অনাশ্রমে আশ্রিত | রহস্য গল্প

বাবা লাঞ্চ করে বেড়িয়ে গেলেন। সন্ধ্যায় ফিরে এলেন, ঠিক চা খাওয়ার সময়ে। … এসেই প্রথম কথা আমাকে বললেন – তোর রথিনকাকা এরেঞ্জমেন্ট করে নিয়েছে। … কাল ভোর ৩টের সময়ে, গাড়ি নিয়ে আসবে সে। … ৪টের মধ্যে হাজারদুয়ারির ধারে গঙ্গায় গমন। সেখান থেকে নৌকা বিহার করে, অম্বিকা কালনা। … ওখান থেকে গাড়ি করে নয়াভূমির মঠ। … পর্যটকের বেশে, আমি আর তুই একটু ঘুরে দেখে আসবো।

মা বললেন – পেলে কারুকে?

বাবা – হুম, বহু কষ্টে। তবে লিথারজি নার্সিংহোমে নিয়ে যেতে হবে একবার।

মা – টেস্টিং না ইন্সটলেশন?

বাবা – ইন্সটলেশন।

এই সব কথার মানে কি? … একি কোন কোডওয়ার্ড! সত্যি বলছি, আগে আমার কাছে শুধু বাবাই একটা রহস্য ছিলেন, এখন আস্তে আস্তে মাও রহস্য হয়ে যাচ্ছেন। … এই ধরনের কথা মা আগেও বলতেন। কিন্তু আমি যেহেতু কেসের সাথে ইনভল্ভড্‌ থাকতাম না, তাই বুঝতে পারতাম না। এখনও বুঝতে পারছি না, তবে কেসের সাথে ইনভল্ভড্‌, তাই বুঝতে পারছি যে কেসের ব্যাপারেই কথা হচ্ছে।

মনের মধ্যে আমার পরমাসুন্দরি মা-কে নিয়ে প্রচুর প্রশ্ন জাগছিল। তাই মা চা করার জন্য রান্নাঘরে থাকা অবস্থাতেই, আমি তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে বললাম – আচ্ছা মা! … কেসের মধ্যে বাবা তোমাকে কখনো ফোন করেন?

মা হেসে বললেন – আপডেট দেন। তবে রাস্তা খুঁজে না পেলে, আমার সাথে প্রায় এক ঘণ্টা মতন কথা বলেন। উনি বলেন, আমার সাথে কথা বললে নাকি, উনার মাথা খুলে যায়।

কি মনে হলো, মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরলাম। … মা বললেন – কি হলো আবার … সর, গরম চা, গায়ে পরে গেলে, ফোস্কা পরে যাবে।

আমি বললাম – আমার না খালি বাবাকে নিয়েই গর্ব হতো, এখন তোমাকে নিয়েও হচ্ছে।

মা হেসে বললেন – স্বামীস্ত্রীর যতই আলাদা আলাদা আধার কার্ড হোক, তাঁরা কখনোই দুই নন। তাঁরা ফুল আর ফুলের ডাটি।

মা চা নিয়ে চলে গেলেন, আমি নোনতা বিস্কুটের কৌটো নিয়ে টি-টেবিলে পৌছাতে পৌছাতে অনুভব করলাম, এমন পিতামাতার সন্তান হয়ে, আমি সত্যিই প্রচণ্ড লাকি।

সেদিনে, আমাকে আর বাবাকে মা সন্ধ্যে ৮টার মধ্যে ডিনার করিয়ে, নটার মধ্যে ঘুম পারিয়ে দিলেন। ঠিক মধ্যরাত ২টোর সময়ে, মা আমাকে আর বাবাকে ডেকে দিলেন। … আমরা উঠে ড্রেস করে রেডি হতেই, রথিনকাকা একটা স্করপিও গাড়ি নিয়ে হাজির। … মাকে দুর্গা দুর্গা বলতে শুনে, গাড়িতে উঠলাম। গাড়িতে উঠে বাবাকে বললাম – তুমি বাইরে কেস সমাধান করো, তো মা ঘরে।

রথিনকাকা হেসে বললেন – তাহলে মিলি, বাইরে বেড়তে, মা-কে চিনতে পারলো। … বিজয়, ইউ আর রাইট হেয়ার টু।

বাবা হেসে বললেন – যার সাথে থাকা হয়, তার প্রতিভা বোঝা বড়ই কঠিন হয় রথিন। … আমাকে ও বাইরে বাইরে দেখতো, তাই ভাবতো আমি একজন ব্রিলিয়ান্ট, কিন্তু ওর মা একজন অবোধ। … আজ মাকে দূর থেকে দেখছে, তাই ও মায়ের ব্রিলিয়ান্সিটা বুঝতে পারছে।

রথিনকাকা বললেন – তোমার বুদ্ধির স্পিড না হয় বুঝলাম, সেটা আমাদের ধরাছোঁয়ার বাইরে। … কিন্তু এই মনকে বুঝে নেবার ক্ষমতা কি এক গোয়েন্দা বা এক রিপোর্টারের গুনের মধ্যে পরে? ব্যোমকেশকেও দেখেছি সত্যবতী বা শকুন্তলার মন পরতে হিমসিম খেতে হয়েছে। আবার প্রদোষচন্দ্র মিটারকেও দেখেছি, মনের ভাষা পরতে, উনাকেও বেশ ঘুরপাক খেতে হয়েছে বইকি। … ইউ আর এন এক্সেপ্সন ইন ডিস কেস।

বাবা বললেন – তুমি আমাকে রিপোর্টার হবার আগে থেকে চেন। … ইনফ্যাক্ট, তুমিই আমাকে রিপোর্টার হতে বলেছিলে, আর রাস্তা দেখিয়েছিলে। … আমি তো একজন আন-কেরিয়ারিস্টিক আধ্যাত্মিক ধ্যান-ধারনায় মত্ত যুবক ছিলাম। মনে আছে সেই কথা!

রথিনকাকা বললেন – এখানে মাধবিলতার ভূমিকাও কম নয়। … ওর তোমাকে খুব পছন্দ ছিল, আর তুমি কিছু করতেই না, তাই বাড়িতেও বলতে পারছিল না। … সে আমাকে এসে বলতো, রথিনদা, কিছু করো না। … আমি বলেছিলাম, একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। … তো মাধবিলতা আমাকে বলল, না উনাকে কিছু চ্যালেঞ্জিং কাজ দাও। … উনি সবসময়ে আধ্যাত্মিক তত্ত্ব উদ্ঘাটনে মন রাখেন। … যার মন এতো গভীরে চলে গেছে, তার মন ১০টা ৫টার কাজে বসবে না। … অদ্ভুত চেনে তোমাকে ও, জানো?

বাবা – শুধু চেনেন না, আমি যেমন, তেমনটাকেই ভালোবাসেন। … কটা মেয়ে, একটা আধ্যাত্মিক উন্মাদে মন রাখতে পারে বলো। … ও শুধু আমাকে চেনেই না, আমার সমস্তটাকে স্নেহ করে, সম্মান করে, আর ভালোবাসে।

রথিনকাকা একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে বসলেন। মাঝে আমরা রানাঘাটে, এনএইচ ৩৪এ দাঁড়িয়ে চা খেয়েছিলাম, তখন রথিনকাকাকে প্রশ্ন করেছিলাম, মা-বাবার ব্যাপারে। … উনি একটাই কথা বললেন, আ হেভেন মেড কম্বিনেশন। নাহলে, কামনাবাসনা ছাড়া, এমন গভীর সম্পর্ক হয়!

আর কথা বারাইনি। শুধু ভেবে কূলকিনারা না করতে পারার যে কি আনন্দ, সেটা উপভোগ করছিলাম। জানলার দিকে তাকিয়ে, ভোরের হাওয়া খেতে খেতে, সেই আনন্দ উপভোগ করতে করতে, এসে পৌঁছলাম হাজারদুয়ারির পিছনে গঙ্গার ঘাটে। নৌকা রেডি। … বাবার কথামত, মা আমাকে চরা –মেকআপ করিয়ে দিয়েছেন। … দেখে মনে হচ্ছে, পুরো ছটপুজোর সময়ের বিহারি মেয়ে। … বাবা একটা চাপ লালচে দাড়ি লাগিয়েছেন। মাথায় ফিশিং হ্যাট। গলায় ক্যাননের ক্যামেরা। ফুলস্লিভ জামা, আর জিন্সের প্যান্ট। … দেখে মনে হচ্ছে ওয়ার্ল্ডট্যুর করা একজন ফটোগ্রাফার। … চোখে গগলস্‌।

রথিনকাকাকে প্রশ্ন করেছিলাম – বাবা চোখটা সবসময়ে ঢেকে রাখেন কেন?

রথিনকাকা বলেছিলেন – দাড়িগোঁফ দিয়ে ও সব ঢাকতে পারলেও, ওর ব্রাইট আইজকে না ঢাকলে, ওর ব্রিলিয়ান্সি যেকেউ ধরে ফেলবে। তাই এই চশমা।

যাইহোক। এখন অসব ভাবনা টাবনার নয়। … নৌকায় গঙ্গাবিহারে চুটিয়ে আনন্দ। … ভোরের ফুরফুরে হাওয়া। … গঙ্গার পবিত্রতা। … সব মিশিয়ে, মন-শরীর, সর্বত্র একটা শিহরন খেলে যাচ্ছিল। … ইরার পাঁচিল পেলাম এই আধঘণ্টা নৌকা চলার পর। … বাবার দৃষ্টি দেখলাম স্থির, চোখের পাতাও পরছেনা। … বিশাল বড় মঠ। প্রায় ২০ মিনিট লাগলো, মঠের পাঁচিল শেষ করতে। বাবা শুধু দর্শক। মাঝে খালি মাঝিকে একটু পারের কাছাকাছি নিয়ে আস্তে বলেছিলেন এক জায়গায়। … যেন কিছু নিরীক্ষণ করে নিলেন। তারপর আবার সেই দর্শক। …

ইরার পাঁচিল পেরোনোর প্রায় আধঘণ্টা পরে অম্বিকা কালনায় আমাদের নৌকা থামলো। … রথিনকাকা ঘাটেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। … আমরা যেতে, আমাদেরকে রিসিভ করলেন। … আমার নিজের কাকা নেই, কিন্তু রথিনকাকা আমার নিজের কাকার মতই। … ছোট থেকে উনাকে চিনি। … বাবার ছোট ভাইয়ের মত উনি। … আর মাও উনাকে দেওয়রের মতই স্নেহ করেন। … তাই, অতনুআঙ্কেলের ক্ষেত্রে আঙ্কেল শব্দটা এলেও, রথিন কাকার ক্ষেত্রে, আমার কাকা ছাড়া অন্য কথা বেরোয় না। …

রথিন কাকার স্ত্রী, একটু অন্য গোচের, আর উনার দুটি ছেলেও মায়ের দিকেই হয়েছেন। … ডিস্ক, পাবে নিত্য যাতায়াত উনার। … যাইহোক, তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাপার। … রথিনকাকা আর বাবা আমার দুই হাত ধরে টেনে তুললেন। … পায়ে একটু কাদা লেগে গেছিল, বাবা ধুইয়ে দিলেন। … এবার আমরা একটু চা বিস্কুট আর তারপর ডিম-পাউরুটি খেয়ে, গাড়িতে করে ইরার গেটে পৌঁছলাম।

রথিনকাকা এখানে ঢুকলেন, তবে তিনিও এবার এক ছদ্মবেশে, অবশ্যই বাবার নির্দেশে। ছদ্মবেশ ধারণ আমাদেরকে সাধারণ পর্যটক দেখাচ্ছিল। ভিতরে ছবি তোলা নিষেধ। তাই বাবা গাড়িতেই ক্যামারা রেখে এসেছেন। খালি হাতে আমরা মন্দির দর্শন করে, বাইরের দিকের বেশ চওারা পিচ ফেলা রাস্তা ধরে হাঁটছি। … বাবার চোখ নিশ্চয়ই ঘুরছে, রথিনকাকুরও। তবে বাবারটা দেখা যাচ্ছেনা, কারণ বাবা সানগ্লাস লাগিয়ে রেখেছেন।

রাস্তার বাদিকে একের পর এক ফুল বাগান, যেখানে সুন্দর সুন্দর প্রজাপতি, আর দয়েল, ফিঙে, চড়াই, সালিকরা উরে উরে রোদ পোয়াচ্ছে, আর ফুলের রসও খাচ্ছে। আর ডানদিক বরাবর মহারাজদের কোয়ার্টারস। জানলাগুলো দেখা যাচ্ছিল, সেই কোয়ার্টারে বাইরের লোক মানে পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। দুটি দরজা সেই প্যাভিলিয়নে প্রবেশ করার। একটা রাস্তা যেখান থেকে বাদিকে ঘুরেছিল, তার পরে পরেই। আর দ্বিতীয়টা একদাম শেষের দিকে। সিকিউরিটি ছিলেন। তাকে জিজ্ঞেস করে বাবা জানলেন, দশজন সব থেকে প্রবীণ মহারাজের ঘর প্রথমে, আর একদাম শেষের সবথেকে বড় ঘরটা প্রধান মহারাজের, মানে যিনি আমাদের বাড়িতে গেছিলেন, সেই মহারাজ গোবিন্দসখির।

বাবা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকলেন, আর মুখে এমন হাবভাব করলেন যেন, এই বিশাল এরেঞ্জমেন্ট দেখে উনি পর্যটকবেশে স্তম্ভিত। মহারাজের ঘরের পিছনেই বাউন্ডারি পাঁচিল। তবে সেইদিকটা আমাদের ওই সিকিউরিটি কাকু আর যেতে দিলেন না। বাধ্য হয়েই আমরা এবার ফেরার পথ ধরলাম। মানে সেই রাস্তাটাই, যাবার সময়ে ডানদিকে চেপে যাচ্ছিলাম, যাতে কোয়ার্টারস্‌গুলো দেখা যায় আর ফেরার সময়ে, বাঁদিক দিয়ে এলাম, মানে ফুলবাগান গুলো দেখতে দেখতে এলাম। …

ফুলবাগানের প্রথমটাই, অর্থাৎ মহারাজের কোয়ার্টারের ঠিক উল্টো দিকের বাগানটার সামনে, বাবা গিয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। … কি দেখলেন, কে জানে? কিন্তু উনি যে কিছু দেখলেন, তা আমার কাছে অন্তত স্পষ্ট। তিনতিনবার উনি বাকি বাগানগুলো দেখলেন, আর ওই বাগানটী দেখলেন। … একবার তো বাবা খুব কাছে চলে গেছিলেন ওই বাগানের, বোধহয় ঢুকেই যেতেন। ওই সিকিউরিটি কাকুটা আবার এসে বললেন, বাগানে প্রবেশ নিষেধ, কিছুতে হাতও দেবেন না। …

বাবা একটু মুচকি হেসে সম্মতি জানালেন, কিন্তু ভালোভাবে কিছু নিরীক্ষণ করলেন। … আর তারপর থেকে, প্রতিটি বাগানকেই তিনি একই ভাবে নিরীক্ষণ করতে থাকলেন। কি দেখলেন জানিনা, তবে বিশেষকিছু যে তিনি দেখেছেন, সেটা আমার মনেই হয়েছিল, আর সেই ব্যাপারে কনফার্ম হলাম, যখন বাইরে বেড়িয়ে, গাড়িতে বসে রথিনকাকাকে বললেন – রথিন, আমার ওই শেষ বাগানটার দেওয়ালের বাইরে, একটা ঘুমটি লাগবে, দিন দশেকের জন্য।

রথিনকাকা – ঘুমটি ওদের দেওয়ালের বাইরে এলাউড নয়। … দেখো না, একটাও ঘুমটি নেই।

বাবা – পাঁচিলের গা দিয়ে যেই রাস্তা যাচ্ছে, সেটা কি কর্পোরেশনের?

রথিনকাকা – হ্যাঁ।

বাবা – তাহলে, কর্পোরেশনের কাছে গোপনে খবর পাঠিয়ে, ওই পাঁচিল ঘেঁসে একটা তির্পল খাটাও। মঠকর্তৃপক্ষ জানবে, মাটি খোরা হচ্ছে, মাটির তলায় কেবিলের কাজ হচ্ছে।

রথিনকাকা – চলো তাহলে, আজই বিডিওর সাথে দেখা করি। … এখনি।

বাবা – আমার উপস্থিতি জানাতে হবেনা। তুমি তোমার কথা বলবে, আমি আর মিলি গাড়িতেই অপেক্ষা করবো।

রথিনকাকার গাড়ি মিনিট দশেক এগিয়ে একজায়গায় থামলো। মেকআপ ছেরে ফেলেছেন রথিনকাকা। বিডিও অফিসের ভিতরে চলে গেলেন। …

খানিকপরে, রথিনকাকা বিডিওকে নিয়ে বেড়িয়ে এলেন। আমরা ব্যাকসিটে বসলাম, আর বাবার সাথে বিডিও স্যার সামনে বসলেন। আমাদের পরিচয়, রথিনকাকার শ্বশুরবাড়ির সম্বন্ধী।

গাড়ি খানিক গিয়ে থামলো এসডিপিও অফিসে। … রথিনকাকা, আর বিডিও স্যার ভিতরে গেলেন, আর ব্যাজার মুখে ফিরে এলেন। … ফিরে আস্তে, বাবা ভাঙা গলায় বললেন – রথিনদা, মিনার বড্ড বাথরুম পেয়েছে। তোমার তো চেনা। একটু ব্যবস্থা করো না। অনেকটা পথ ফিরতে হবে। মিনা চাপতে পারবে না। …

বাবা আর রথিনকাকার আন্ডারস্ট্যান্ডিং দারুণ। তাই বোধহয় রথিনকাকা বুঝে গেলেন, বাবার মতলব কি। … আমি তো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই, আমার আবার বাথরুম কোথায় পেলো!

বিডিও স্যার গাড়িতে বসলেন, রথিনকাকা ঘুরে এসে বাবা আর আমাকে ডাকলেন। … বাবা আমাকে নিয়ে যেতে যেতেই, দেখলাম নিজের সানগ্লাসটা খুলে নিলেন। সোজাসুজি এসডিপিও মেড্যামের সামনে গিয়ে বললেন – বাসন্তীদি, চিনতে পাচ্ছেন?

বেঁটেখাটো দেখতে, ছাপাশাড়ি পরা ভদ্রমহিলাটাকে দেখলাম, মুখ তুলে তাকালেন। খানিক বাবার চোখের দিকে তাকালেন, তারপরে বললেন – বিজয়! … এখানে! … কি ব্যাপার ঘুরতে?

বাবা রথিনকাকুর দিকে হাতটা বাড়ালেন। রথিনকাকু মুখ্যমন্ত্রীর চিঠিটা বাবার হাতে ধরিয়ে দিলেন। বাবা চিঠিটা এসডিপিও ম্যামকে দিলেন। উনি পুরোটা পরে বললেন, তারমানে তোমার ওই তির্পলের ছাউনির প্রয়োজন। … ওকে। ইটস ইউ, সো আই ওয়িল এরেঞ্জ ড্যাট বাই টুমরো। তুমি কাল রাতে এসে পেয়ে যাবে। … কে কে থাকবে, ওতে?

বাবা – দিদি, ক্যাম্পটা, আর সাথে কিছু মাটি, বোঝানোর জন্য এখানে মাটি খোরা হয়েছে। এটা যদি এঁরা বাইরে থেকে এনে কালকে রাতের অন্ধকারে রাখতো, ভালো হতো না! … আসলে এখানের লোকের সাথে মঠের মহারাজদের তো আলাপ আছেই। ওদের সরল মন, বলে দিতে কতক্ষণ!

ম্যাডাম দেখলাম হাসলেন খালি, আর বললেন – তোমার বিচক্ষণতা আগের থেকেও বেড়ে গেছে দেখছি। … তা বললে না, থাকবে কয়জন। …

বাবা আমাকে দেখিয়ে বললেন – আমার কন্যা আমার সাথে থাকবে।

ম্যাডাম অবাক হয়ে বললেন – মিলি! … এতো বড় হয়ে গেছে? … তোমাকে এখন ও অ্যাসিস্ট্ করে নাকি? …

বাবা বললেন – হ্যাঁ এই তো আঠেরো হলো।

ভদ্রমহিলা বললেন – মানে, আই মেট ইউ ১৫ ইয়ার্স ব্যাক! … মিলি তখন ৩ বছরের ছিল। … গ্রেট। … ছদ্মবেশে থাকবে নিশ্চয়ই।

বাবা – আমি খালি, আর মিলি সামান্য ময়লা ধরনের জামাকাপড় পরবে, আর একটু ব্ল্যাকিশ মেকআপ নেবে। ব্যাস।

ম্যাডাম – বাকি উটকো ঝামেলা, তুমি সামলে নেবে তো!

বাবা – নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনি পর্যন্ত মহারাজরা পৌছবেন না।

এবার রথিনকাকার দিকে তাকিয়ে ম্যাডাম বললেন – কাল রাত্রি ২টোর আগে আসবে না, আর সকাল ৬টার মধ্যে তাঁবুখাটিয়ে মাটি ফেলে, রেডি করে দেবে। … (বাবার দিকে তাকিয়ে) ১০ দিন?

বাবা – ম্যাক্সিমাম।

ম্যাডাম বললেন – ওকে ডান।

বাবা আবার সানগ্লাস পরে নিয়ে, আমাকে নিয়ে চলে আসছিলেন। … ম্যাডাম বললেন – কেস সল্ভড হয়ে গেলে, মিটিংটা আমার কোয়ার্টারে হবে। … মাধবিকেও নিয়ে আসবে সেদিনকে।

বাবা হেসে সম্মতি দিলেন। … রথিনকাকা হেসে বললেন – কি কনফিডেন্স হ্যাঁ, তুমি কেস হ্যান্ডেল করছো শুনে সরাসরি কেস মীমাংসার নেমন্তন্ন! … কি ফিগার তৈরি করেছ গুরু হ্যাঁ!

কাল রাত ১টায় যাত্রা করবো, আমি আর বাবা ঠিক ৩টের সময়ে ঢুকে যাবো। সেদিন বাড়ি ফিরলাম এই দুটো নাগাদ। রথিনকাকা আমাদের বাড়িতেই লাঞ্চ সারলো। বাবাও রথিনকাকার সাথে বেড়ালেন। খালি মাকে বলে গেলেন – অতনু, লিথারজি, ফিরতে দেরি হবে।

লিথারজি নার্সিংহোমে বাবার খুব যাতায়াত। বাবার কোন এক বন্ধুর নার্সিংহোম। কিন্তু কি কারণে সেখানে বারেবারে যান, তা বলতে পারবো না। বাবা ফিরলেন যখন, আমি তখন ঘুমিয়ে পরেছি। তাই বাবার সাথে সকালে চা খাবার সময়েই দেখা হলো। আমি ওঠার আগেই বাবা উঠে পরেছেন। যখন টি-টেবিলে পৌঁছলাম, তখন শুনলাম বাবা মাকে বলছেন, ডারকিস মেকআপ আছে তো, না আনতে হবে?

মা বললেন – মিলিকে না নিয়ে গেলেই হতো না! … ৭-১০দিন মেয়েটা স্নান কোথায় করবে?

বাবা – রাজি করাও মেয়েকে। সে তো নাছোড়বান্দা। … ওর এখন পিরিয়ডের সময় নয়তো! তাহলে কিন্তু খুব অসুবিধা হবে।

মা – না, ওসব হয়ে গেছে। … তুমি এতো ভুলে যাও কেন বলো তো? … চেন্নাইতে থাকার সময়ে, তুমি তো ওকে প্যাড কিনে দিলে।

বাবা – ওহ, হ্যাঁ তাই তো! মাথায় নেই আসলে।

আমি এবার মাঝে ফোড়ন কাটলাম – ৭-১০দিন নয় স্নান করলাম না। কি এসে যাবে! … কেসটা খুব ইন্টারেস্টিং মা, যাই না!

মা মুখটা একটু বিকৃত করে গম্ভীর ভাবে বললেন – সাবধানে থাকবে, আর বাবা যেমন বলবে, আগে ভালো করে শুনবে, তারপর তেমন ভাবে থাকবে।

দুপুরে মা, তাড়াতাড়ি লাঞ্চ করিয়ে দিলেন। তারপর আমাকে আর বাবাকে, দুইজনকেই ঘুমপারিয়ে দিলেন। সন্ধ্যাবেলা থেকে দেখলাম, বাবা কি যেন একটা ভিডিও দেখছেন ফোনে। এতক্ষণ ধরে বাবা তো কোন কিছু দেখেন না। … যাই হোক। কেসের মধ্যেই আছেন। হয়তো কেস রিলেটেড কিছু ভিডিও হবে।

সন্ধ্যা থেকে মা মেকআপ করিয়ে দিলেন, আর বাবাকেও দেখলাম মাটিটাটি গায়ে মেখে, ডার্ক মেকআপ নিয়ে, পুরো ভোলই পাল্টে দিয়েছেন। রাত্রি একটার সময়ে আমরা রথিনকাকুর নয়, এবার অতনুকাকুর অন্য একটা গাড়িতে গেলাম। গাড়ি ইরা থেকে একটু দূরে দাঁড়ালো। বাবাকে দেখলাম চোখে একটা চশমা পরে নিয়েছেন। চশমা তো নয়, পুরো আতশকাঁচ। বাবার চোখগুলো এই বড় বড় লাগছিল। … মনে পরলো রথিনকাকার কথা- চোখ দেখানো যাবেনা।

পৌঁছে গেলাম তাঁবুতে। … দেখলে বুঝতেই পারা যাবেনা, ওটা একটা ফলস মাটির তলায় লাইনের কাজের তাঁবু। পারফেক্ট এরেঞ্জমেন্ট। তাঁবুর ভিতরে ঢুকে দেখলাম, বেশ বড় তাঁবুটা। বাইরের মত, ভিতরেও কিছু মাটি ফেলা, আর এমন ভাবে মাটিটা ফেলা যেন, ওই মাটির আড়ালে ফুটপাত খোরা রয়েছে। … তারপাসে, একটা ছোট্ট চৌকি। বুঝলাম, এতেই আমি আর বাবা, ৭-১০দিন কাটাবো।

সকলে চলে গেল। বাবা বলে দিলেন, পরের আপডেট রথিনকাকুকে জানিয়ে দেবেন উনি। সেই মত নেক্সট প্ল্যান।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6