দ্বিতীয় পর্ব – প্রথম পদক্ষেপ
বাবার পাশ দিয়ে, বাবার ছোট্ট সিঙ্গিল বেডটায় গিয়ে বসলাম। সিঙ্গিল বেড হলেও, একটু সাইজে চওড়া। … ছোটবেলায়, আমি বাবার কাছে এসে এই বিছনায় শুতাম। … আমি নাকি মায়ের পেটে আসার পর থেকেই, বাবা এই পাশের ঘরে, নিজের সিঙ্গিল বেডে আশ্রয় নিয়েছেন। … আসলে বাবার নিয়মকানুন পুরো আলাদা।
ঘুমান রাত্রি ১২টার মধ্যে, আর উঠে পরেন সকাল ৫টায়। … দুপুরেও কোন বিশ্রাম করেন না। … মায়ের এতে অসুবিধা হয় কিনা জানিনা। … তবে বাবা বলেন, উনি মানে মা সারাদিন পরিশ্রম করেন। তাই দুপুরে একটু বিশ্রাম প্রয়োজন উনার। আর সাথে সাথে রাত্রেও উনার ঘুম বেশিই দরকার। … বাবার মতে সংসারের কাজ গায়েগতরের কাজ, তাই পরিশ্রম খুব হয়। …
এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, বাবা আর মায়ের সম্পর্কটা যেন অদ্ভুত ভাবেই মধুর। … বাবার থেকে রামকৃষ্ণকথামৃত নিয়ে পাঠ করেছিলাম, ওখানে পরেছিলাম, একটা আধটা সন্তান হয়ে গেলাম, স্বামীস্ত্রী ভাইবোনের মতন থাকবে। … সেটা পরার ফলে কিনা জানিনা, আমার কিন্তু বাবামায়ের সম্পর্ক দেখে সেরকমই মনে হয়। … একে অপরকে প্রচণ্ড শ্রদ্ধা করেন। দুজনেই দুজনকে সমস্ত মনের কথা বলেন, কিন্তু তথাকথিত যাকে স্বামীস্ত্রীর রোমান্স বলে, সেটা নেই এঁদের মধ্যে। … বাইরে যখন ঘুরতে যাই, বেরাতে যাই, তখনও এঁদেরকে দেখে মনে হয়, ভাইবোন। …
আমি আবার মায়ের প্রতি আকর্ষিত হলেও, বাবার বরাবরই নেওটা। … বাবার পাশে এসে শুতাম ছোটবেলায়। তাই বাবা এই সিঙ্গিল বেডটা চওড়া করিয়েছিলেন। … বড় হবার পর মায়ের কাছেই শুই। কিন্তু যেদিনই ঘুম আসেনা, বাবার সিঙ্গিল বেডে এসে, বাবাকে একটু গোত্তা দিয়ে সরিয়ে, বাবার পাশে শুয়ে পরি।
আমি এসে বসতে, বাবা বললেন – কি বুঝঝিস কেসটাতে?
আমি সরাসরি বললাম – কিচ্ছু বুঝতে পারিনি এখনও। … শুধু এটুকু বুঝলাম, ইরার উপর কারুর কুনজর পরেছে। হয়, ট্রাফিকিং-এর র্যাকেট ঢুকে পরেছে ইরাতে, দিয়ে মেয়ে পাচার চলছে, যার জন্য ইরা নাজেহাল। … আবার এমনও হতে পারে যে, কেউ ইরার বদনাম করার জন্য এমন করছে। … এই মঠসংস্থাগুলোরও তো এখন বেশ ভালোই কম্পিটিশন চলে।
আমি আবার থেমে বললাম – তবে আমার মনে হয়, ট্রাফিকিংটাই বেশি জোরালো।
বাবা – কেন?
আমি – কারণ, ইরাতে দেশবিদেশের সমস্ত সুন্দরি অবিবাহিতা মেয়েরা যায়, আর থাকে। … ট্রাফিকিং-এর জন্য যেই কোয়ালিটির মেয়ে লাগে, সবই তো আছে ওখানে। … তাই না!
বাবা – গুড। আর কিছু?
আমি বললাম – আর তো কিছু ভেবে পাচ্ছিনা!
বাবা – তোকে অপহরণের ডেট গুলো বলেছিলাম। মনে আছে?
আমি – হুম… টু ইচ, উজ্জয়েন, নাগপুর অ্যান্ড বাঙ্গালুরু … ডেটটা হলো ২২শে ফেব্রুয়ারি, পয়লা মার্চ, ৮ই মার্চ, আর রিসেন্টলি, ১৫ই মার্চ। … অন্যদিকে, … টু ইচ ফ্রম চণ্ডীগড়, দিল্লি, আর আগ্রা, অন ডি ডেট অফ ২৩রড ফেব্রুয়ারি, ২ন্ড মার্চ, ১০থ মার্চ, আর ১৭থ মার্চ।
বাবা – এই ডেটগুলোতে কোন কানেকশান পাচ্ছিস!
আমি – একই দিনে তো হয়নি জিনিসগুলো। একিদিনে ডায়েরি করা হয়েছে শুধু!
বাবা – তার প্রমাণ! … আর যদি প্রমাণ ছাড়াও সেটাই ঠিক ধরে নি, তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছিস, ডায়েরি করার ডেটগুলো একটা ছন্দে রয়েছে – এই ছয় থেকে সাত দিনে গ্যাপ।
আমি – কিন্তু এর থেকে কি বুঝবো?
বাবা – একটা কাজ করতো। গুগুল ম্যাপটা খুলে ডাইরেক্টশনের জায়গাটা খোলতো। … আমি কোথা থেকে কোথায় যাবো বলছি, চারচাকার গাড়িতে কত সময় লাগে বলতো।
আমি অ্যাপ খুলতে বাবা বলতে থাকলেন আর আমি উত্তর দিতে থাকলাম।
বাবা – উজ্জয়েন টু ভুবনেশ্বর
আমি – ২৮ ঘণ্টা, কিন্তু ভুবনেশ্বর কেন?
বাবা – বলছি, আগে দ্যাখ। এবার বল ব্যাঙ্গালুরু থেকে ভুবনেশ্বর।
আমি – ২৭ ঘণ্টা।
বাবা – নাগপুর টু ভুবনেশ্বর
আমি – ১৮ ঘণ্টা।
বাবা – আর চণ্ডীগড়, দিল্লি আর আগ্রা, এই তিনটেই হরিদ্বারের থেকে ম্যাক্সিমাম ১২ ঘণ্টার দূরত্বে, অর্থাৎ একদিনের দূরত্বে স্থিত। … যদি ধরে নিই, এই গাড়ি বাংলাদেশে যাচ্ছে, কারণ ওটাই সেফেস্ট ওয়ে দেশের বাইরে যাবার, তবে একদিন আগে পরে … দ্যাখ ডেট গুলো দেখ। … হরিদ্বার টু বাংলাদেশ বর্ডার লাগে দেড় দিন। আর ভুবনেশ্বর থেকে লাগে আধা দিন। … আর ডেট গুলোতেও দেখ, ওই একদিনেরই পার্থক্য রয়েছে। ২২-২৩, পয়লা – দোষরা, ৮-১০ , ১৫-১৭।
আমি – তারমানে বলছো, ওই গাড়ি এখানেই আসছে? … কিন্তু ভুবনেশ্বর বা হরিদ্বার কেন?
বাবা – কারণ ইরার এই দুটো বড় সেন্টার। … বলতে পারিস, সাউথের গুলোকে কন্ট্রোল করে ভুবনেশ্বর, আর নর্থের গুলকে হরিদ্বার।
আমি – তারমানে, যে বা যারা করছে, তারা ইরার মধ্যেই রয়েছে, এমন বলছো।
বাবা – সেতো আলবাত, নাহলে ইরার মধ্যের মেম্বারদের কাছে ওরা পউচাচ্ছে কি করে? … সন্ন্যাসিনীরা তো বাইরে ঘুরে বেরায় না!
আমি – তাহলে এর অনুসন্ধান করবো কি করে?
বাবা – সমস্ত কিছুর হেডকোয়ার্টার হলো নয়াভূমির ইরা। তাই সেখানে না গেলে কিছু বুঝতে পারছিনা। … সেখানে গেলেই বা কত বুঝবো জানিনা। … তবে হতে পারে, কিছু একটা ধারনা করতে পারবো, বা কোন ওয়াইল্ড গেশ্ করতেও পারবো। … এখানে বসে বসে গেশিং, জাস্ট একটা গ্যাম্বলিং, তাছাড়া কিচ্ছু নয়। … চল রথিনকে একটা ফোন করে কিছু এরেঞ্জমেন্ট করার কথা বলে দিই। … তুই যাবি তো?
আমি – অফ কোর্স। … আমি তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট না!
বাবা হাল্কা করে হেসে বললেন – একটু চরা সেজে যাবি, গালে লুসটুস, চুলে ল্যাকার ম্যাকার। … চোখের কাজল পুরো চাইনিজ স্পেশাল। … যত পারিস বেশী সেজে যাবি।
আমি – ওটাই কি আমার ছদ্মবেশ।
বাবা সিগারেট ধরিয়ে, রথিনকাকাকে ফোন মেলাতে মেলাতে বললেন – হুম, কাইন্ড অফ।
ফোন মেলাতে, ওদিক থেকে রথিনকাকা বললেন – হ্যাঁ বলো, কি প্ল্যান অফ এক্সান ঠিক করলে।
বাবা – একটা নৌকার ব্যবস্থা করো, একবার গঙ্গার দিক থেকে নয়াভূমির ইরা মঠটাকে দেখতে চাই। একদাম সকাল সকাল। ওই দিনকেই বেলার দিকে, একবার পর্যটকের মতন মঠটা দেখবো।
রথিনকাকা – মিলি থাকবে তো?
বাবা – হ্যাঁ, বাট, আমাদেরকে তোমায় চিনে নিতে হবে।
রথিনকাকা – ও, তারমানে ছদ্মবেশে থাকবে? কিন্তু … ওকে, এখন কিছু প্রশ্ন করবো না তোমায়।
বাবা – আচ্ছা, কবে আর কোথা থেকে গঙ্গাবিহার হবে, সেটা আমাকে কবে জানাবে?
রথিনকাকা – কালকে সকাল সকাল ঠিক করে, বেলার দিকে তোমায় ফোন করছি। ওকে?
বাবা – ওকে, তাহলে কাল কথা হচ্ছে।
বাবা ফোন রেখে দিলেন। আমি কোন মন্তব্য করলাম না। একটা কেসে বাবার সাথে থেকে বুঝে গেছি, কেসের সময়ে বাবার সাথে খালি তাল মিলিয়ে যেতে হয়। বাবার বুদ্ধি আর ভাবনার সাথে তাল মেলানোর ক্ষমতা আমার নেই। … অতনুকাকু বা রথিনকাকুরই নেই। তাঁদের মত হাইর্যাঙ্ক সিবিয়াই আর সিয়াইডি অফিসারের যদি সেই মেধা না থাকে, তবে আমি কোন ছার। তাই চুপচাপ বাবার সাথে তালে তাল মিলিয়ে চলতে থাকলাম আমি।
পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট করা হয়ে গেলে, বাবাকে দেখলাম বেশ কিছু ফোন করলেন। কোন ফোনে ইংরাজিতে কথা বললেন, তো কোনটাতে হিন্দিতে, আর কোনটাতে বাংলায়। কথা শুনে বুঝতে পারলাম, সেই সমস্ত মেয়ে, যাদের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছেনা, তাঁদের ঘরের লোকের সাথে কথা বললেন। … জেরা নয়, সামান্যই কথা। … এই শেষ কবে কথা হয়েছিল। কিছু বিশেষ বলেছিল কিনা, এই সমস্ত।
সমস্ত ফোন শেষ করে, বাবা প্রায় ১২টা নাগাদ স্নানাদি ও ধ্যানট্যান করলেন। … ফ্রি হয়ে বসলে, আমি বাবার কাছে গিয়ে প্রশ্ন করলাম, কোন সমীকরণসূত্র পেলে?
বাবা – হুম, প্রায় সকলেই ভ্যানিস হয়ে যাবার আগের কিছুদিন একটু টেনশনে ছিলেন।
আমি – এর মানে, অকস্মাৎ কিছু হয়নি। … আগে থেকেই, থ্রেট বলো বা চাপ বলো, সেটার সৃষ্টি হয়েছে। … এই তো?
বাবা হাসি হাসি মুখ করে, হাল্কা করে ঘার নাড়িয়ে সম্মতি দিলে, আমি বললাম – আচ্ছা, আর কি বোঝা গেল, এই তথ্য থেকে?
বাবা – এই বোঝা গেল যে সরষের মধ্যেই ভুত।
আমি – মানে যা কিছু হচ্ছে, তা মঠের মধ্যেই হচ্ছে। … যদি কোন র্যাকেটও থেকে থাকে, তাও মঠের মধ্যেই?
বাবা – র্যাকেট তো আর মঠের মধ্যে থাকবে না মিলি, র্যাকেটের যোগাযোগটা থাকতে পারে। মানে, যারা র্যাকেটের হাতে এই মেয়েগুলোকে তুলে দেবে।
আমি – কিন্তু এই মেয়েদের নিয়ে কি করা হবে?
বাবা – বিদেশে বিক্রি করে দেওয়া হয়। বড়লোক দেশগুলোতে এঁদেরকে সেক্স স্লেভ করে রেখে দেওয়া হয়। বড়লোকের বড়লোকিআনা আর কি।
আমি – কিন্তু শুনেছি, ইরাতে সমস্ত বড়লোকেরাই যান?
বাবা – ঠিকই শুনেছিস। কিন্তু যতগুলো ভ্যানিস হয়েছে, তাদের কারুর সাথেই প্রায় সম্পত্তি ছিলনা। … হয়তো, এই সম্পত্তি না থাকার কারণেই, তাদের সাথে এমন পরিণতি।
আমি – মানে, যারা কিছু দিতে পারলো না, তাদের থেকে ইনকাম করার রাস্তা বলছো।
বাবা – হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে। … এমনও হতে পারে যে, সত্যিই কোন র্যাকেট চোরাগোপ্তা কাজ করছে।
ঘরে হঠাৎ মা ঢুকে এলেন। এসে বললেন – তুমি যতই ধ্যান ধারনা করো, তোমার মধ্যে ভক্তিভাব কিচ্ছু নেই। … অমন তীর্থস্থানের ব্যাপারে, অমন ভাবতে একবার বুক কাঁপল না!
বাবা ঠোঁটের কোনে একটা ব্যাঙ্গাত্মক মুচকি হাসি হেসে বললেন – মাধবি, তীর্থক্ষেত্রেই তো যতরাজ্যের র্যাকেটের আনাগোনা বেড়েছে আজকাল। … ধর্মের নাম ভাঙিয়ে সাম্প্রদায়িকতা, সেন্টিমেন্ট; সেই সেন্টিমেন্টকে কাজে লাগিয়ে আকর্ষণ, ভালোমানুষের মুখোস, আর সেই মুখোসের আড়ালে নোংরামো, এই তো এখনকার পপুলার ক্রাইম। … রথিন, বা অতনু আসলে, একবার ওঁদেরকে প্রশ্ন করে দেখো মাধবি, সারা পৃথিবীর যত ট্র্যাফিকিং র্যাকেট, অল অফ ডেম আর অপারেটিং থ্রু মনাস্ট্রিজ।
মায়ের নাম মাধবি, মাধবিলতা সিংহ। মা বললেন – তাহলে, এই মঠগুলোকে সরকার গজাতে দিচ্ছে কেন? …
বাবা হেসে বললেন – গুড কয়েসচেন। … ভেরি গুড কয়েসচেন। … ওই যে বললাম, সেন্টিমেন্ট। ভোটনির্ভর সরকার, তাই যেখানেই জনসমাগম, সেখানেই সরকারের ইন্টারেস্ট, বা বলতে পারো দুর্বলতা। মোটামুটি, যদি ভারতের কথাই ধর, তবে সমস্ত মনাসট্রি, মঠ, সাম্প্রদায়িক আশ্রম, ইসলামিক উনিয়ন, চার্চ, এই সমস্ত মেলালে, প্রায় পুরো মিডিলক্লাস ভোটার, মানে ধরে নাও, সমস্ত ভোটারের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটার একত্রিত হয়। … তাহলে ভাবো মাধবি, যদি ওই সেক্টরটাকে তোষামোদ করে, এঁদেরকে ইন্ধন দেওয়া যায়, তাহলে এই মঠ-মনাস্ট্রি-চার্চ-ইউনিয়নে যাতায়াত করা, সকলে সেই পার্টির সমর্থক হয়ে যাবে, যেই পার্টি ওই মঠকে সহযোগ প্রদান করছে।
বাবা আবার বললেন, মাধবি, টু ভেরিফাই মাই ওয়ার্ডস্, আমি ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে, তিন তিনবার এমন ফ্যেস করেছি যেখানে, সাম্প্রদায়িকতাকে দূরে সরিয়ে, সুদ্ধ ধর্মের স্থাপনা করতে কিছু ব্যক্তি এগিয়ে চলেছিল। … মাধবি, ইদার দে অয়ের থ্রেটেনড্, ওর মার্ডারড্। …
মা আবার প্রতিবাদী হয়ে বললেন – তাবলে, এই মঠগুলোর সম্বধে এমন সন্দেহ করবে? সন্দেহ করাটা তোমার একটা বাতিকে পরিণত হয়ে গেছে।
বাবা হেসে – সন্দেহ করাটাই তো আমার পেশা মাধবি। ডিটেকশন জাতিয় কাজ করার পদ্ধতি কি জানো? … সন্দেহের ভিত্তিতে সাস্পেক্টলিস্ট তৈরি করো, তারপর সেই সাস্পেক্টলিস্টের একজন একজনকে ধরে ধরে, তার গতিবিধির উপর নজর রেখে, সিদ্ধান্ত নাও, কে সন্দেহের তালিকায় থাকবে, আর কে সন্দেহের তালিকায় থাকবেনা। … অবশিষ্ট সাস্পেক্টের গতিবিধির এবার চুলচেরা বিশ্লেষণ করো, জল ফেলে রেখে, দুধ বেড়িয়ে আসবে।
বাবা আবার হেসে বললেন – এটাই সত্য উদ্ঘাটনের টেকনিক মাধবি। সেটা রহস্যের হোক, বা আধ্যাত্মের হোক।
মা বাবার পাশে বসতে বসতে বললেন – হ্যাঁ সব এক, যে রহস্যের কিনারা করতে পারে, সেই রাজশেখর বসু হয়ে যান!
বাবা মায়ের এই তর্কের ধারার খুব প্রশংসক। … আমাকে মাঝে মাঝে বলতেন, তোর মায়ের ওই এঁরে তর্ককে হেলাফেলা করিস না। ওই এঁরে তর্কের থেকে অনেক সময়ে মস্তিষ্কের এমন জায়গায় আঘাত লাগে না, সমস্ত জটিলতা তখন গলে জল হয়ে যায়। তাই হয়তো বাবা আবার হেসে বললেন – তা কানেকশন আছে বইকি। … ভৌতিক রহস্য, যা আমি সমাধান করি, এতে খালি ইন্দ্রিয় সহিত বুদ্ধি কাজে লাগে। … অতিজাগতিক রহস্য সমাধান, যেগুলোর সমাধান সাহিত্যিকরা করেন, তাতে ইন্দ্রিয়, বুদ্ধির সাথে সাথে মনও ক্রিয়াশীল থাকে। … আর ঠাকুর রামকৃষ্ণ বা স্বামী বিবেকানন্দের মত আধ্যাত্মিক রহস্যের সমাধান যারা করেন, তাঁরা এই ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধির তালে তালে রেখে, চেতনার দ্বারা সেই সমাধান করেন। … বাট বেসিক প্রসেস ঈশ অলওয়েজ সেম মধু (মাঝে মাঝে বাবা মাকে মধু ডাকেন)।
হ্যাঁ আমাকে যদি বলো এবার মহাভারতের ব্যাখ্যা করতে, আমি থোরাই পারবো? আমার চেতনা তো কোন নিম্নস্তরে পরে রয়েছে। … তবে হ্যাঁ, যদি কোনদিন ইচ্ছা হয়, তবে আধ্যাত্মিক মুলতত্ত্ব জেনে, সেই তত্ত্ব দিয়ে যেই ভাবে আজকে রহস্যসমাধান করি, সেই ভাবেই বিচার করতে করতে দেখবে, ঠিক হয়ে গেছে।
কি বিশয়ে জানিনা, মা যেন একটু রেগে রয়েছেন। … তিনি বললেন – বেশ তো, ওটাই করো না, কাজে দেবে।
বাবা একটু টিপ্পনী কাটার মত করে বললেন – মিলি, রথিনকাকাকে ফোন কর। বল, তোর মা বলছে, এই রিপোর্টারের কাজ ছেড়ে দিতে। … এসব রহস্য মহস্যের সমাধান করে কাজ চলছে না, মহাভারতের রহস্যের সমাধান করতে হবে। … হোমমিনিস্টারের আদেশ।
মা এবার তেড়েফুঁড়ে উঠলেন – আমি কি তাই বললাম! … যতসব… একটাই কথা বলছি, এই তীর্থক্ষেত্রের পুণ্যাত্মাদের ছেড়ে, আসল আসামীকে ধর।
বাবা হেসে বললেন – পাপাত্মার কাছে যে পুণ্যাত্মাই পাপী। … মাধবি, আমি যে এক পাপাত্মা। তাই আমার নজরে পুণ্যাত্মাদের মধ্যেই যে পাপী লুকিয়ে রয়েছে।
বাবাকে বলে কাজ হচ্ছে না বলে এবার আমাকে বললেন মা – তোর বাবাকে কি একটা কথাও সহজ ভাবে বললে শুনবে না! … আমি বললাম, উনি পাপাত্মা! … ঝগড়া করাচ্ছে আমাকে দিয়ে। … ধুর … ভালো লাগেনা।
মা উঠে চলে গেলেন। … আমি বাবার কাছে গিয়ে বললাম, মাকে চটিয়ে ভাগিয়ে দিলে না! … বাবা হেসে বললেন – সাম্প্রদায়িক সেনাপতিগুলো কেমন সাধারণ ভোটারদের কাছে ধর্মের বর্ম পরে থাকে, দেখতে পেলি!… আমি কেবলই হাসলাম। … বাবার উদ্দেশ্য আমি বেশ বুঝেছি। মা যাতে তাড়াতাড়ি খাবার দেয়, তাই মা যখন দুপুরের খাবার বারার আগে, এমন একটু উতপটাং মন্তব্য করেন, তখন মায়ের পিছনে এই ভাবেই বাবা লাগেন। … কিন্তু এখন তো খালি দুপুর ১টা। বাবা এইভাবে মাকে দুপুরের ভাত বারার তারা দিলেন কেন?
আমি বললাম – কোথাও বেরুবে বাবা?
বাবা – হ্যাঁ, মঠের বাইরেটা নৌকাবিহার করে বা পর্যটকের মত বিহার করে দেখা যাবে। কিন্তু একবার ভিতরটা দেখতে হবে।… তোর মা বলে গেল শুনলি না!
আমি অবাক হয়ে বললাম – মা আবার কি বললেন? … মা তো, তোমাকে বাঁধা দিচ্ছিলেন!
বাবা মুচকি হেসে বললেন – এমনি এমনি কি আর বাঁধা দিচ্ছিলেন তোর মা! উনি বললেন, ইন্দ্রিয়, বুদ্ধি, মনে আটকে না থেকে, একটু চেতনা দিয়ে খতিয়ে দেখতে। … বললেন দেখলিনা, মহাভারতটাই বিচার করতে। … মানে কি? মানে এই যে, একটু গভীরে যেতে বললেন তোর মা। খালি বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম কি না। তাই মার্গ দর্শন করে গেলেন দেবী।
আবার বললেন বাবা – তোর মায়ের কথা শুনেই তো অতনুকে একটা জায়গায় নিয়ে যাবার কথা মেসেজে বললাম। … তাই দুপুরে একটু অতনুর কাছে যাবো। একজনের সাথে একটু দেখা করার আছে।
আমি বললাম – মা কি এই কথাই তোমায় বললেন?
বাবা – আজ্ঞে হ্যাঁ। … উনাকে দেখে মনে হয় অন্যরকম তাই না! … কিন্তু তোর মা-ই যে এই সিনের সীধু জ্যাঠা।
অদ্ভুত লাগলো, মা আর বাবার এই অদ্ভুত কম্বিনেশনের কথা আমি যতই ভাবি, ততই অবাক হয়ে যাই। … আচ্ছা মা কি বুঝেছেন যে বাবা বুঝেছেন, উনি কি বলতে চেয়েছিলেন? আচ্ছা মা কি বাবাকে এই কথাই বলতে চাইছিলেন, নাকি বাবা মায়ের কথার এমন মানে করলেন?
আমি মায়ের কাছে এই তত্ত্বের ভেরিফিকেশনের জন্য রান্নাঘরে গেলাম। … স্যালাড কাটতে থাকলাম, আর মাকে বললাম – বাবাকে তুমি ঠিক কি বলতে চাইলে বলতো মা?
মাও হাসের ডিমের ঝালটা বাটিতে বাটিতে ঢালতে ঢালতে বললেন – কেন, তোর বাবা তো বুঝে গেছেন, কি বললাম উনাকে।
আমি বললাম – সেটাই জানতে চাইছি, কি বললে তুমি উনাকে?
মা কাজ করতে করতেই বললেন – একটু গভীরে যেতে হয়। … উপুর উপুর দেখে কি আর জলের মধ্যে মাছেরা কি করছে, তা বোঝা যায়! ডুবুরি নামাতে হয়, তবে বোঝা যায়।
আমি আর কিছু বললাম না, আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে গেছি। … সত্যিই মা যে বাবাকে মার্গ দর্শন করতে গেছিলেন, আমি বুঝতেই পারিনি। … কিন্তু বাবা কি করে! … বোধহয়, একেই স্বামীস্ত্রীর কম্বিনেশন বলে।
মা বললেন – লাঞ্চ করে বাবা বেরুবেন তো? তুইও সঙ্গে যাবি, নাকি উনি একাই যাবেন?
আমি – আমাকে বোধহয় নিয়ে যাবেন না উনি। … অতনুআঙ্কেলের কাছে যাবেন।
মা – না না, অতনুদা ওকে অন্য কোথাও নিয়ে যাবে।
আমি – কোথায়?
মা – এস্কোর্ট সার্ভিসের মেয়েদের সম্বন্ধে জানিস! সেখানে।
আমি – মানে? ওরা তো …!
মা – ওরা ছাড়া, ডুবুরির কাজ কে করবে?
না, আজ আমার ধারনা সত্যিই পাল্টে গেল। … আমি আমার মাকে এক সামান্য গৃহবধূ ভাবতাম, আর তারজন্য বাবার থেকে অনেকবার বকা খেয়েছি। … বাবা, বার বার আমাকে বলতেন, তোর মায়ের মত দ্বিতীয় বিদুষী স্ত্রী, সারা পৃথিবীতে খুঁজে পাবি কিনা সন্দেহ। … আজ যে বাবার কথা ১০০ শতাংশ সত্য, তার প্রমাণ পেলাম। … রথিনকাকা ঠিকই বলেছিলেন আমাকে – তোর মা একটা খাটি হিরে, আর তাকে কেউ যদি চিনে থাকে, তা হলো আমার দেখা সেরা জহুরি, তোর বাবা। …
