অনাশ্রমে আশ্রিত | রহস্য গল্প

ভিতরের প্রমাণ পাবার জন্য এমিলিকে পাঠিয়ে, আমি আমার কাজ করে দিয়েছিলাম, যদিও সেই পাঠানো যে সার্থক হয়েছে, তা ওই তাঁবুতে বসে বসে, তার নখের উপর লাগানো ক্যামেরার দৃশ্য, এই স্ক্রিনে (হাতে একটি মোবাইল স্ক্রিন দেখিয়ে) দেখে নিশ্চিত হই। … কিন্তু এখনো একটা অঙ্ক বাকি ছিল।

হ্যাঁ ধরে নিয়েছিলাম অঙ্কটা, কিন্তু শিওর ছিলাম না। … অঙ্কটা হলো তারিখের। … টু ইচ, উজ্জয়েন, নাগপুর অ্যান্ড বাঙ্গালুরু … ডেটটা হলো ২২শে ফেব্রুয়ারি, পয়লা মার্চ, ৮ই মার্চ, আর রিসেন্টলি, ১৫ই মার্চ। … অন্যদিকে, … টু ইচ ফ্রম চণ্ডীগড়, দিল্লি, আর আগ্রা, অন ডি ডেট অফ ২৩রড ফেব্রুয়ারি, ২ন্ড মার্চ, ১০থ মার্চ, আর ১৭থ মার্চ।

যখনই শিওর হয়ে গেলাম যে সরষের মধ্যেই ভুত, তখনই এই অঙ্ক মিলে গেল। … উজ্জয়েন, নাগপুর আর ব্যাঙ্গালুরু, এই তিনটের নিকটবর্তী ইরার সব থেকে বড় সেন্টার হলো, ভুবনেশ্বর, আর এই তিন স্থান থেকেই ভুবনেশ্বর আস্তে একদিনের উপর লাগে। অর্থাৎ ২২টা হলো ২৩, ১লা টা ২রা হলো, ৮টা হলো ৯, ১৫ই হলো ১৬ই। … আর ভুবনেশ্বর থেকে নয়াভূমি হলো আধদিন। অর্থাৎ পরের দিন শুরু করলেই, এখানে পৌঁছাবে ২৪শে, ৩রা, ১০এ, আর ১৭ই। …

একই ভাবে, চণ্ডীগড়, দিল্লি, আর আগ্রা তিনটেরই নিকটবর্তী বড় ইরা সেন্টার হলো হরিদ্বারে। আর এদের দূরত্ব সবই ১২ ঘণ্টার আশেপাশে। অর্থাৎ ২৩টা ২৩ই, ২টা ২ই, ১০ আর ১৭ যে তারিখগুলো পরের এসাইনমেন্টের, আর ওগুলো সাকেস্ফুল ডেলেভারির পরে অনুষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ যদি সমস্ত কিছু মিলিয়ে নিই, তবে এই দাঁড়ায় যে, যেই যেই তারিখে এই নয়াভূমিতে গাড়িদুটি এসে পৌছায়, সেগুলো হলো, ২৪শে ফেব্রুয়ারি, ৩রা মার্চ, ১০ই মার্চ, ১৭ই মার্চ। … তারপর তো রিসিনিং-এর অঙ্ক। অর্থাৎ নেক্সট ডেট হতে চলেছে ২৪শে মার্চ।

সমস্তটাই অনুমান ভিত্তিক ছিল, তাই সেই কিডন্যাপিংটা হতে দিতে হয়েছে স্যার (মুখ্যমন্ত্রীর) উদ্দেশ্যে, নাহলে এঁদেরকে হাতেনাহাতে ধরতে পারতাম না। … আর হাতেনাহাতে না ধরলে, যতই তথ্যপ্রমাণ রাখো, এরা ঠিক পয়সার জোরে ছাড়া পেয়ে যেত। তাই একটা কিডন্যাপকে হতে দিতে হয়েছে স্যার। … আই এপোলোজাইজ ফর ড্যাট স্যার।

২৪শের রাত্রে গাড়ি এলো, গাড়ির নম্বরগুলো পেলাম। আর আমার অনুমান মতই, গাড়িগুলো বাগানের ঠিক সেই জায়গাতেই গেল, যেখানে গাড়ির চাকার ছাপ দেখেছিলাম। … সেই স্থানে মাটি নেই, আছে একটা মেকানাইজড্‌ পুলি, যেমন বড় বড় পারকিং স্লটে থাকে। … গাড়ি দাঁড়াতেই নিচে চলে গেল, আর গাড়ির মধ্যে থাকা সমস্ত মেয়েদের ওই ঘরে ফেলে চলে আসা হলো। …

স্যার, এমিলির পায়ে লাগানো ক্যামেরা থেকে গোবিন্দসখি ছাড়াও কারা কারা যুক্ত ছিলেন, তা সমস্তই দেখানো আছে। … আর এই গাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যাবার ভিডিওও আমি করি, এও তাঁবুতে বসে, একটা কেবিল দিয়ে ক্যামারাটা পাঁচিলের ঠিক উপরে রেখে। …

আর কি? রথিন গাড়ির নম্বরের থেকে চেকপোস্টের সাথে মিলিয়ে, আমার করা হিসেব, মানে ২৪, ৩, ১০, ১৭ এই তারিখগুলো মিলিয়ে নিলো, আর তাই সেই সিকুয়েন্স অনুসারেই, নেক্সটবার গাড়িগুলোর আসার কথা ছিল ৩১ তারিখ, মানে কাল।  … রাত বারোটার পরে এসেই গাড়িটা ভুল করলো। ১স্ট এপ্রিল হয়ে গেল, আর ওরা এপ্রিল ফুল হয়ে গেল। …

সমস্ত ঘরে একটা নিস্তব্ধতা ভরে গেছিল। বাবার এই কথা সকলকে হাসিয়ে দিল। … মুখ্যমন্ত্রীকেও। … বাবা আবার বললেন – আমরা চেক পোস্টেই ধরতে পারতাম। কিন্তু সেখানে ধরলে, ওরা সরাসরি গোবিন্দসখিকে ফোন করে এলার্ট করে দিতো। … তাই আমরা ওদের চেকপোস্ট পেরতে দিয়ে, ১০০ মিটারের মধ্যে ওদের গাড়ির সামনে গাছ ফেলে, গাড়ি থামাতে বাধ্য করি। … তারপর আমাদের অতর্কিত আক্রমণ। … কিছু ইঞ্জুয়র হয়েছে ওরা, তবে সেটা ততক্ষণের জন্যই, যতক্ষণ না ক্লরোফর্ম ওদেরকে অজ্ঞান করে দেয়। … উদ্দেশ্য, যাতে ওরা গোবিন্দসখিকে কিচ্ছু জানাতে না পারে।

তারপর, ওদের গাড়ির থেকে ৬টা মেয়েকে উদ্ধার করি আমরা। … আর তারপর, আমরা আগে থেকে ঠিক করা মতই, গেরুয়া পোশাক আর মাথায় ন্যাড়া হবার ওয়িগ পরে, সেখান থেকে চলে যাই ইরার গেটে। … গাড়ির নম্বর ওই একই, ভিতরে গেরুয়া মাথা মোড়ানো লোকজন দেখা যাচ্ছে। তাই সিকিউরিটি আটকালো না। … গাড়ি নিয়ে সেই বাগানে গেলাম, যেটা আদপে একটা বাগানই নয়।  … সেখান থেকে নিচে। তারপর আমাদের দেখেই, বিশেষ করে আমাকে আর রথিনকে দেখেই চিনতে পারে গোবিন্দসখি। … পালাবার জন্য ও দ্বিতীয় রাস্তা নেয়, যেটা ওর ঘরে নয়, গঙ্গার দিকে যেই পাঁচিলের সাথে মিশে থাকা দরজা দেখেছিলাম, সেটার দিকে।

কিন্তু সেই দরজার বাইরে, দুইজন সিয়াইডি অফিসারসহ, পুলিশের বাহিনী ছিল, যারা ওদেরকে হাতেনাহাতে ধরে নেয়। … আর শেষে, আমরা এমিলিকে নিয়ে সর্বসাকুল্যে ৬৪জন মেয়েকে উদ্ধার করেছি। … এঁদের মধ্যে, ৪৮জনের এফআইআর আগে হয়েছিল। ২৪শে মার্চ ৬টি মেয়েকে রাখা হয়, কালকের ৬টি মেয়ে আছে, আর ৩ জনকে পাচার করা হয়নি, কারণ এমিলির মতই, তাদেরকে এখান থেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে পাঠানো হয়। …

লাহিড়ী মশাই, আপনার পরিচিতকেও, এই ৬৩ জনের মধ্যে পাওয়া গেছে। উনি সুস্থ আছেন। … সেখানে ওদেরকে সবসময়ে অজ্ঞান করে রাখা হতো। … তাই তাঁরা একটু দুর্বল। এখানের হাসপাতালের প্রধান মহাশয়কে এসডিপিও ম্যাম ডেকে নিয়ে, সমস্ত মেয়েদের স্যালাইন আর স্যালাইনের সাথে পটাসিয়াম, সোডিয়াম সমস্ত দিয়ে, সুস্থ করা হচ্ছে। … তারপর, মিস্টার স্যান্যাল, আপনি ওদেরকে নিজের নিজের বাড়ি ফিরিয়ে দেবেন। … আমার এখানেই ছুটি। খালি লাহিড়ী মশাইয়ের কাছে, উনার পরিচিতকে পৌঁছে দিতে হবে। …

মুখ্যমন্ত্রী বললেন – সত্যি বলতে, আমার কাছে ভাষা নেই বিজয়। … তোমার ব্যাপারে অনেক কিছু শুনেছিলাম। কিন্তু তোমাকে দেখে বুঝলাম, তুমি একজন জাত শিকারি। … আর এমন শিকারি তুমি, যাকে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়। … তুমি আমার অফিসে এসে, তোমার প্রাইজ মানিটা অবশ্যই কাল-পরশুর মধ্যে নিয়ে যাবে।

বাবা বললেন – আরেকটা তথ্য স্যার। … সিবিয়াই-সূত্রে জেনেছি, প্রতি বছর, একটা ১০০ মহিলার এসাইন্মেন্ট ভারত থেকে দুবাই যায়। … মোস্ট প্রব্যাব্লি, এই সংখ্যাটাও ৬৪ থেকে ১০০ হয়ে গেলে, মনেহয় ওখানেই যেত।

লাহিড়ী মশাই বললেন – ওকে, আমি এই ইনফরমেশনটা হোমমিনিস্ট্রি কে দিচ্ছি। এটা নিয়ে তারাই কিছু করুক।

বাবা শেষ করলেন – থ্যাঙ্ক ইউ বলে।

সকলে নড়ে চরে বসলেন। আর সিয়াইডি টিম বাবাকে আলিঙ্গন করে বললেন – আমরা সকলে মুগ্ধ। সিম্পলি বাকরোহিত হয়ে গেছি।

বাসন্তীপিসি কাছে এসে বললেন – ওয়ান ইন আ মিলিয়ান ব্রিলিয়ান্ট বিকাম লাইক ইউ, মাই চাইল্ড। বেঁচে থাকো।

বাবা অফিসিয়ালি এবার একটা চিঠি করে, রথিনকাকুকে দিলেন, যেখানে বাবা অফিসিয়ালি নিজের উপর প্রদত্ত দায়িত্ব হ্যান্ডওভার করলেন রথিনকাকুকে। রথিনকাকু এখনই ফিরলেন না। … কারণ উনাকে এই সমস্ত মেয়েদের হ্যান্ডওভার করতে হবে তাদের তাদের পরিবারের কাছে। আর ওই দুষ্টু মহারাজ আর ওর সাঙ্গপাঙ্গকে নিয়ে যেতে হবে, কলকাতায়। … বাবা বললেন – কোর্টে আমাকে ওদের কেসের সময়ে যেতে হবে। … প্রমাণ তোমাদের হ্যান্ডওভার করে দিয়েছি। কিন্তু আমার কাছে একটা করে কপি আছে। …

এই বলে, সকলকে বিদায় জানিয়ে, আমি, বাবা, মা, এমিলি আর শ্যামলী রথিনকাকুরই দেওয়া একটি গাড়ি করে ফিরে এলাম। … বাসায় এসে, মা সকলকে রান্না করে খাওয়ালেন। … এমিলি একটু লজ্জিত ও কুণ্ঠিত ছিল। … মা উনাকে বললেন – তিনি কত দিয়েছেন?

এমিলি – এক লাখ।

মা – আর ওই দেহব্যবসায় না ফিরে গিয়ে, এই ১ লাখ টাকা নিয়ে, একটা বিউটিসিয়ানের কোর্স করে, জীবনটা পাল্টে নাও। …

এমিলি মায়ের কথাতে প্রতিশ্রুতি দিয়ে, মাকে আর বাবাকে, পায়ে হাতদিয়ে প্রণাম করে চলে গেল।

বাবা বললেন – আমি শ্যামলীকে মিস্টার লাহিড়ীর কাছে দিয়ে আসি। … তারপর একটা ঘুম মেরে, একটা ছোট্ট ট্রিপ এরেঞ্জ করো। … পরপর দুটো কেস করে, শরীরটরির এলে গেছে পুরো।

মা মিষ্টি হেসে সম্মতি দিলেন। … বাবা শ্যামলীকে নিয়ে, আর আমাকে নিয়ে চলে গেলেন। …

লাহিড়ী আবাসনে পৌঁছে, শ্যামলীকে দেখে লাহিড়ীমশাই খুব আনন্দিত হলেন। … শ্যামলী উনাকে প্রণাম করলেন। … বাবাকে লাহিড়ী মশাই কথা মত, আরো চার লাখ টাকা দিলেন। … শ্যামলী সেখানে ছিল না। … তাই বাবা বললেন – আপনার কন্যাকে দিয়ে গেলাম লাহিড়ীমশাই। … নিজের আশ্রিত করেও, নিজের কন্যাকে নিজের কাছেই রেখে দিন। … এদিক সেদিকে যেতে দিচ্ছেন কেন? কালকে উদ্ধার করার পর, আমি ওর সাথে কথা বলেছি। … সুন্দর স্বভাবের মেয়ে আপনার।

লাহিড়ী মশাই কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। বাবা হেসে বললেন, খোঁজ নিয়ে জেনে নিয়েছি আমি। লক্ষ্মীরানি দেবীর গর্ভে, আপনার এই সন্তান জন্ম নিয়েছিলেন আজ থেকে ২৪ বছর আগে। … আপনার দুই ছেলেও তো জানেন, এই কন্যার ব্যাপারে। … কিন্তু চিন্তা করবেন না। আপনার স্বার্থে না হলেও, শ্যামলীর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে, এই কথা কেবল আপনার আর আমার মধ্যেই থাকবে।

লাহিড়ী মশাই এবার একটু ভেঙে পরলেন, আর বললেন – বিজয়, আমি তোমার গুলাম হয়ে গেলাম। … যখন যা প্রয়োজন পরে, এই জ্যাঠাকে একবার বলতে ভুলে যেও না। আমরা ফিরে এলাম। দেখলাম, মায়ের অঙ্ক কষা শেষ। … আমরা সিমলা, কুলু, মানালি যাবো। … টিকিট বুকিং, হোটেল বুকিং সমস্ত শেষ। … বাবা, কাল মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে দেখা করে, ১০ লাখ টাকার প্রাইজ মানিটা নিয়ে আসবেন। আর আমরা পরশু বাদ দিয়ে, তারপরের দিন সকালে প্লেনে চাপছি। প্লেন টু সিমলা। … আ ট্রিপ ফর, ১০ ডেজ।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6