অপরাধী | রহস্য গল্প

আইনের চোখে অপরাধী চিহ্নিত হলেই কি তিনি অপরাধী? অপরাধী নিয়ে এক অনবদ্য রহস্যময় বাংলা গল্প রইল আজকের প্রতিবেদনে।

বাংলা গল্প সমূহের সব থেকে জনপ্রিয় বিষয় হলো রহস্যের তদন্ত। রহস্য শাখার বাংলা গল্প রচয়িতারা শুধুই যে পাঠককে অনুমোদন দেওয়ার সামগ্রী রাখেন, তা কখনোই নয়। যেমন পাঠকদের এই বাংলা গল্পগুলি আকর্ষণীয় ক্লাইম্যাক্স উপহার দেয়, তেমনই এরা দেয় এক বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয়। সেই বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি কখনো হয় সমাজের একটা শ্রেণির মানুষের মানসিকতার বীজ, তো কখনো হয়, একটা শ্রেণির মানুষের জন্য বুদ্ধির রসদ। কিন্তু আরো একটা জিনিস এই বাংলা গল্পগুলিতে থাকে আর তা হলো, একটি বিশেষ ধরনের সমাজ দর্শন। দেখুন তবে, আজকের বাংলা গল্পতে, কি ধরনের রসদ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

অপরাধী কে, তা খুঁজে বার করাই একজন তদন্তকারীর প্রধান কাজ। সেই অপরাধী বেশির ভাগ সময়েই প্রত্যক্ষ থাকেন না, সেই জন্যই তদন্ত। কিন্তু কখনো কখনো একজন অপরাধী সম্পূর্ণ ভাবে সুপ্ত থাকেন। এই অপরাধীকে খুঁজে বার করা খুব কঠিন হয়।

আমাকে আপনারা চেনেন। আমি মিলি, বিজয় সিংহের একমাত্র কন্যা। একটা কেসের স্মৃতি এলো, তাই সেই কথা বলছি আপনাদেরকে। কেসটা একটা উকিলের, না না আদালতের কাঠগড়ার কেস নয়, মানে আমাদের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি, তবে একজনকে নিয়ে এই কেস, যাকে কাঠগড়াতে দাঁড়াতেও হয়েছে, আর জেলের সাজাও ভোগ করতে হয়েছে। কেসের শুরু হয় এক বিচিত্র ভাবে। আমাদের বাড়িতে সেদিন বিদিপ্তাদি আর মা পুজোর বাজার করতে গেছিল, তাই আমি আর বাবাই বাড়িতে ছিলাম।

কলিংবেলটা বেজে উঠতে, দরজা খুললাম, দেখলাম একজন এই ২৫-২৬ বছরের ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ভিতরে আসতে বললে, তিনি এলেন। বাবা আর আমি তখন বসে চা খাচ্ছিলাম; বাবাকে দেখে ভদ্রলোক বললেন, “আপনিই কি মিস্টার বিজয় সিংহ?”

বাবা বললেন, “হ্যাঁ, আপনার পরিচয়টা?”

ভদ্রলোক বললেন, “সোহম পণ্ডিত। … আমি এখানে একটা কেসের ব্যাপারে এসেছি, আমার বাবার ব্যাপারে। বাবা হলেন প্রাক্তন উকিল, সৌরভ পণ্ডিত”।

বাবা – আপনি কি করেন?

সোহম – আজ্ঞে, সেন্ট্রাল গভারন্মেন্টে একটা কন্ট্র্যাকচুয়াল কাজ করি।

বাবা – আচ্ছা, তা বলুন, কেসটা কি?

সোহম – আসলে বাবা বেশ কিছু মাস ধরে অসুস্থ। অনেক ডাক্তারবদ্যি করেছি, কিন্তু কিছু লাভ হয়নি। শেষে ডাক্তার এন এস লাহাকে দেখাতে, উনি বললেন, বাবাকে একটি মনস্তত্ত্ববিদ দেখাতে। শর্মিষ্ঠা গুহঠাকুরদা নামক এক মনস্তত্ত্ববিদকে দেখাতে উনি বললেন, আমার বাবা কনো একটা ব্যাপারে অত্যন্ত গিল্টি ফিল করছেন, আর সেই গিল্টিফিলিং এতটাই প্রবল যে, উনি স্বেচ্ছায় মৌন না নিয়েও মৌন হয়ে গেছেন। উনি সমস্ত পরীক্ষা করে বললেন, যদি সেই গিল্টি ফিলিং যার প্রতি, তাঁকে সামনে দাঁড় করানো যায়, তবে হতে পারে যে, তিনি ঠিক হতে পারেন।

বাবা একটু হেসে বললেন – কিন্তু এসব তো ডাক্তারবদ্যির ব্যাপার। আমি এখানে কিই বা সাহায্য করতে পারি!

সোহম – আসলে বাবা সম্পূর্ণ ভাবে মৌন। কেবলই ফ্যাল ফ্যাল করে দেখতে থাকেন আমার দিকে। কনো কথা বলেন না, খালি চোখের জল ফেলেন মাঝে মধ্যে। এমন অবস্থায় আমি কি করে বাবা কি জন্য গিল্টি, সেটা বুঝি বলুন তো! … আপনি যদি সাহায্য করতেন আমাকে এই ব্যাপারে, তবে…

বাবা – আপনার বাবার বয়স কতো?

সোহম – ৫৬

বাবা – মাত্র ৫৬ বছর বয়সে রিটায়ার হয়ে গেছেন, উকিলের পেশা থেকে? … কোথায় প্র্যাকটিস করতেন?

সোহম – আজ্ঞে হাইকোর্টে। প্রচুর বড় বড় কেস করেছেন উনি। বিপুল টাকাও কামিয়েছেন। … কিন্তু আচমকাই সমস্ত কেস নেওয়া বন্ধ করে দিলেন। তারপর বার কাউন্সিল থেকে নাম কাটিয়ে, বাড়িতে বসে গেলেন। আমি সবে সবে চাকরি পেয়েছি, মা নেই আমার। আর এরপর থেকে বাবা, ক্রমশ মৌন হয়ে গেলেন, আর এখন তো একটি কথাও বলেন না!

বাবা – হুম, বুঝেছি। … তা আপনার বাবা জীবনের শেষ কেসটা কি লড়েছিল, সেই বিষয়ে আমাকে জানাতে পারবেন?

সোহম – আজ্ঞে, বাবার একজন এসিস্ট্যান্ট ছিল, মুকুল দত্ত। বাবা যখন বার কাউন্সিল থেকে নিজের নাম কাটালেন, তখন এই মুকুলকে একজন অন্য উকিলের নিচে এপয়েন্ট করে যান। এই ব্যাপারে সে-ই বলতে পারবে। আমি তার বাড়ি চিনি। আপনি যেতে চাইলে, আপনাকে নিয়ে যেতে পারি।

বাবা – আপনি এক কাজ করুন, কাল আসুন, ঠিক এই সময়ে। আর পারলে, মুকুলের সাথে আগেভাগে একবার কথা বলে রেখে, একবার জানিয়ে রাখলে ভালো হবে।

সোহম বললেন – তাহলে স্যার, আপনি কেসটা নিচ্ছেন তো? … আপনার পারিশ্রমিক কি হবে?

বাবা – পারিশ্রমিক যদি নি, তবে আপনার বাবার হাত থেকেই নেব। … আপনি কাল আসুন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6 7 8