি কুয়েট! … এরকম নামের বিষ আবার আমাদের দেশে হয়, সেটাই তো জানতাম না।

বাবা হেসে বললেন – আছা আচ্ছা ঠিক আছে। … আচ্ছা, তনুশ্রী কি সত্যিই তার ভাইয়ের সাথে শারীরিক সম্বন্ধে জরিয়েছিল, নাকি ওঁর সাজা কম করার জন্য, সেটা বানানো!

ভৌমিক – বানানো। … যখন কনো ভাবেই জাঁদরেল উকিল, সৌরভ পণ্ডিতকে হারাতে পারছিলাম না, তখন সুনয়নাই আমাকে বুদ্ধি দেয় এটার। … আসলে অনিক যে দুশ্চরিত্র এবং বহু স্ত্রীর সাথে সহবাস করেছে, যতদূর মনে পরছে, সেটা প্রমাণিত হয়ে যায়। … তাই তনুশ্রীর সাজা কম করার জন্য সুনয়না সেইরকম কিছুকেই সামনে রাখতে বলেন। আমি দেখি, হ্যাঁ আমার মক্কেল তো এর জন্য বেঁচে যাবে, মানে সাজা কম হয়ে যাবে। … তাই চালিয়ে দিই আর দেখুন, যেখানে ১০-১২ বছরের জেল হতে পারতো, সেখানে মাত্র তিন বছরের জেল হয়।

বাবা – অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। যদি সম্ভব হয়, একবার নয় ফোন করে, আপনার সাথে পরে দেখাও করে নেব।

বাবা ফোন রেখে দিলেন, আর পরের দিন তনুশ্রীর সাথে দেখা করার প্রস্তুতি নিলেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8