পঞ্চম পর্ব – সিনেমাটিক এক্সন
গত তিনচারদিন বেশ কয়েকবার ভিডিও কল হয়ে গেছে। … পুরো প্ল্যান সকলের মাথায় ছেপে গেছে। … শুধু ৩১ তারিখের অপেক্ষা। বাবা, রথিনকাকু, সকলের গতিবিধি শান্ত হয়ে গেছে। তাই, মাথাকামানো লোকগুলোও আজ দুদিন হয়েছে, আর দেখা যাচ্ছেনা। …
আজ ৩১ তারিখ, ট্রেন ধরবো শিয়ালদা থেকে, বনগাঁ লোকাল। আমি, মা আর বাবা রেডি যাবার জন্য। উবার বুক করলেন বাবা। আমি মা আর বাবা গাড়িতে উঠে পরে, সাউথ শিয়ালদাতে নামলাম। অনলাইন পেমেন্ট করে। শিয়ালদা মেইনে স্টেশনের ভিতর দিয়েই গেলাম। টিকিটও অনলাইনই কাটা, ইউটিএস অ্যাপের মাধ্যমে। ট্রেনে করে বনগাঁ পৌছাতে বেশ অনেকটাই সময় লাগলো। বাবা দেখলাম অন্যান্য বিশয় নিয়ে মায়ের সাথে আলোচনা করছেন।
মায়ের সম্প্রতি আলোচ্য বিশয় হলো এক ধর্মগ্রন্থ। মা এমন বললেন যে, এই ধর্মগ্রন্থে নাকি সমস্ত পুরাণের সার কথা আছে। আমাদের সূক্ষ্ম জগতের, অর্থাৎ মন, বুদ্ধি আর অন্য পঞ্চভূতের মধ্যে কেমিস্ট্রি, আর কেমিক্যাল রিয়াকশনগুলির সূত্র স্পষ্ট ভাবে বলা আছে। আর তারপর এমনও নাকি বলা আছে যে, কোন কেমিক্যাল রিয়াকশনটা সম্ভাব্য আর কোন রিয়াকশনটা কাম্য। … যেই রিয়াকশনটা কাম্য, তার ভৌতিক ফলশ্রুতি কি হয়, সেই নিয়ে বিস্তারে বলেছে এই ধর্মগ্রন্থ।
বাবাকেও দেখলাম, সেই কথাতে খুব উদ্বুদ্ধ। তিনি সমস্ত শুনে বললেন – এর মানে তো, মানবজাতি এক শ্রেষ্ঠমার্গদর্শনের দ্বারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। … কিন্তু কথা হচ্ছে যে কুকুরের পেটে কি ঘি হজম হয়!
মা – মানে?
বাবা – আসলে ঘিয়ের শিশিটা মানুষের হাতে থাকাই ভালো। মানুষের হাতে থাকলে কি হয়, যে মানুষ হচ্ছে, ঘিটা সেই মানুষকেই উনি দেবেন। কুকুরের সামনে থাকলে কি হবে, কুকুর সব ঘি খেয়ে তো নেবে, কিন্তু ওর পেটে তো ঘি সহ্য হবেনা, তাই ঘিটা খালি নষ্ট হবে।
মা – তারমানে, তুমি বলছ, এই সমস্ত গ্রন্থ পাবলিশ না হওয়াই ভালো?
বাবা সেই কথার উত্তর না দিয়ে বললেন – কোথা থেকে এই গ্রন্থের ব্যাপারে তুমি জানলে?
মা – আমার এক বান্ধবী ছিল, কলেজের। … ওই এই সমস্ত ঐতিহাসিক বইয়ের রিসার্চ করে। … তা সে নাকি, হিমালয়ের এক গুহায় এক বাঙালী সাধিকার কাছে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি নাকি এই গ্রন্থের কথা বলেছেন।
বাবা – সাধিকাই কি বই পাবলিশ করতে চলেছেন?
মা – না, সাধিকাটি বলেছেন, এই বইয়ের আরো ৫টা কপি আছে। সেখান থেকে, তুমি যেই কথা বললে, তেমনই কিছু বলেছেন উনি। পাবলিশ হতে হতেও হবেনা।
বাবা চোখ বন্ধ করলেন কথাটা শুনে। তারপর বললেন – সেই সাধিকা বলেছেন, তাঁর গুরু বইটির লেখক?
মা – না, গুরুর বাবা।
বাবা – হুম, বুঝেছি। ১-৩-৬-১২-২৪ … বুঝলাম। …
মা – কি বুঝলে?
বাবা – বই পাবলিশ হবেনা। … তবে একটা পাবলিসিটি হয়ে যাবে বইটার। …
মা – মানে?
বাবা – দেখতে পাবে, আই থিংক খুব তাড়াতাড়িই দেখতে পাবে।
এই বিশয়ে আর কথা হলো না। মায়ের যেন বাবার কথাটা শুনে ভালো লাগেনা। … তাই এই বিশয়ে আর কিছুই বললেন না উনি। তবে আমার কাজ ছিল, চুটিয়ে ট্রেনের খাবার খাওয়া। ঝালমুড়ি, তেঁতুলজল দিয়ে করা ছোলামাখা, ঘুগনি, সমস্ত মুখরোচক খাবার খেতে থাকলাম।
অনেকক্ষণ পরে মা বাবার কানের কাছে ফিসফিস করে বললেন – আজকে কি গুলিগোলা চলবে?
বাবা – আশা করা যায়, না। … তবে হ্যাঁ, যদি কোন ভুলচুক হয়ে যায়, তবে চলতেও পারে।
মা – পুলিশকে ইনভল্ভ করা হচ্ছেনা কেন?
বাবা – ওদের ইনভল্ভ করার মানে, যাদেরকে অতর্কিত আক্রমণের প্ল্যান করা হচ্ছে, তাদেরকে সমস্ত খবর অগ্রিম পৌঁছে দেওয়া।
মা – ফোর্সটা পাওয়া যেত।
বাবা – হ্যাঁ, পেলে সুবিধাই হতো, কিন্তু কাজ ভেস্তে যাবার সম্ভাবনা বেশি। তাই, দুষ্টগরুর চেয়ে শূন্যগোয়ালই ভালো।
মা – ওরাও কি মিলেমিশে আছে নাকি এতে?
বাবা – কুকুর বেড়াল একবাড়িতে থাকলে, মিলেমিশেই থাকে মধু। তাই কুকুরকে দিয়ে বিড়ালের গলায় ঘণ্টি পরানো যায়না। সেটার জন্য দরকার, আমাদের মতন কিছু বাঁদর।
এই সব অনেক কুকুর, বেড়াল, বাঁদরের আলোচনার মধ্যে দিয়েই আমরা পৌঁছলাম বনগাঁ স্টেশন। বাবার আর মায়ের মুখ চলল কথা বলার জন্য, আর আমার মুখ চলল, ট্রেনের হকারপরিবেশিত চটপটা খাবার চেবাতে। মুখ চালানো বন্ধ করে এবার আমরা স্টেশন থেকে বেড়িয়ে, একবার আশেপাশে দেখে নিলাম, কোন মাথামোরানো লোক রয়েছে কিনা। তারপর অতনুকাকুর ড্রাইভার এঙ্গেজ থাকবে বলে, রথিনকাকার এরেঞ্জ করা সুমনাপিসির গাড়িতে চেপে বসতে, সুমনাপিসির ড্রাইভার আমাদেরকে নয়াভূমির এসডিপিওর অফিস, অর্থাৎ মিসেস বাসন্তী ভূঁইয়ার কোয়ার্টারে পৌঁছে বিদায় নিল।
সেখানে মাকে দেখে ওই বেঁটেখাটো মহিলার খুব আনন্দ। … গল্পের তাঁর কোন শেষই নেই। … মায়ের নিজের গল্প, আমাকে নিয়ে গল্প, বাবাকে নিয়ে গল্প, বাবার পেশা নিয়ে গল্প। আরো কতকি। লাঞ্চ সেরে বাবা সামান্য বিশ্রাম নিয়ে চলে গেলেন সিয়াইডি ক্যাম্পে। আমাকে বাবা বলে দিলেন, রাত্রি যখন ১টা, তখন একটা সিয়াইডি কাকু আসবেন। তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে, গঙ্গার কাছাকাছি একটা বিশেষ জায়গা বলে দিলেন, সেখানে কিছু শুকনো পাতাকে পিন মারা আছে, পিনগুলো সরিয়ে নিলে, মাটি খোরা আছে। সেই মাটিটা হাতড়ালেই, একটা সাদা পেনড্রাইভ পাবো, সেটা উদ্ধার করে আনতে বললেন।
বুঝলাম, বাড়িতে রাখলে বিপদ হতে পারতো। সেই জন্য, এখানেই মাটিচাপা রেখে চলে গেছিলেন বাবা, এই কেস-রিলেটেড সমস্ত প্রমাণসমূহকে। … বাবা এটা প্রায়ই বলে থাকেন। … লুকোতে হয়, চোরের নজরের সামনে। … আসলে লুকনোটা একটা সাইকোলজিক্যাল গেম। … যেখানে ভাবা যায়না, সেটিই লুকোনোর বেস্ট প্লেস। … যে খুঁজবে, সে জানে যিনি লুকিয়েছেন, তাঁর কাছে সেটি খুব মূল্যবান, তাই গোপন স্থানেই রাখবেন। কিন্তু এমন চোখের সামনে সেটা রাখতে হয়, যেদিকে যিনি লুকোনো জিনিস খুঁজছেন, তাঁর মনেও আসবেনা।
রাত্রে, বাবা যেমন বলেছিলেন, তেমন ভাবেই পিন দিয়ে আটকানো পাতা সরিয়ে, মাটি ঠেলে পেনড্রাইভ উদ্ধার করে আনলাম। প্রকৃতি সহায় ছিলেন, নাহলে উদ্ধার করা কঠিন হতো। … জোরে একটা হাওয়া দিতে দেখলাম, একটা জায়গার পাতা উড়তে চেয়েও উড়তে পারলো না, বুঝলাম, পিনগুলো সেখানেই মারা। … তারপর তো বাবার ইন্সট্রাকশন ফলো করা। … সেদিন আমি অত্যন্ত বোর হচ্ছিলাম। আসলে বাবা একটা এডভেঞ্চারে গেছেন, আর আমি যেতে পারিনি। তাই।
সেই কারণেই আমি, মা, বাসন্তীপিসি, আর সেই সিয়াডিকাকু এই পেনড্রাইভকে ল্যাপটপে লাগিয়ে সমস্ত প্রমাণগুলো দেখলাম। … দেখলাম বাবা ওই গাড়ির নম্বর সহ, গাড়িগুলো যে বাগানের মাঝে এসে থামলো, আর সেটা নিচে চলে গেল, সেই পুরো ভিডিওটা করেছেন। … বাবাকে না পেয়ে, আমাকেই বাসন্তীপিসি প্রশ্ন করলেন – এই ভিডিও ফুটেজ বিজয় পেল কি করে?
আমি বললাম – যেই পাঁচিলটায় আমরা ছিলাম, তারই উপর দিকে একটা পাতলা তারদিয়ে, বাবা ক্যামেরাটা লাগিয়ে, একটা মোবাইল স্ক্রিনের সাথে কানেক্ট করে রেখেছিলেন। … সেইখান থেকেই এই ভিডিওটা তোলা।
সিয়াইডি কাকু বললেন – এর মানে, বিজয় বাবু, ওই গার্ডেনেই যত কেলেঙ্কারি, সেটা আগে থেকেই বুঝে নিয়েছিলেন। …
আমি বললাম – শুধু তাই নয়, কোন দিন যে এই গাড়িগুলো আসবে, তাও বাবা জানতেন।
আমারই মত, কেউ কিছু বুঝতে পারলেন না, কি করে বাবা এই সমস্ত কিছু জানলেন। তাই বাবার ব্যাখ্যার জন্য সকলকেই অপেক্ষা করতে হলো। আর এছাড়া, সেদিন রাত্রে বাবাদের যেই এডভেঞ্চার হয়েছিল, সেই কথা পরেরদিন সকালে রথিনকাকুর থেকে শুনি আমরা সকলে। সেই কথা এখানে বললাম –
রথিনকাকা বললেন – প্ল্যান মতই, চেকপোস্টের থেকে ঠিক ১০০ মিটারের মধ্যে, আমরা প্রস্তুত ছিলাম। সামনে বড় গাছের ডাল ফেলে, দুটো গাড়িকেই আটক করা হলো। … তারপর, ওদের গাড়ি থেকে বেড়িয়ে ডাল সরানোর আগেই, আমাদের হামলা হয়। আর ড্রাইভার সহ সবাইকে চড়া ক্লরোফর্ম দিয়ে ঘুম পারিয়ে, আমরা ওদেরকে অন্যগাড়িতে শিফট করে, ওদের গাড়ির থেকে, ছয়জন মেয়েকে উদ্ধার করি, আর তাদেরকেও সেফ কাস্টডিতে রেখে দিয়ে, সেখান থেকেই ওদের দুটো বলেরো নিয়ে, আমরা গেরুয়া কাপর পরে, মাথাকামানোর উইগ চাপিয়ে, ইরার গেটে যাই।
সেখানের সিকিউরিটি আমাদেরকে গেট খুলতেই, বিজয় আমাদের প্রথম গাড়িতে ছিল। ও আমাদেরকে একটা বাগানের গেটের সামনে নিয়ে যায়। … সেখানের সিকিউরিটিও গেট খুলে দিলে, বিজয়ের ইন্সট্রাকশনে, আমাদের গাড়িকে ঠিক বাগানের মাঝে দাঁড় করালাম। আর ওমনি গাড়িটা নিচের আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেল। …
আমরা গাড়ি থেকে বেড়িয়ে, মাথা নিচু করে, গাড়ির সিট সরাচ্ছিলাম, যেখানে প্রথমে সন্ন্যাসীগুলো মেয়েগুলোকে প্যাক করে রেখেছিল, সেই খানটাতে। … তারপরেই আমাদের পরের গাড়ি ঢুকল। … আর আমরা এবার পুরো টিম হয়ে যাবার পর, পিছন ফিরে দেখি, মহারাজ গোবিন্দসখি আরো ছয়জনকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। …
আমাদেরকে দেখে প্রথমে একটু নজর দিলো, তারপর বিজয় আর আমাকে চিনতে পেরেই, চম্পট লাগানোর চেষ্টা করলো। … এই আন্ডারগ্রাউন্ডের থেকে একটা রাস্তা, গোবিন্দসখির ঘরে উঠছে। সেদিক দিয়েই ওরা এসেছিল, কিন্তু সেইদিক দিয়ে ওরা পালালো না। … ওরা আরো একটা রাস্তা নিলো। আমরা পিছন নিলাম। … ওরা দেখলাম, একটা দরজা দিয়ে পালাতে গেল, কিন্তু সেখানে সামনেই আমাদের দুইজন অফিসার আর বিশাল পুলিশ বাহিনী দাঁড়িয়ে ছিল, যারা ওদের সবকটাকে গ্রেফতার করে। ৬৪টা মেয়ে উদ্ধার হয়েছে। আর তাদের মধ্যে, একজনকে নিয়ে বিজয় আসছে।
বাবা কিছুক্ষণের মধ্যেই উপস্থিত হলেন, একজন অল্পবয়সী মেয়েকে নিয়ে। … মেয়েটির হাতে দেখলাম একটা স্যালাইনের পাউচ, আর হাতের মাঝে স্যালাইনের সিরিঞ্জ ঢোকানো। সমস্ত উদ্ধার হওয়া মেয়েকেই, এমন দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁদের শরীরে এই একমাস বা তার বেশি সময় ধরে যে ঘাটতি হয়েছে, তা পুড়ন করা যায়, আর সোডিয়াম লেভেল, পটাসিয়াম লেভেল, সব হাই করা যায়।
মেয়েটিকে নিয়ে এসে বাবা একটি সোফাতে বসালেন। এরপর সকলে সেখানে উপস্থিত… মানে, আমি, মা, বাসন্তীপিসি, রথিনকাকা, বিডিও স্যার, সিয়াইডিটিমের অন্য সদস্যরা, এমনকি নয়াভূমি থানার ওসি, সকলকে দেখে নিয়ে, বাবা এবার মুখ্যমন্ত্রীকে ভিডিও কল করলেন। কলে কথা হতে, বুঝলাম, আগে থেকেই সমস্ত কথা বলা ছিল। মুখ্যমন্ত্রীকে কল করে বাবা প্রনবেশ লাহিড়ীকেও কল করে, কল মার্জ করলেন আর তারপর, বাবা যেখানে দাঁড়িয়ে, সকলকে সমস্ত কথা বলবেন, ঠিক তার সামনে ফোনটাকে রাখলেন, যাতে তাঁকে মুখ্যমন্ত্রী ও লাহিড়ী মহাশয় শুনতে ও দেখতে পান।
এবার বাবা বলতে শুরু করলেন –
আমার বাড়িতে মহারাজ গবিন্দসখি আসেন সিয়াইডি অফিসার রথিন ব্যানার্জিকে নিয়ে। উনি আমাকে এই কেসের ব্যাপারে সূচনা দিতে আসেন, এমনই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু তিনি সূচনা বা কেসের কথা বলতে আসেন নি। তিনি আগে থেকেই জেনে গেছিলেন যে মুখ্যমন্ত্রী, এই কেস আমাকে দিচ্ছেন, আর তাই উনি আমার সাথে আলাপটা সেরে নিয়ে, আমাকে দেখে নিতে আসেন।
এবার কথা হলো খবর উনি পেলেন কি করে, আর কিই বা প্রমাণ করে যে তিনি এই খবর পেয়েই আমার সাথে দেখা করতে আসেন! … খবর দেন উনাকে, মুখ্যমন্ত্রীর অলক্ষ্যে, মুখ্যমন্ত্রীরই বিশ্বাসনীয় পাত্র বংশী, অর্থাৎ হ্যাঁ স্যার, আপনার বেয়ারা বংশী। কি করে বোঝা গেল? প্রথমত, আমি ও রথিন যেদিন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে যাই, সেদিন আমরা সেখানে যেতেই, আমরাই যে কেসটা হ্যান্ডেল করছি, সেই বার্তা দিতে তিনি মুখ্যমন্ত্রী যেই ঘরে বসে আমাদের সাথে কথা বলছিলেন, ঠিক তার পাশে, বাগানের দিকে চলে যান।
পূর্ব দিকে রোদ্দুর থাকায়, তাঁর মাথা ঘেমে যায়, মুখ্যমন্ত্রী ডাকার ফলে, হন্তদন্ত হয়ে আসার সময়ে, বাগানে যাবার আধখোলা দরজায় কাঁধ ধাক্কা লাগার কারণে, ছাপ যোগ হয় তাঁর জামার বাকাঁধে, আর ফোনটা সবে, হয় কেটে বা না কেটে, সে পকেটে বারবার ঢোকানো আছে কিনা, সেই দিকে নজর দিতে থাকেন। … যদিও এটা শুধুই সন্দেহ ছিল। কিন্তু রথিন গোবিন্দসখি এবং বংশীর কল্ রেকর্ড চেক করে, আমার সন্দেহটা কনফার্ম করে।
আমি কেসটা হ্যান্ডেল করছি, কনফার্ম খবর পাবার পরে, আমার বাড়ির কাছাকাছি, আর কলকাতা থেকে এনএইচ ৩৪ এ ঢোকার আগে, যশর রোডের মাথায়, মঠকর্তৃপক্ষ নিজেদের চর লাগিয়ে রেখে, আমাকে এই বিশয়ে ভাবতে বাধ্য করেন। … আর সেই দেখেই, আমার স্ত্রীর দ্বারা কথিত একটি কথায় মনোযোগ গেল। তিনি আমাকে বলেছিলেন, খালি ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি বা মন দিয়ে বিচার না করে, একটু চেতনা দিয়ে বিচার করতে।
আসলে আমি সমানে এমন ভেবে যাচ্ছিলাম যে নিশ্চয়ই বর্ডারের ওই পারে এই সমস্ত চালান হচ্ছে। কিন্তু আমি যেটা দেখছিলাম না, সেটা হলো ভিতরের ব্যাপারটা। উনার কথাকে গুরুত্ব দিয়েই, আমি নয়াভূমির মঠকে দেখতে যাবো এমন ঠিক করি। … আর সেই যাত্রাপথে, এই চরদের দেখে, আমার কাছে অঙ্ক মেলানোর জন্য কোন দিশায় যেতে হবে, তা বুঝতে শুরু করি।
নয়াভুমির এই মঠে প্রবেশের মুখ্যদ্বার অবশ্যই রাস্তা থেকে, কিন্তু এর প্রাচীরের ঠিক পিছনেই গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে। সেখানে কিছু দেখার মত থাকলেও থাকতে পারে। তাই রথিনকে বলাতে, সে নৌকাবিহারের ব্যবস্থা করে। আর সেখান থেকে আমি সেই দরজাটি দেখতে পাই, যেই দরজা দিয়ে পালানোর সময়ে, কালরাত্রে সাঙ্গপাঙ্গ সমেত গোবিন্দসখি ধরা পরেন। … তবে তখন দেখে কিছু বুঝিনি বলাই ঠিক হবে, তবে হ্যাঁ দেখেছিলাম সেই দরজাটা, আর এও দেখেছিলাম যে দরজাটার রঙ একদমই পাঁচিলের রঙের সাথে মেলানো, মানে যাতে দেখতে না পাওয়া যায়, তেমন করেই করা।
(ঈষৎ মনের খেয়ালে হেসে) শিল রূপী অষ্টপাশের একটি, অর্থাৎ গোপন করার ইচ্ছা যেখানে আছে, সেখানে অবশ্যই গোপন করারও কিছু থাকতে হবে। দেখেছিলাম, ভেবেছিলাম, কিন্তু পরে কাজে লাগতে পারে, এই ভেবে, সেই দৃশ্যকে স্মৃতিতে রেখে দিই। … এবার মুল মঠে, পর্যটকের মত আমি, রথিন ও আমার কন্যা আসি। আমার কন্যাকে গোবিন্দসখির সামনে বেরুতে দিইনি, তাই সে সকলের কাছে অপরিচিত, আর আমি এবং রথিন ছদ্মবেশে ছিলাম, তাই সকলের অলক্ষ্যেই ছিলাম। তবে সেখানে যা দেখি, তাতে আমার অঙ্ক মিলতে শুরু করে দেয়। … সেখানে দেখি, যেই জায়গায় গোবিন্দসখির কোয়ার্টার, ঠিক সেই জায়গারই পিছনে ওই গঙ্গার ধারে দরজাটা। … অর্থাৎ, সেই দরজা গোবিন্দসখির ঘরের সাথে কানেকটেড্, এটা তো নিশ্চিত হলাম। …
সঙ্গে সঙ্গে, কোয়ার্টারের পাসে রাস্তা, আর সেই রাস্তার পাস বরাবর ফুলের বাগান। … মজার জিনিস দেখলাম সেখানে। সমস্ত বাগানের সমস্ত ফুলগাছে প্রচুর প্রজাপতি, কিন্তু মহারাজ গোবিন্দসখির কোয়ার্টারের ঠিক উল্টোদিকে যেই বাগান, সেখানে একটিও প্রজাপতি নেই। … বুঝলাম যে সেখানের সমস্ত গাছ প্লাস্টিকের, সেগুলো গাছ নয়। … কিন্তু এই বিশেষত্ব কেন? সেটা খতিয়ে দেখতে একটু আগের দিকে এগোতেই নজরে এলো, সেখানে বেশ কিছু মোটা চাকার গাড়ির ছাপ রয়েছে, আরো খতিয়ে দেখতে, দেখলাম, একটা বৃত্তাকার লেয়ার মাটি, সেখানে যেন একটা নির্দিষ্ট আকারে সাজানো, যেটা বারে বারে ওঠা নামা হবার কারণে, সেই ধার বরাবর কিছু মাটি লেগে রয়েছে।
সন্দেহ এবার আমার কাছে দৃঢ়বিশ্বাসে পরিণত হয়ে গেছিল। … কিন্তু শুধুই অনুমানের ভিত্তিতে কিচ্ছু করা যাবেনা। মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি আছে আমার কাছে। সেটা দেখালেই ভিতরে যেতে পারবো, আশ্রমেও থাকতে পারবো, কিন্তু আমার উপস্থিতি ওদের কাছে রেড এলার্ট হয়ে যাবে। … তাই সিদ্ধান্ত নিই, এক সাঁড়াশী আক্রমণ করবো। … বাইরে থেকে ভিতরে কি ঢুকছে, সেটাও দেখবো। আর ভিতরে কি হচ্ছে সেটাও দেখবো। …
ভিতরের জিনিস দেখার জন্য, আমাকে কিছু গেম সাজাতে হতো। … তাই আমি সমস্ত সেই কন্যা, যাদের অপহরণ হয়ে গেছিল, তাদের সাথে জড়িত, যাদের যাদেরকে পেয়েছি, তাদের সাথে যোগাযোগ করে এটা জানি যে, যতজনকে অপহরণ করা হয়েছে, সকলেরই মঠ-এস্টেটে দেওয়ার মত কিছু ছিলনা। … আমি আমার গেমের ধারা পেয়ে যাই। তাই অতনু, আমার সিবিয়াই বন্ধুর সাথে কথা বলে, একটি এস্কর্ট সার্ভিসের মেয়ে যোগার করি। এই মেয়ের কথা আমি, অতনু অর্থাৎ সিবিয়াই অফিসার, আর আমার স্ত্রী, যাকে কিছু না বললেও, সে বুঝে গেছিল, এঁরা ছাড়া কেউ জানতেন না।
এই মেয়ে, নাম এমিলিকে টাকা দিয়ে, আমি ৪-৫ দিনের জন্য নিয়ে আসি আমার সাথে। আর এর ডানপায়ের বুড়োআঙুলের নখের উপরে আমার পরিচিত নার্সিং হোম থেকে একটি ক্যেমেরা ফিট করে, একটা এক্সট্রা নখ লাগিয়ে দিই। এবং একে এই মঠে শিখিয়ে পরিয়ে পাঠিয়ে দিই, আর ওর পায়ের ক্যামেরা থেকে যা কিছু রেকর্ড হয়, যা আমি সমানে আমার মোবাইলে দেখছিলাম, তা আমি এই পেনড্রাইভে আদালতে দেবার প্রমাণের মত করে আপলোড করে দিয়েছি। … এর কাছেও কিচ্ছু মঠকর্তৃপক্ষকে দেবার মত ছিলনা। তাই এর সাথেও তাই তাই হয়, যা অন্য ৬৩টি উদ্ধার করা মেয়ের সাথে হয়েছে। অর্থাৎ, এঁর কাছে এসে কেউ বলেন যে এই খানে যারা কিচ্ছু না দিয়ে থাকে, তাদের থাকতে গেলে, মহারাজের কাছে গিয়ে সেই কথা বলে নিতে হয়, নাহলে পরে এঁদের খুব অসুবিধা হয়।… মহারাজকে বলা থাকলে, আর কোন ধরনের অসুবিধা হবেনা।
সেই কথা বলার পর, সে মহারাজের কাছে যায়। আর মহারাজ নিজের ঘরে একটি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড়াতে বলেন, আর সেখানে দাঁড়ানোর পরেই, মহারাজের একটা টেকনিকাল কারিগুরি, আর সেই মেয়ে সোজা আন্ডারগ্রাউন্ডে পৌঁছে যায়, যেই খান থেকে আমরা কাল সকলকে উদ্ধার করি। কিন্তু এই স্থানে যাবার একটিই রাস্তা ছিল না। এই স্থানে যাবার দ্বিতীয় রাস্তাটি হলো, মহারাজের সামনের বাগানের ওই স্থান, যেটা দেখে আমার সন্দেহ হয়। …
কিন্তু আমার অনুমানকে এবার নিখুঁত করতে হবে, প্রমাণসাপেক্ষ করতে হবে, তাই ওই পাঁচিলের পাশেই তাঁবু খাটাই। ইরার পাঁচিলের বাইরে দোকানের তাঁবু দেওয়া যাবেনা, রথিন আমায় জানায়। তাই আমি মাটিখুরে লাইনের কাজ হচ্ছে, দেখানোর কথা বলে, একটি তাঁবু আর তাঁকে ঘিরে বেশ কিছু মাটি এরেঞ্জ করতে বলি। সমস্ত এরেঞ্জমেন্ট হয়ে যেতে একটু বেগ পেতে হয়। বিডিও স্যার সাহায্য করতে রেডি থাকলেও, এসডিপিও ম্যাম রাজি হননা।
কিন্তু বাসন্তীদি, আমার অত্যন্ত পরিচিত একজন অফিসার। … নিজের পরিচয় দিতে, উনি রাজি হয়ে গেলেন। আর আমি আমার কন্যাসহ সেখানে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই।
