দ্বিতীয় পর্ব – শেষ কেস
পরের দিন সোহম আসতে, আমিই দরজা খুললাম। আমি আর বাবা রেডি হয়েই ছিলাম। সোহম আসতে, তাকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের স্করপিও চেপে রওনা হলাম মুকুলের উদ্দেশ্যে। মুকুলের বাড়ি লেকটাউনে। মুকুলের সাথে আগে কথা বলে রেখেছিলেন সোহম। তাই আমাদের সুবিধাই হলো।
মুকুলের থেকে জানা গেল যে, শেষ কেস হলো অনিক ভদ্রের খুনের মামলা। তাতে তনুশ্রী ভদ্র, যিনি অনিক ভদ্রের বোন, তাঁর সাজা হয়। এবং এখন তিনি জেলে আছেন।
বাবা বললেন – নিজের ভাইকে খুন করেছেন?
মুকুল – নিজেরই, তবে নিজের নয়। মানে, উনাকে উদ্ধার করে আনেন, মলয় ভদ্র, যখন তনুশ্রীর বয়স ১২। মা হারা হয়েছিল সেই সময়ে মেয়েটা, আর বেশ কিছু যুবক, সুন্দরী মেয়ে দেখে বিরক্ত করছিলেন, তাই নিয়ে এসে, নতুন নাম পদবি দিয়ে, নিজের বোন করেই রাখেন। … অনিক, মলয় আর তনুশ্রীর পরের ভাই।
বাবা – আচ্ছা কি ভাবে খুনটা হয়েছিল?
মুকুল – কানের পাশে সেফটিপিন ফুটিয়ে। মার্ডার অয়েপনও জায়গা থেকেই পাওয়া গেছে, যাতে প্রায় আধ ইঞ্চি মত রক্ত লেগেছিল। ফিঙ্গারপ্রিন্ট ম্যাচ করে, তনুশ্রীর হাতের ছাপ পাওয়া যায়, আর তাই ওকেই দোষী সাব্যস্ত করেন আমার স্যার, আর বিচারপতি সুনিরমল ভট্টাচার্য উনাকে ৩ বছরের জেল হেফাজত দেন।
বাবা – খুনের মামলায়, মাত্র তিন বছরের জেল কেন?
মুকুল – বিরোধীপক্ষের উকিল দাবি করে যে, অনিক তনুশ্রীর প্রতি সেক্সুয়াল হেরাস্মেন্ট করার কালে, তনুশ্রী এমন করে। তাই জজসাহেব বলেন, এটি আত্মরক্ষার জন্য করা খুন, তাই তিন বছরের জেল হেফাজতই দেন।
বাবা – আচ্ছা, আপনারা, মানে ব্যারিস্টার সৌরভ পণ্ডিত কার হয়ে কেসটা লড়েছিলেন?
মুকুল – আজ্ঞে, পুলিশের পক্ষ থেকে বাবা কেসটা লড়েন, পুলিশই এপয়েন্ট করেছিল উনাকে। সরকারি উকিল ছিলেন স্যার সৌরভ পণ্ডিত।
বাবা – আচ্ছা, এখনও কি জেলেই রয়েছেন এই তনুশ্রী ভদ্র! কত বছর হয়েছে জেল খাটছেন উনি?
মুকুল – কেসটি প্রায় আড়াই বছর, না তারও বেশি হয়ে গেছে। আর হয়তো কিছু মাস জেল খাটা বাকি আছে মেয়েটার। … স্যার, এই কেসের পর প্রায় দুই বছর কনো কেস নেন নি। যাই কেস আসতো, উনি ফিরিয়ে দিতেন। আর শেষে আমাকে ব্যারিস্টার অজিতেশ গোস্বামীর কাছে এপয়েন্ট করে, উনি অবসর নেন। … তারপরের কথা আমি কালই সোহমের কাছ থেকে জানি, মানে আমি জানতাম না স্যার এমন মৌন হয়ে গেছেন।
বাবা – হুম, আচ্ছা মুকুলবাবু, আপনি কি মলয় ভদ্রের এড্রেসটা দিতে পারবেন?
মুকুল – হ্যাঁ, … দাঁড়ান, আমার আগের ডায়রিতে লেখা আছে। … একটু খুঁজতে হবে।
ড্রয়ার খুলে, একটু ঘাটাঘাটি করে, আমাদের সামনে মুকুলবাবু একটা ডায়রির পাতা খুলে দিলেন। ডায়রির পাতায় মলয় ভদ্রের নাম, এড্রেস, ফোন নম্বর সবই লেখা ছিল, বাবা আমার দিকে তাকাতে, আমি মোবাইলে একটা ছবি তুলে, বাবাকে হোয়াটসঅ্যাপ করে দিলাম।
বাবা বললেন – আচ্ছা, এই মলয় ভদ্রের ব্যাপারে কিছু নিশ্চয় জেনেছিলেন আপনারা!
মুকুল – মলয়ের ব্যাপারেও জেনেছিলাম, আর ওঁর দুশ্চরিত্র ভাইয়ের ব্যাপারেও। … ওঁর ভাই একজন মহিলার প্রেমে একসময়ে হাবুডুবু খেত। তখন তিনি দাদা, মানে মলয় ভদ্রের সাথে আমেরিকাতে থাকতেন। সেই মহিলাও নাকি ওখানকারই ছিল, মানে মলয় ভদ্রের বয়ান থেকে আমরা এমনই পেয়েছি। … সেই মেয়েটি অনিককে ধোঁকা দেয়, আর তারপর থেকে অনিক বহুস্ত্রীর দেহসম্ভোগে সদা মত্ত থাকতো। আর এমনই মত্ততার শিকার হতে চলেছিল তনুশ্রীও।
বাবা – আচ্ছা, মানে মলয় আমেরিকাতে থাকতো?
মুকুল – খুব বড় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সে। … দেশে ফিরেও কগ্নিজেন্ট বছরে ৬০ লাখের প্যাকেজ দিয়েছিল। কিন্তু সে সেই প্যাকেজ না নিয়ে, এক সফটওয়্যার বিক্রেতার সাথে যুক্ত হন, যিনি সেই কগ্নিজেন্টেই সফটওয়্যার বিক্রি করতেন। … সেখানে মাইনে পেতো না, কিন্তু প্রতি সফটওয়্যারের জন্য প্রায় কটি খানেক পেত।
বাবা – হুম, … আচ্ছা, তনুশ্রী এখন কোন জেলে রয়েছে?
মুকুল – আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। দাঁড়ান … এক মিনিট।
আবার খানিকক্ষণ ডায়রি ঘেঁটে, মুকুলবাবু বললেন – ব্লক এফ, কয়েদি নম্বর ১১৮।
বাবা – আচ্ছা, এই রেকর্ডও রাখতেন?
মুকুল – আসলে স্যারের মানে সৌরভবাবুর একটা স্বভাব ছিল যে, যেই কেস নিতেন, তাতে যার সাজা হতো, তার কাছে জেলে গিয়ে, তাকে জিজ্ঞেস করতেন, যা কোর্টে প্রমাণিত হয়েছে, তাই সত্যি, নাকি আরো অন্য কিছু ব্যাপার ছিল, যা মিস করা হয়েছে। বা এমনও তিনি জিজ্ঞাসা করতেন যে, তিনি আসলেই দোষী না দোষী নন।
বাবা – হুম। … এনি অয়েজ, মেনি মেনি থ্যাংকস, আপনার অমূল্য সময় দেবার জন্য, আর এতভাবে সাহায্য করার জন্য। … আচ্ছা একটা শেষ জিনিস, … অনিক বাবু তো খুন হয়েছিলেন, উনার পোস্ট মরটেম নিশ্চয়ই হয়েছিল। সেই রিপোর্টের কপি তো মিস্টার সৌরভ ভদ্রের কাছে থাকা উচিত, তাই না! মানে সরকারি উকিল, তো পুলিশেরই সেই কপি দেওয়ার কথা। তাই না!
মুকুল – যদি স্যার সরিয়ে না দেন, তবে, উনার ঘরের পূর্ব দিকের শেষ জানলার পাশে একটা আলমারি আছে, তারমধ্যেই উনি এই সব কেসহিস্ট্রি, তারপর পোস্ট মরটেম রিপোর্ট, সমস্ত রাখতেন। যতদূর আমার মনে আছে, একদম উপুড়ের থাকের বাঁদিকের কপিটা হবে। … মানে যদি স্যার এরপর সরিয়ে নেন, তাহলে বলতে পারবোনা।
বাবা হাতজোড় করে বললেন – অনেক অনেক ধন্যবাদ মুকুলবাবু।
আমরা সেখান থেকে উঠে এলাম। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম – মলয় বাবুর কাছে যাবার এপয়েন্টমেন্ট নেব?
বাবা – উমহুম, … আগে পোস্টমরটেম কপিটা একটু দেখতে হবে। … চলুন সোহমবাবু, আপনাদের বাড়ি চলুন। আপনার বাবার সাথে দেখাও করে আসি, আর পোস্টমরটেম রিপোর্টটা পাওয়া যায় কিনা দেখি।
