অনাশ্রমে আশ্রিত | রহস্য গল্প

বাবা বললেন – এখনও রাত বাকি আছে, এই স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে ঢুকে ঘুমিয়ে পর। ব্যাগের মধ্যে পাখা আছে। নিশ্বাস ছাড়লে, সেই গতিতে চলবে পাখা। পায়ের দিকে হাওয়া পাবিনা। … একটু ঘুমিয়ে পর।

বাবা আছেন পাশে, আমি তাই দিব্যি ঘুমিয়ে নিলাম একচোট। ঘুম ভাঙতে বাবা বললেন – চা নিয়ে এসেছি। উঠে পর। … আমি বললাম – কটা বাজে?

বাবা – ৭টা।

আমি – কেউ কিছু প্রশ্ন করেছে! …

বাবা – না, ভাবতে পারেনি, পুরোটা সাজানো।

একটা তারের দিকে তাকিয়ে বললাম – এটা কিসের তার বাবা! … এই তারটা দেখেই তোমার কিছু সন্দেহ হয়?

বাবা – ধুর বোকা, এই তার ছিল এখানে! … এটা আমার ক্যামেরার তার। পাঁচিলের ওইপারে কি হচ্ছে, সেটা দেখার জন্য তার।

আমি – কিন্তু বাবা, কি হচ্ছে বলো তো! আমার মনে হচ্ছে, তুমি অনেকদূর এগিয়ে গেছ। কিন্তু কি ভাবে এগিয়েছ, কিছু তো বুঝতে পারছিনা! … একটা সূত্র টুত্র অন্তত দাও।

বাবা – সূত্র নিবি, তবে একটাই কথা বলবো, সূত্র অনেক আছে। তারিখগুলোতে সূত্র আছে, যদি মেলাতে পারিস। … নৌকাকে যখন পারের কাছে নিয়ে যেতে বলেছিলাম, সেইখান থেকে যেই দৃশ্য দেখেছিলাম, তাতেও সূত্র আছে, আবার মহারাজদের কোয়ার্টারসের ম্যাপেও সূত্র আছে। আর সব থেকে বড় সূত্র, এই দেওয়ালের ওই পারে আছে। … বুঝতে পারিসনি এখনো, তবে শীঘ্রই বুঝতে পারবি।

আমি – কোন সূত্র দিলে না আমাকে। যেই যেই জায়গায় সূত্র আছে বললে, সেখানের কোন সূত্রই তো আমার মাথায় ঢুকছে না! … কিন্তু তারিখের ব্যাপারে! …

বাবা – একটা ভুল করছিলাম জানিস। ভাবছিলাম বাংলাদেশে পাচার হচ্ছে মেয়েগুলো। … তবে তেমনটা নয়। তবে এটার ক্রেডিট কিন্তু তোর মায়ের। মহাভারতের মর্মার্থ খোঁজো। … ওই একটা কথাতেই সমস্ত সূত্র দিয়ে দিলেন ওই মহীয়সী ভদ্রমহিলা।

আমি – আচ্ছা বাবা, এখানে কতদিন এক্যাক্টলি থাকতে হবে?

বাবা – থাকতে কষ্ট হচ্ছে? ব্যবস্থা করে দেব, বাড়ি যাবি?

আমি রেগে গিয়ে বললাম – ধুত, আমি সেই কথা বললাম! … কেসের জন্য জিজ্ঞেস করছি।

বাবা – তারিখগুলো বল একবার।

আমি – টু ইচ, উজ্জয়েন, নাগপুর অ্যান্ড বাঙ্গালুরু … ডেটটা হলো ২২শে ফেব্রুয়ারি, পয়লা মার্চ, ৮ই মার্চ, আর রিসেন্টলি, ১৫ই মার্চ। … অন্যদিকে, … টু ইচ ফ্রম চণ্ডীগড়, দিল্লি, আর আগ্রা, অন ডি ডেট অফ ২৩রড ফেব্রুয়ারি, ২ন্ড মার্চ, ১০থ মার্চ, আর ১৭থ মার্চ।

বাবা – ২৪, ৩, ১০, ১৭ তারমানে ২৪। আজ কত তারিখ?

আমি – ২৩শে মার্চ। …

বাবা – হ্যাঁ তারমানে, আজ আর কাল থাকবো। পরশু সকালে ব্যাগপত্তর গুছিয়ে, বাড়ি।

আমি – ব্যাস! … তুমি যে বললে, ৭-১০ দিন।

বাবা – তোর মা জানেন, দুদিনের ব্যাপার।

বুঝলাম না কিছুই। সত্যি বলতে কি যে বুঝতে হবে, তাই বুঝলাম না। … বাবা ক্যামেরা রেখেছে, কিন্তু এই দেওয়ালেই, আর এইখানেই কেন সেটা, আমি সেটাও বুঝলাম না। সেদিন সন্ধ্যাবেলায়, গায়ে অডমশ মেখে দুইজনে বসে ছিলাম। ফোনেই একটা বই পরছিলাম। আর বাবাও বোধহয় তেমনই কিছু করছিলেন।

খালি ৮টা নাগাদ, বাবার কানগুলো দেখলাম লাল হয়ে উঠলো, আর ভ্রুটা খুব কুঁচকে গেল। …

আমি বললাম – কোন থ্রিলার দেখছো?

বাবা বললেন – হুম, রিয়েল টাইম ক্রাইম দেখছি।

২৪ তারিখও যথারীতি দিন চলল। খুব বিরক্ত লাগছিল। কোন কাজ নেই। সারাদিন কত গল্পের বই পরবো। পাশেই গঙ্গা, কিন্তু যাবার জো নেই। স্নান নেই, গঙ্গার ঘাটে খোলায় গিয়ে বাথরুম। সারাদিনে কিচ্ছু ঘটেনি। সন্ধ্যার সময়ে খালি কিছু গেরুয়া টাকমাথা লোক এলেন। বাবা বাঁকুড়ার ভাষায় বললেন – এই আজকে হলেই শেষ হয়ে যাবে। একটা কেবেল ফেঁসে গেছিল, টানা যাচ্ছিল না।

লোকগুলো চলে গেল, রাত্রে বাবা কালকের মতই ডিমতড়কা আর রুটি এনে খাওয়ালেন। স্বাদ ভালো না। লঙ্কা আর পিয়াজ দিয়ে কোনরকমে খেয়ে নিলাম। … খেতে খেতেই বাবা বললেন, দুটো গাড়ি আসবে, গাড়িগুলো ঢুকলেই এই স্ক্রিনে চোখ রাখবি, গাড়ির নম্বরগুলো এসেন্সিয়াল।

এবার আমার ভ্রু কুঁচকে গেল, তবে সন্দেহে নয়, কিচ্ছু না বুঝতে পারার জন্য। … তবে বাবা একদমই সঠিক বলেছিলেন। ঠিক রাত ১.৩০টা নাগাদ, পরপর দুটো কালো বলেরো গাড়ি এসে ইরার গেটে দাঁড়ালো। আমি বাবার দিকে তাকাতেই, বাবা ঈসারা করে স্ক্রিনে দেখতে বললেন। … গাড়িগুলো ঠিক আমাদের পাঁচিলের পিছনের বাগানের মাঝে গিয়েই দাঁড়ালো। নম্বর নোট করলাম – ইউকে০৮টিএ৬৭৯১ আর ওডি২৮জি৯৭৩৪।

কিন্তু গাড়ির নম্বর দেখার পর যা দেখলাম, তা দেখে আমি হতবম্ব হয়ে গেলাম। দেখলাম গাড়িগুলো আপনাআপনি মাটির নিচে নেমে গেল। আর বাগানটা আবার আগের মত হয়ে গেল। আমি যে কি ভাববো, আর কি বলবো, কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। … বাবা এরই মধ্যে, এই দিকে যেন অমনোযোগী। উনি আবার কি যেন ফোনে দেখছেন। … শুধু আমি যেই স্ক্রিনটায় দেখছিলাম, সেটার রেকর্ডিংটা বন্ধ করে দিলেন।

কিন্তু আমি দেখলাম বাবা যেন নিজের ফোনের স্ক্রিনে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কিছু দেখছেন। এমন কি দেখছেন, যা এই কেসের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন গুরুত্বপূর্ণ যে, একবারও এই অদ্ভুত দৃশ্য, যা দেখে আমি বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গেলাম, সেটার দিকে তাকালেনও না!

আমি এতটাই হতবম্ব হয়ে গেছিলাম যে, কিচ্ছু ভাবতে পারছিলাম না। খানিক পরে, বাবারই ফিসফিসে কণ্ঠস্বরে ঘুম ভাঙলো। রথিনকাকাকে ফোন করছেন। যেখানে আমাদেরকে ছেড়েছিল গাড়ি, সেখানে ঠিক ৩.৪৫এ দাঁড়াতে বললেন। আমি বোধহয় বসে বসেই খানিক ঘুমিয়ে পরেছিলাম। … নাহলে ১.৩০টার সময়ে ঘড়ি দেখেছিলাম, আর এখন ৩.১৫, এতো সময় কখন কিভাবে চলে গেল।

ব্যাগ গছানো। বাবা আমাকে নিয়ে সটাং হাটা দিলেন। তবে যেই পথে এসেছিলাম, সেই পথে নয়। গঙ্গার ধারের দিকে হাঁটলেন। গঙ্গার জল দেখতে পাচ্ছি, সেই সময়ে বাঁদিকের একটা গলিতে ঘুরে গেলেন। তারপর তস্যগলি তস্যগলি করে, আমরা পৌঁছলাম রথিনকাকুর গাড়ির সামনে। … একটাও কথা নয়। গাড়ি ছুটে চললো কলকাতার দিকে। …

রানাঘাট ছেরে যাবার পর, রথিনকাকা প্রথম কথা বললেন – তুমি যা ধারনা করেছিলে, তাই তাই হয়েছে নিশ্চয়ই।

বাবা – হ্যাঁ। এখানে কোন কথা নয়। বাড়ি চলো। বসে কথা হবে। …

আমরা বাড়ি ঢুকলাম এই ৬টা নাগাদ। মা বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। বাবা ফোন করে দিয়েছিলেন রাস্তা থেকেই। বাড়িতে ঢুকতেই, মা বললেন – যাও একজন একজন করে বাথরুমে গিয়ে ফ্রেস হয়ে স্নান করে এসো। … বাবা প্রথম আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। সমস্ত ক্রিয়াকলাপ করে, আমি আসার পর, বাবা ঢুকলেন বাথরুমে। ঠিক ১০ মিনিটের মধ্যে বাবা ফ্রেস হয়ে চলে এলেন। লুঙ্গির মত করে, মায়ের সেলাই করা ধুতিটা গলিয়ে, চুল আঁচরে, ভিজে গায়ে, যেমন বাবা বসেন, তেমন ভাবেই বসলেন।

সঙ্গে সঙ্গে মা, আমাকে আর বাবাকে আর সঙ্গে নিজের ও রথিনকাকুর জন্য গরমগরম চা নিয়ে এলেন। চা খেতে খেতে বাবা আমাকে বললেন – রথিনকাকুকে গাড়ির নম্বরগুলো দে।

আমি দিয়ে দিলাম – ইউকে০৮টিএ৬৭৯১ আর ওডি২৮জি৯৭৩৪।

বাবা বললেন, কোন চেকপোস্ট দিয়ে মুর্শিদাবাদ ঢুকেছে গারিগুলো, তাড়াতাড়ি খবর নাও রথিন। আর চেক করো, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ৩রা মার্চ, ১০ই মার্চ আর ১৭মার্চ, এই একই গাড়ি ওই চেকপোস্ট দিয়েই ঢুকেছে কিনা। … বলো, এই খবর কবে দেবে আমাকে?

রথিন কাকা – আমার টিম ওখানেই আছে। আমি এখনই বলে দিচ্ছি, আজকের মধ্যেই খবর চলে আসবে।

বাবা বললেন – ভেরি গুড।

রথিন কাকা বললেন – কিছু বলবে আর কেসের ব্যাপারে? …মানে জানতে ইচ্ছা করছে? … মানে, কি ভাবে বুঝলে, ডেটগুলোই বা কি করে! … আর …

বাবা – সব জেনে যাবে সময় হলে রথিন। … সকলকে সব বলবো। … মুখ্যমন্ত্রীর সাথেও কথা হয়েছে। … উনাকেও ভিডিও কলে নিয়ে সমস্ত কিছু ডিস্‌ক্লোজ করবো। … চিন্তা করো না। … হাতে না হাতে ধরতে হবে। … প্রমাণ তো এখনই পেয়েগেছি, একবারে সাজা দেবার মতন প্রমাণ। তবে যেই প্রমাণগুলো আছে, সেগুলো যে সত্যপ্রমাণ, মানে মানিপুলেটেড প্রমাণ নয়, সেটা প্রমাণ করতে গেলে, আদালত থেকে, আসামী গ্যাঁটের জোরে বেড়িয়ে যাবে। … তাই হাতেনাহাতে প্রমাণ দরকার। … আগে তুমি আমাকে ডিটেলস্‌, যেটা চাইলাম, সেটা দাও। … পরের প্ল্যান অফ একশন বলছি।

রথিনকাকু – মনে হচ্ছে টিম লাগবে, এবারে তাই না?

বাবা – শুধু টিমে হবেনা। এবার প্রচুর অস্ত্রও লাগবে। … আচ্ছা আরেকটা জিনিস আমাকে জেনে জানাও, ওই ছটা জায়গায়, আর কোন মিসিং ডায়েরি হয়েছে কিনা, সেটাও জানাও।

রথিনকাকু উঠে পরলেন। আমি তোমাকে সন্ধ্যার মধ্যে জানাচ্ছি সমস্ত কিছু। …

বাবা – যদি মিসিং ডায়েরি হয়ে থাকে, তবে তোমার পুরো টিমকে আজ ভিডিও কনফারেন্সে রাখবে সন্ধ্যায়, আর কনফারেন্সটা হবে, তোমার বোন, সুমনার বাড়িতে। …

রথিনকাকু সেই কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে আমার দিকে তাকালে, আমিও ঠোঁট বেঁকিয়ে বলে দিলাম, আমি কিচ্ছু বুঝতে পাচ্ছিনা।

বাবা সেই দিকে উপেক্ষা করে মাকে বললেন – দুদিনে বাড়ির আশেপাশে কোন মাথাকামানো লোক দেখলে?

মা বললেন – দুজন, আশেপাশেই ঘোরাফেরা করছে।

বাবা – রথিন, মুখ্যমন্ত্রীর বেয়ারার নাম কি?

রথিনকাকু বলার আগেই আমি বললাম – বংশী

বাবা – হুম। সে ব্যাটার মহারাজ গোবিন্দসখির সাথে খুব দহরমমহরম। ওর বাড়িতে খবর নিয়ে জেনেছি। … আর ও এটুকু খবর দিয়ে দিয়েছে যে, আমাকে এই কেসের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই আমার উপর নজরদারি করার জন্য, ওই দুই মাথাকামানো মঠের লোক।

রথিন কাকু – কিন্তু খবর সে দিল কখন, আর কতটা খবর দিয়েছে? সেখানে তো ছদ্মবেশ ইত্যাদি, অনেক কথাই হয়েছে। …

বাবা – না, অতো কথা ও বলেনি। … তুমি কোন কেস নিয়ে এসেছ, সে জানে। … আর তোমার সাথে আমি। আমার নাম আর পেশা জানার পরই, খবর চলে যায়। … যখন স্যান্যাল মহাশয় উনাকে ডাকেন, উনি তড়িঘড়ি করে ঢোকেন ঘরে, আর একটু দেরি করেই ঢোকেন। … মানে, পাঁচিলের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই খবর দিয়েছে। ওর মাথায় নতুন যুক্ত হওয়া ঘাম ইঙ্গিত করে যে ওর মাথায় কাঁচা রোদ পরেছে।

বাবা বলতে থাকলেন – আর ওর দুইদুইবার যেই পকেটে ফোন, সেই পকেটে খোঁচা মারা বলে দিল, সেই মাত্র ও ফোনটা পকেটে ঢুকিয়েছে। … মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের ঠিক সামনেই বাঁদিকে একটা বাগানে যাবার দরজা, যেটা আমরা প্রবেশ করার সময়ে দেখেছিলাম বন্ধ। কিন্তু আসবার সময়ে দেখি একটা পাল্লা খোলা। … ও তাড়াতাড়ি করে আসার সময়ে, কাঁধে ধাক্কা খেয়েছিল, তাই ওর জামার কাঁধের দিকে একটা ঘষা দাগ যোগ হয়েছিল। আর মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের ঠিক বাঁদিকটাই পূর্বদিক। তারমানে, ওখানে দাঁড়িয়েই ও ফোনে কথা বলছিল।

শেষ করলেন বাবা – অন্য কোন ফোন করতেও যেতে পারেন উনি। তাই আগে বলিনি। মাথাকামানো লোক ঘোরাফেরা করছে কনফার্ম হয়ে নিয়ে বললাম। …

রথিন কাকা – কিন্তু তোমার কি মনে হয়? শুধু এইখানেই মঠের চর থাকবে? এখান থেকে গাড়ি নিয়ে কোথায় গেলে, তার খবর থাকবে না?

বাবা – নৌকাবিহারে যাবার আগে, ওদের চর নির্বাচন হয়নি। … তাই ওটা ওরা জানেনা। … তবে, যেদিন তাঁবুতে গেলাম, সেদিন আমার উপর নজর রাখা হয়েছিল। … কিন্তু চিন্তা করো না। … আমরা এখান থেকে বারাসাত পেরিয়ে, সন্ডালিয়া পর্যন্ত অতনুর ইউজ না করা গাড়িতে যাই।

রথিনকাকু – ওই জন্য তুমি সন্ডালিয়া থেকে তোমাকে তুলতে বলেছিলে?

বাবা হেসে বললেন – হ্যাঁ। ওই গাড়ি, ওখান থেকে ফিরে আসে দুপুর বেলায়। আমাদের বাড়ির গেটে গাড়ি ঢোকে, তারপর অতনুর বাড়ি যায়। গাড়ির ড্রাইভার অতনু নিজে ছিল।

রথিনকাকু – এক্সিলেন্ট লাগে তোমার প্ল্যানিং। … কিন্তু আমাকে একটা কথা বলো। এখানে যেই মাথাকামানো গুলো আছে, ওদের থেকে কোন তোমার বা তোমার পরিবারের অসুবিধা নেই তো?

বাবা – না, ওরা অতো ডেঞ্জারাস নয়। ওরা ইনফ্লুয়েন্সিং খুব, কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে ওরা সকলে ভিতু। … তবে, হ্যাঁ, নেক্সট যেদিন যাবো। সেদিন আমি, মিলি আর মাধবি ট্রেনে বনগাঁ যাবো। ওখান থেকে অতনুর ওই গাড়ি আমাদের পিকাপ করে, সোজাসুজি বাসন্তীদির কোয়ার্টারে। সেখানে মিলি আর মাধবিকে ড্রপ করে, আমি তোমাদের জয়েন করবো চেকপোস্টে।

আমি বললাম – আমি যাবো না?

বাবা – সেদিন অস্ত্র চলবে। … হাতাপায়িও হবে। দুর্বল কেউ থাকলে, আমরা ফেঁসে যেতে পারি মিলি। শো, সেই শেষ সময়ে কি হয়, তার গল্প রথিনকাকুই তোকে বলে দেবে।

আমি আর বেগরবাই করলাম না। আমার উপস্থিতিতে যদি কেস গরবর হয়ে যায়, তাহলে, আমার সরে থাকাটাই সঠিক।

রথিনকাকু সেই সময়ের মত চলে গেলেন। সন্ধ্যাবেলায় আমি, মা আর বাবা গেলাম সুমনাপিসির বাড়ি। সুমনাপিসি রথিনকাকুর বোন। উনি মায়ের ক্লাসফ্রেন্ড ছিলেন। উনিও একজন রিপোর্টার। পেজ থ্রি রিপোর্টার। উনার মাধ্যমেই বাবাকে রিপোর্টারের কাজে রথিনকাকু ঢুকিয়েছিলেন। … মাকে খুব স্নেহ করেন উনি, আর বাবার একজন গুনমুগ্ধকর ফ্যান বললেও ভুল বলা হয়না।

রাতের ডিনারটা ওখানেই হবে। … রথিনকাকুও সঠিক সময়ে এসে গেলেন। … বাবার উদ্দেশ্যে, ব্রিটিশদের স্টাইলে বাঁ-বুকে ডানহাতের তালু রেখে, কোমর ভেঙে বললেন – ইউওর হাইনেস। তুমি একদম সঠিক ছিলে। যেই যেই ডেট বলেছ, সেই সেই ডেটে, একই সময়ে, অর্থাৎ রাত্রি ১টা নাগাদ, ওই গাড়িগুলো মুর্শিদাবাদ রামপুরহাট চেকপোস্ট দিয়ে প্রবেশ করেছে। … আর হ্যাঁ, পরশু ৬টা জায়গাতেই ডায়রি করা হয়েছে। … বস্‌, তোমায় ভাগ্যিস সিয়াইডিতে ঢোকাইনি, নাহলে নির্ঘাত আমাদের চাকরি মারা যেত, ১০০ পারসেন্ট।

বাবা হেসে – তোমার টিমকে বলেছ?

রথিন কাকু – হ্যাঁ, ডে আর রেডি। এখনই করবে।

বাবা – হ্যাঁ শুভ কাজে দেরি কেন?

রথিনকাকু ভিডিও কল করলেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কল ধরে নেওয়া হলো। বোধহয় অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা। কল লাগতেই বাবা বললেন – হ্যালো অফিসারস্‌, আমার নাম আপনারা জানেন, বিজয় সিংহ। আমি একজন রিপোর্টার, কোন অফিসার নই। বাট, মুখ্যমন্ত্রীর সুপারিস, তাই আমাকে এই কেসের চার্জ দেওয়া হয়েছে। তাই, আনফচুনেটলি, বাট অফিসিয়ালি আমি এই কেসে, আপনাদের বস্‌। কিন্তু আমাকে বস্‌ মনে করার কোন কারণ নেই, কারণ আপনারা সকলেই যথাযথ অভিজ্ঞ।

অন্যদিকের কিছু লোক বললেন – স্যার সিন, আমরা প্রায় সকলেই আপনার ফ্যান ছিলাম কমবেশি, আর যেই ভাবে আপনি এই কেসটা হ্যান্ডেল করেছেন, আমরা ফুল ফ্লেজেড ফ্যান হয়ে গেছি আপনার। … সো, ওয়িদআউট হেসিটেশন, আমাদের নেক্সট প্ল্যান বলুন।

বাবা – আপনারা সংখ্যা কজন আছেন।

উত্তর রথিনকাকু দিলেন – ১২ জন।

বাবা বললেন – আরো ৬ জন অফিসার হবেন? নাকি এটাই এসাইনড্‌?

রথিন কাকু বললেন – স্যাংশন ২০ জনের আছে। … বললেই করে নেওয়া যাবে।

বাবা – বলেরোতে কজন ধরে?

উত্তর ভিডিওকল থেকে এলো – ১০ জন।

বাবা – তাহলে ডেকে নাও ২০ জনকে। তবে অনলী ফর ৩১স্ট এর অপরেশনের জন্য।

রথিনকাউ বললেন – ওকে তাহলে ২৯থ-এ, ৩০থ-এ আর ৩১স্ট-এ তিনজন তিনজন করে ডেকে নেব।

বাবা এবার বললেন – ওকে, গাড়ির নম্বর, রথিন তোমাদের বলে দিয়েছে। চেকপোস্ট ক্রস করার পরেই, আমাদের ওই গাড়িদুটোকে হামলা করতে হবে। আর খুব তাড়াতাড়ি, যাতে ওরা কোন রকম কোন ইনফরমেশন দিতে না পারে। সেই অবস্থায়, ওদের মারধর করে, বন্দি করে, ওদের দুটো বলেরো চলে যাবে সিয়াইডি কাস্টডিতে। … তারপর, সেখান থেকেই ৪জন এফিসিয়েন্ট অফিসার থাকবে, ওদের গার্ড করার জন্য। আর অন্য ১২ জন, আমি আর রথিন সন্ন্যাসী সেজে, নয়াভূমির মঠে চলে যাবো। সামনের গাড়িতে আমি থাকবো। যেমন যেমন সামনের গাড়ি যাবে, তেমন তেমন পিছনের গাড়িও যাবে।

সেখান থেকে যেখানে পউছাবো আমরা, সেখানে গিয়ে, কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করবে। কিন্তু রথিনকে আমি গঙ্গার দিকের দরজা দেখিয়ে দিয়েছি, সেই দরজার সামনে ও দুজন অফিসারকে পুলিশ-ব্যাটিলিয়ান সমেত দাঁড় করিয়ে রাখবে, তারা সেই লোকগুলোকে ধরে নিয়ে কাস্টডিতে নেবে। আর আমাদেরকে উইথ হিউজ ব্যাটিলিয়ান অফ পুলিশ, ওখান থেকে প্রায় ৬০টা মত মেয়েকে উদ্ধার করতে হবে। ব্যাস, এই আমাদের এক্‌সন হবে।

ভিডিও-কল সমাপ্ত হলো। সেদিন রাত্রে আমরা সকলে দারুণ ডিনার করলাম। মা আর সুমনাপিসি একসঙ্গে ডিনার রেডি করলেন। ইন্ডিয়ান স্টাইল ফ্রায়েড রাইস, আর মুরগী কষা। জমিয়ে খেলাম, আর সাথে রথিনকাকার থেকে বিভিন্ন বাবার কীর্তি জানলাম। … মা-কে দেখলাম, প্রায় সবই জানেন। সুমনাপিসিও অনেকগুলিই জানেন। কেবল একটিই কথা বারবার বললেন – বিজয়দা, একটা কেসে আমি তোমার সাথে কাজ করতে চাই। … কাছ থেকে দেখতে চাই, তোমার কাজ করার ধরন কেমন। … কিন্তু আনফরচ্যুনেটলি, আমার ফিল্ডে তুমি কাজই করবে না। যেই এডভেঞ্চারাস কাজ তুমি করো, তার কাছে আমাদের কাজটা পুরো স্তিডিও টাইপ।

বাবা শেষে হেসে বললেন – রেইকি বলে একটা থেরাপি হয় জানো?… পিসি হ্যাঁ বলতে, বাবা আবার বললেন – রেইকিতে বলা হয়, ল’ অফ এট্রাকশন। … মানে তুমি যা নিয়ে দিনরাত ভাববে, সেটাই হবে। … আমাদের ঋষিরাও একই কথা বলতেন। তাঁরা বলতেন, সকলে নিজের নিজের ব্রহ্মাণ্ডে বাস করেন। তাই যে যেমন ভাববেন, তার ব্রহ্মাণ্ডে তেমনই ঘটবে। … তাই সুমনা, হওয়াই ডোন্ট ইউ থিংক ডেডলি আবউট আ কেস উইথ মি। … দেখ করে, হলেও হয়ে যেতে পারে। কে বলতে পারে, সময়ের গর্ভে কি আছে।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6