অনাশ্রমে আশ্রিত | রহস্য গল্প

বেল বাজতে আমি তাড়াতাড়ি দরজা খুলতে গেলে, বাবা বললেন – মিলি, তুই পাশের ঘরে যা, আর আমি না ডাকলে, কোন কারণে একবারও ঘর থেকে বার হবিনা।

আমি একটু প্রতিবাদী দৃষ্টি রাখলে, বাবা বললেন – কেসের জন্য এটা প্রয়োজন।

সেই কথা শুনে, আমি পাশের ঘে চলে গেলে, বাবা দরজা খুললেন। পাশের ঘর থেকে যা শুনলাম, আর পরে বাবার থেকে যা জেনেছিলাম, সেই মিলিয়ে বলি কি হলো সেখানে –

সিআইডিতে থাকা, বাবার খুব কাছের বন্ধু, রথিন কাকা এসেছিলেন। রথিন কাকা, বাবা, আর অতনু আঙ্কেল, এঁরা তিনজন বহু কেস একসাথে হ্যান্ডেল করেছেন, তাই থেকেই এঁদের ঘনিষ্ঠতা। মায়ের থেকে পরে জেনেছিলাম, বাবাকে নাকি বিবাহের জন্য এই রথিন কাকাই রাজি করিয়েছিলেন। প্রথমে বাবা, বিবাহের নাম শুনেই পিঠটান দিয়েছিলেন। মায়ের ভাষায়, প্রচণ্ড ইনটেলিজেন্ট, এবং ভয়ঙ্কর রমাঞ্চক হলেও, বাবা নাকি অত্যধিক ভাবে আনরোম্যান্টিক।

তবে রথিন কাকা, একা আসেন নি। তাঁর সাথে এসেছিলেন, ইরা, অর্থাৎ ইন্টারন্যাসানাল রাধে এসোসিয়েশনের প্রধান, অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের নয়াভূমির যে ইরার মঠ আছে, সেই মঠের মাথা, মহারাজ গবিন্দসখি। বাবা সকলকে নিয়ে এসে বসাতে, প্রথমে নাকি ওই মহারাজ অতনু আঙ্কেলকে দেখে, খানিক ইতস্তত করছিলেন। তারপর রথিন আঙ্কেল উনাকে সিবিয়াই অফিসার বলে পরিচয় প্রদান করাতে, উনি খানিক রিল্যাক্সড হয়ে বলতে শুরু করেন।

কেমন দেখতে সেই মহারাজকে, তা আমি দেখিনি। তবে পরে শুনেছিলাম, শ্যামলা গায়ের বর্ণ, কিন্তু দেহের চামরা অত্যন্ত তৈলাক্ত; মাথা ন্যাড়া, আর পরনে গেরুয়া পোশাক। মাকে উনার ব্যাপারে বেশ কিছুদিন গদগদ দেখেছি; উনি ভক্তি ভরে নাম নিতেন, বলতেন সন্ন্যাসী মহারাজ। যদিও, উনি কি বলেন, তা আমি পাশের ঘর থেকে কান খারা করে শুনি।

উনি বললেন – পুত্র রথিনের দ্বারস্থ হয়েছিলাম আমি বেশ কিছুদিন আগে। … সেই আমাকে নিয়ে এই বেলেঘাটার বাড়িতে নিয়ে আসে। আসলে, একটা কেস নিয়ে আমরা মঠ কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত বিচলিত বাবা। … একটি মাসে ৪৮টি কন্যা মঠ থেকে উধাও – কোন সন্ধান নেই!

বাবা বললেন – শুধু নয়াভূমির মঠ থেকে ৪৮!

মহারাজ – না না, একটাও এখানের নয় বাবা। কিন্তু এটাই তো হেড কোয়ার্টারস, তাই এখানেই চাপ বাড়ছে।

বাবা বললেন – কোথায় কোথায়, কবে কবে এই মিসিং ব্যাপারটা হয়েছে বলতে পারেন?

মহারাজ বললেন – বাবা, আগ্রা থেকে এই চার সপ্তাহে ৮ জন মিসিং, চণ্ডীগড় থেকেও এই সংখ্যা ৮; দিল্লি থেকেও ৮। … অন্যদিকে বাঙ্গালুরু থেকে ৮, উজ্জয়েন থেকে ৮, আর নাগপুর থেকে ৮।

বাবা – পুরোটা এই এক মাসে? ডেট অফ মিসিংটা বলতে পারবেন?

রথিন কাকা এবার বললেন – দাঁড়াও, আমি নোট করে রেখেছি। … হ্যাঁ, টু ইচ, উজ্জয়েন, নাগপুর অ্যান্ড বাঙ্গালুরু … ডেটটা হলো ২২শে ফেব্রুয়ারি, পয়লা মার্চ, ৮ই মার্চ, আর রিসেন্টলি, ১৫ই মার্চ। … অন্যদিকে, …

বাবা – দাঁড়াও দাঁড়াও, ২২শে ফেব্রুয়ারি একই সাথে তিনটে মঠ থেকে ২জন করে মিসিং!

মহারাজ – না বাবা, সেইদিনকে ডায়রি করা হয়েছে। কারুর সেদিনই হয়েছে, আবার কারুর, তার আগের দিন, বা কারুর তার আগের আগের দিন।

বাবা – হুম, আর নর্থে!

রথিন কাকা – হুম, টু ইচ ফ্রম চণ্ডীগড়, দিল্লি, আর আগ্রা, অন ডি ডেট অফ ২৩রড ফেব্রুয়ারি, ২য় মার্চ, ১০ই মার্চ, আর ১৭ই মার্চ।

বাবা বললেন – ওই একই রকম, একদিন বা দুদিন আগে!

মহারাজ বললেন – হ্যাঁ বাবা।

বাবা একটু থেমে বললেন – আচ্ছা কন্যাগুলির নাম আছে তোমার কাছে রথিন?

রথিন কাকা – হ্যাঁ আমি পুরো মিসিং রেকর্ড নিয়ে এসেছি।

বাবা – আচ্ছা, আমাকে দেখে বলতে পারো, কোন কন্যা কি এর মধ্যে রয়েছেন, যার সারনেম লাহিড়ী?

রথিন কাকা – উম … হ্যাঁ, এই তো, … শ্যামলী লাহিড়ী। … মিসিং ফ্রম দিল্লি।

বাবা – ওকে। দেখছি কি করা যায়। তবে আমার প্রশ্ন এই যে, আমার মহারাজের কাছে প্রশ্ন এই যে, সমস্ত কিছু ছেড়ে, আমার মত এক রিপোর্টারের কাছে কেন?

মহারাজ – বলতে পারো বাবা, সুপারিশে এসেছি। মুখ্যমন্ত্রী, স্যন্যাল মহাশয়ের সুপারিশে আমার এখানে আসা। পুত্র রথিন আমাকে এখানে আস্তে সাহায্য করেছে মাত্র।

বাবা – আচ্ছা, ঠিক আছে। দেখছি, কতটা কি করতে পারি। আপনাকে পরবর্তীতে, আমার কাজ নিয়ে আপডেট করে দেব।

মহারাজ উঠে গেলেন। রথিন কাকা উনাকা গাড়িতে তুলে দিতে গেলেন। কিন্তু ফিরলেন একাকী নয়, অবিরামখবরের প্রযোজক, দাশগুপ্ত আঙ্কেলকে নিয়ে এলেন। আমাকে বাবা এবার ডেকে নিয়েছেন ঘরে। আমি এসে বললাম, সবটাই শুনেছি।

দাশগুপ্ত আঙ্কেল এসেই বললেন – এই কেসটা তোমাকে হ্যান্ডেল করতে হবে সিন। … আমার এই কেসটার পুরো কভারেজ চাই। আমি কিছু শুনতে চাইনা, এডভান্স নিয়ে এসেছি। এই নাও ১৫।

বাবা বললেন – এ তো কোন বড় র‍্যাকেট কাজ করছে। … এই কাজ তো সিয়াইডি, সিবিয়াই-এর কেস। … আমি একা একজন রিপোর্টার এখানে কিই বা করতে পারি?

ঈশ, বাবা কেসটা নেবেন না! – আমি ভাবলাম।

দাশগুপ্ত আঙ্কেল – এসবের মানে কি? মুখ্যমন্ত্রীকে তোমার ব্যাপারে বলে, তোমাকে এই কেসে ইনক্লুড করার জন্য রাজি করিয়েছি। পুরো সিআইডি টিম, তোমার নেতৃত্বে কাজ করবে।

বাবা বললেন – বলেন কি দাশগুপ্তদা। এটা হয় নাকি? সিয়াইডি টিম কখনো একটা রিপোর্টারের হয়ে কাজ করতে পারে! কস্মিনকালে এমন শুনেছেন আপনি!

দাশগুপ্ত আঙ্কেল – কস্মিনকালে যে তোমার মত রিপোর্টারও আসেনি সিন! … আসলে নিশ্চয়ই শোনা যেত।

রথিন কাকা – আমরা এই কেস নিয়ে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছিলাম। মুখ্যমন্ত্রী আমাদের মাথার উপর হাতুড়ী পেটাচ্ছেন। বলছেন – কেন্দ্র থেকে এই কেসের জন্য প্রেশার বাড়িয়েই চলেছে। আমরা বললাম, মঠের অভ্যন্তরে কি হচ্ছে, আমরা জানতে পাচ্ছিনা। তো উনি বললেন, কোন রিপোর্টারকে সেখানে পাঠিয়ে খবর নাও, কিন্তু তাঁর এই কেসের নিষ্পত্তি চাই। সেই জন্যই আমরা দাশগুপ্তদার দ্বারস্থ হই। আর উনি বলেন এই কাজ যদি কেউ করতে পারে, তা তুমিই। তবে পুরো সিয়াইডি-টিমকে তোমার সঙ্গ দিতে হবে।

দাশগুপ্ত আঙ্কেল – ইউ ডোন্ট নো সিন, কতটা স্ট্রাগেল করতে হয়েছে আমাকে এই ব্যাপারে। … রিপোর্টার সিয়াইডি টিম চালাবে শুনে মুখ্যমন্ত্রী তো আমাকে গালাগালই দিয়ে দিলেন। … তারপর, আমি উনাকে তোমার কিছু কিছু কেসের কথা বললাম। রথিনও আমার সঙ্গ দিয়েছিল সেখানে। … তারপর উনি রাজি হলেন।

রথিন আঙ্কেল – কালকে চেতলায় উনার বাড়িতে সকাল ৮.৩০টায় তোমাকে আর আমাকে যেতে হবে। আমাকে অর্ডার দেওয়া হয়েছে, আমি তোমাকে নিয়ে যাবো। মুখ্যমন্ত্রী তোমার সাথে পার্সোনালি কথা বলবেন কিছু, আর আমাকে এই কেসের ইন-চার্জ করে এপয়েন্ট করবেন।

বাবা চিন্তিত ভাবে বললেন – তাহলে তো আমার কোন কথাই চলবেনা এখানে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর সুপারিশ, উনার আদেশ তো মানতেই হবে।

দাশগুপ্ত আঙ্কেল বললেন – নাও এবার তো এড্‌ভান্সটা ধর।

বাবা বললেন – সরকারের হয়ে কাজ করতে হবে। তবে আপনি টাকা দিচ্ছেন কেন?

দাশগুপ্ত আঙ্কেল – আমি নয়, আমার সংবাদপত্র মানে অবিরামখবর এই পেমেন্ট দিচ্ছে তোমাকে, কারণ এই খবর অবিরামখবরের এক্সক্লুসিভ কভারেজ হবে।

বাবা ব্যাকা ঠোঁটে হেসে বললেন – ও আচ্ছা, বুঝলাম। মানে এই কেসে আমি অভিমন্যু। একদিকে সিআইডি, অন্যদিকে মুখ্যমন্ত্রী, অন্যদিকে বিরোধী দল, তারপর আপনি মানে অবিরামখবর, আর শেষে মহারাজ গোবিন্দসখি। পুরো চিড়েচ্যাপটা অবস্থা। … এবার আমি অর্জুন হয়ে ব্যূহ থেকে বেড়িয়ে আস্তে পারি না ব্যূহেই আটকে মরে অভিমন্যুর মত শহীদ হই, সেটা দেখার। … ঠিক আছে রথিন। কাল তাহলে চেতলার সেই বিখ্যাত বাড়ি, রাসবিহারীতে আমি আর মিলি তোমায় ঠিক ৮টায় মিট করছি।

মা বললেন – রথিনদা, আজকের ডিনারটা এখানেই করে যান না। দাশগুপ্তদাও রয়েছেন, অতনুদাও রয়েছেন। একসাথে ডিনারটা করা যাবে নয়।

রথিনকাকা বললেন – এখন নয় মাধবি। এই কেস আগে সল্ভ্‌ হোক, তারপর জমিয়ে তোমার হাতের মুখরোচক রান্না খাবো। … আসলে আমার মাথা এখন মুখ্যমন্ত্রী খেয়ে নিয়েছেন। … যতক্ষণ না বিজয়কে উনি দায়িত্বভার অর্পণ করছেন, ততক্ষণ আমার ঘুম নেই।

মা বললেন – এটা কিরকম কথা! আপনারা সকল দিগগজরা থাকতে, উনি তো শুধুই আপনাদের পেটেলদার, তাই না।

রথিনকাকা হেসে উঠে বললেন – ২০ বছর হয়ে গেল সংসার করছো মাধবি, এখনও এই মানুষটাকে চিনলে না! … তোমার মনে হয়, এই মানুষটা যেখানে থাকবেন, সেখানে উনি পেটেলদার হতে পারেন। … আমি তো বাজি রেখে বলতে পারি, যদি মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং উনার সাথে কাজ করেন, তবে মুখ্যমন্ত্রীই উনার পেটেলদার হয়ে যাবেন। … কি বলো অতনু।

সকলের উচ্চৈঃস্বরে হাসির শেষে অতনু আঙ্কেল বললেন – ওর বুদ্ধি আর তার থেকেও সেই বুদ্ধির গতিটাই এমন যে, আমাদের মত পেশাদার ক্রিমিনাল স্পেশালিষ্টরাও ওর সম্মুখে দাঁড়িয়ে কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাই।

দাশগুপ্ত আঙ্কেল বললেন – একজ্যাক্টলি, সেইটাই তো স্যান্যালকে বললাম।

স্যন্যাল মানে মুখ্যমন্ত্রী। উনি নাকি দাশগুপ্ত আঙ্কেলের কলেজের ব্যাচমেট ছিলেন। দাশগুপ্ত আঙ্কেল আবার বললেন – বৌদি, এই কেসটেঁস সল্‌ভ হয়ে গেলে কিন্তু আমি আর রথিন এসে একদিন জমিয়ে ডিনার করে যাবো। … আসলে আপনার হাতের রান্নাকে আমি না বলতে পারিনা। … কিন্তু হ্যাঁ বেচারা রথিন সত্যিই খুব চাপে আছে। … তাই আজ না, আজ খাওয়াটা ঠিক এন্‌জয় করা যাবে না। … কি বলো রথিন।

সেদিনের মত অতনু আঙ্কেল ছাড়া সকলে উঠে পরলেন। অতনু আঙ্কেল আজকে আমাদের বাড়িতেই ডিনার করবেন। বাবা যে এই কেসটা নিলেন, তাতে অতনু আঙ্কেলের খুব আনন্দ হয়েছিল। আমার আনন্দের কথা তো ছেড়েই দিলাম। আমার আনন্দ তো যেই রোমাঞ্চ হবে, তার জন্য। তবে অতনু আঙ্কেল বাবার উদ্দেশ্যে বললেন – বিজয়, তোমার এমন একটা কেস পাওয়াটা খুব দরকার ছিল।

বাবা বললেন – কেন? এমন কেন বললে? … না, এই কেস খুবই জটিল, বুঝতেই পারছি। … তবে, তোমার ইঙ্গিত যেন অন্যদিকে।

অতনু আঙ্কেল হেসে বললেন – তোমার মত ট্যালেন্টের পাবলিসিটি না হলে না, মনটা কেমন খচ খচ করে বুঝলে।

বাবা একটা হাল্কা জোরে নিশ্বাস ছেড়ে হেসে বললেন – কিন্তু আমাদের কাজে পাবলিসিটি হলে, কাজ করা যে অসুবিধা হয়ে যায় অতনু! … যত লোকে আমাদের না চেনে, ততই আমাদের কাজ করা সহজ হয়ে ওঠে, কি তাই না!

অতনু আঙ্কেল – হ্যাঁ কথাটা ঠিকই, কিন্তু তাও বিজয়, লোকের জানা উচিত, ব্রিলিয়ান্সি কত প্রকার হয়। তুমি তার একটা অনবদ্য নিদর্শন, … আমি জানি, তুমি মানবে না, কিন্তু এটাই সত্যি।

কেউ যখন বাবার প্রশংসা করেন, তখন মায়ের চোখের দিকে আমি তাকালে দেখি একটা চমক দেখা যায়। … বুঝতে পারি, উনার খুব গর্ব হয় তখন। কিন্তু বাবার এই জিনিসটা ভালো লাগেনা। প্রশংসা করলে, উনি সেগুলোতে যেন গা-ই করেন না। লোকে নিজের মার্কেটিং করে করে প্রশংসা কেনে, আর ইনি ফ্রিতে প্রশংসা পান, তাও পাত্তা দেন না। … মা মাঝে মাঝে রেগেও যান এই প্রশংসা থেকে দূরে থাকার মনোভাবে আর তখন ঠিকই বলেন – যাচা অন্নের দাম নেই। … তোমাকে সকলে যেচে প্রশংসা দেয় তো, তাই তোমার কাছে তার কদর নেই।

যাই হোক, অতনু আঙ্কেল গেলেন তখন রাত্রি ৯.৩০। বাবা কি একটা পড়াশুনা করতে যাচ্ছিলেন; মা যেন উনারও মা। যেমন আমাকে দাবরে ঘুম পারিয়ে দেন, তেমন বাবাকেও দাবরে ঘুম পারিয়ে দিলেন। আমার কাছে এসে বললেন – তুইও ঘুমিয়ে পর। তোরও তো আগের কেসের সময়ে ভালো ঘুম নেই। দেখতে না দেখতেই পরের কেস এসে গেল। আবার তো ঘুম হবেনা। নে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পর। … শুয়ে পরলাম। ঘুম আসার আগে একটাই কথা মনে হচ্ছিল। মা কি করে জানলেন, কেসের সময়ে ভালো ঘুম হয়না! … বোধহয় মায়েরা সব জেনে ফেলেন, তাই জন্যই মা।

পরের দিন সকালে, বাবার সাথে প্রথমে চিংড়িহাটা, তারপর সেখান থেকে বাস ধরে রাসবিহারী এভিনিউ। বাবা অত্যন্ত পাঞ্চুয়াল। ঠিক ৮.০০ তেই নামলাম রাসবিহারী এভিনিউ মোড়ে। রথিন আঙ্কেল এলেন আরো ১০ মিনিট পর। আমি বাবাকে মাঝে জিজ্ঞাস করলাম – আচ্ছা, তুমি আমাকে ওই মহারাজের সামনে বাইরে আস্তে দিলে না কেন? বাবা উত্তরে হেসে বললেন – ছেলেরা সহজেই গোঁপ দাড়ি লাগিয়ে ছদ্মবেশ ধরে নিতে পারে, মেয়েদের ওটা অতটা সহজ হয়না। … তাই যাতে তোকে ছদ্মবেশ না ধরিয়েই কাজ করা যায়, সেই জন্যই তোর মুখটা দেখালাম না।

বাবার এই কথাগুলো শুনে মাঝে মাঝে ভাবি, একটা মানুষের কি সব সময়ে এমন উপস্থিত বুদ্ধি চলতে পারে? কি করে চলে এমন ভাবে বুদ্ধি! আমার কবে এমন ভাবে বুদ্ধি চলবে? সময় থাকলে হয়তো, আরো বেশ কিছুক্ষণ এই সব নিয়ে ভাবতাম। কিন্তু রথিনকাকা এসে পরায় ভাবনার ইতি সেখানেই হলো।

আমি, বাবার সাথে আর রথিনকাকার সাথে মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ি গেলাম। পৌঁছে একটু অবাকই লাগলো। একদাম আমাদের বাড়ির মতই। অত্যন্ত সাধারণ একটা ঘর। … বাবা ও রথিনকাকা সামনে যেতে, একটা সিকিউরিটি কাকু ছিলেন, বেশ ষণ্ডামার্কা, হাতে ভালোধরনের আগ্নেয়অস্ত্র। তিনি পাশের একজন বেয়ারা গোচের লোককে ভিতরে বোধহয় অনুমতি নেবার জন্য পাঠালেন।

তিনি ফিরে আস্তে আমরা ভিতরে গেলাম। … ভিতরে গিয়ে দেখি, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর স্ত্রীর উপর চেঁচাচ্ছেন। বলছেন – বলছি না সময় নেই। মুরিতে জল ঢেলে দাও। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে বেড়তে হবে। … আমি আবার অবাক হলাম, মুখ্যমন্ত্রী আমাদের মতনই যে।

বাবাদের সাথে আমি ঘরে প্রবেশ করতে, আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন – মেয়েটি কে?

বাবা উত্তর দিলেন – সংবাদপ্রয়োজকদের নাছোড়বান্দা আবদারের কারণে নেওয়া আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, আমার একমাত্র কন্যাও, মিলি সিংহ।

একবার চশমার ফাঁক দিয়ে আমাকে দেখে বললেন – এখনো বেশ কাঁচাই মনে হচ্ছে। … তবে তোমার সম্বন্ধে যা শুনেছিলাম, মনে হচ্ছে কমই শুনেছি। ইয়োর আইজ আর ভেরি মাচ ব্রাইট। … বসো।

আমরা তিনজনে বসলাম। … ঘরটা খুব ছোটই, অন্তত মুখ্যমন্ত্রীর ঘর বললে তো, অত্যন্তই ছোট ঘরটা। …

মুখ্যমন্ত্রী বললেন – কত নেবে কেসের জন্য?

বাবা বললেন – আমার কোন দাবি নেই। … লোকমুখ থেকে শুনে হলেও, আপনি যে আমাকে বিশ্বাস করেছেন, এটাই আমার পারিশ্রমিক।… তবে একটাই কথা।

মুখ্যমন্ত্রী – বলো।

বাবা – আমাকে আমার মত করে কাজ করতে দিতে হবে। … খুব বেশী সময় নেবোনা। … তবে কাজ করার ধরন আমার অন্য রকম। … তথাকথিত রিপোর্টারদের মত নয়।

মুখ্যমন্ত্রী – একটু ক্লিয়ার করে বলো।

বাবা – আমি ছদ্মবেশে কাজ করতে পছন্দ করি। …ঢাকঢোল পিটিয়ে, লোকজানাজানি করাটা পছন্দ করিনা। এতে কেস আরো জটিল হয়ে যায়। যিনি আসামী, তিনি সতর্ক হয়ে যান। … ছদ্মবেশে থাকলে, আসামী টেরও পায়না, তার শিকার হতে চলেছে।

মুখ্যমন্ত্রী এবার রথিনকাকার দিকে তাকিয়ে – বাবা রথিন, এতো জাত শিকারি!

রথিনকাকা বাবার প্রশংসা করার সুযোগ পেলে ছাড়েন না, ঠিক অতনু আঙ্কেলের মতনই। তিনি বললেন – হ্যাঁ স্যার, আমি তো আগেই বলেছিলাম, ও সম্পূর্ণ অন্য ধারার, ওর কম্পোজিশনটাই অন্য রকমের।

মুখ্যমন্ত্রী – হুম তো বিজয়… বেশী সময় দিতেও পারবো না তোমায়। … কারণ একমাসের উপর সময়ব্যাপী এই কেস ঝুলছে। এখনও এর কোন কুলকিনারা হয়নি। … তবে হ্যাঁ, রথিন এই কেশের ইন-চার্জ, আর তুমি যা চাইবে, সেটাই ও করবে। … এটা আমার নির্দেশ। … আমি একটা প্যাডে এটা লিখে দিয়েছি রথিন। … (এই নাও) …

এই বলে একটা প্যাডের কাগজ ছিরে, খামে ভরে দিয়ে দিলেন। … বললেন – দেখে নাও, এতে লেখা আছে, এই কেসের ইন-চার্জ তুমি, আর এই কেসের দেখভাল করবে বিজয় সিংহ। বিজয় সিংহের সমস্ত নির্দেশ মানতে তাঁরা বাধ্য, আর তোমার নির্দেশ মানতে ডিপার্টমেন্ট এই কেসে বাধ্য।

আবার বললেন – বিজয়, আমি এখনই কিছু দিচ্ছিনা তোমাকে। … বাট ইয়েস, তুমি সরকারি কর্মী নও, তাই তোমাকে আমি স্যালারির কথা তো বলতে পারিনা। … সো, এই কেসের নিষ্পত্তি করলে, আমি তোমাকে একটা ১০ লাখ টাকার সরকারি চেক দেবো। … ইট উইল বি ইউর রেমুনারেশন। … চলবে?

বাবা – স্যার, আমি আগেই বলেছি। আপনি এই কেসের দায়িত্ব বিশ্বাস করে আমার উপর দিচ্ছেন, আমার কাছে সেটাই পারিশ্রমিক। … এরপর যা আপনি দিচ্ছেন, সেটা আমার কাছে পারিশ্রমিক হবেনা, বলতে পারেন পুরস্কার হবে।

মুখ্যমন্ত্রী – কিছু অগ্রিম লাগবে?

বাবা – না স্যার। … যদি লাগে, তখন কি করে চাইবো, সেটা বলে দিন।

মুখ্যমন্ত্রী – আমার ল্যান্ডলাইন নাম্বার নিয়ে রাখো। … এই বংশী! সেই বেয়ারাটি একটু তড়িঘড়ি করে এলে, উনাকে বললেন – উনাকে আমার ল্যান্ডলাইন নাম্বার দিয়ে দে। … আর শোন, উনার নাম বিজয় সিংহ। … উনার যা আপডেট আসবে, আমায় তা দিবি, কোন ভুল না করে। … মনে থাকে যেন নামটা, বিজয় সিংহ। …

সেই ভদ্রলোককে দেখলাম, নিজের পকেটের একটা ছোট্ট ডায়েরিতে নামটা নোট করে নিলেন। … বাবা আর রথিনকাকা আমাকে নিয়ে সেখান থেকে চলে এলেন।

রথিনকাকা বললেন – প্রথম স্টেপ কি হবে তোমার?

বাবা – একটু হিসেব করতে হবে। … হিসেবটা করে নিয়ে, তোমায় আজ রাত্রের মধ্যে বলছি, কি হবে আমার প্ল্যান অফ এক্সান।

রথিনকাকা বললেন – আর কিছু লাগবে?

বাবা প্রশ্ন করলেন – মহারাজ গোবিন্দসখি কি নিজে থেকেই এসেছিলেন তোমার কাছে?

রথিনকাকা – আমার কাছে নিজের থেকেই এসেছিলেন, তবে মুখ্যমন্ত্রী স্যান্যাল মহাশয়ের থেকে শুনেছি, উনার গোঁতা খেয়েই আমার কাছে এসেছিলেন উনি।

বাবা বললেন – ঠিক আছে, আপাতত আর কিছু জানার নেই। … সন্ধ্যা রাত্রে তোমাকে ফোন করছি।

আমি আর বাবা বাড়ি চলে এসে, স্নানটান করার পর, বাবা রোজ ধ্যানে বসেন। আর এখন আমাকেও নিয়মিত ধ্যানে বসাতেন। … আমার ধ্যান হতে ১০ মিনিট লাগে, আর তারপর ১-২ মিনিটের ধ্যান হয়।… বাবার ঠিক উলটো। ১-২ মিনিট লাগে উনার ধ্যান হতে, আর ১০-১৫ মিনিট ধ্যান হয়। গভীর ধ্যান। … সেই সমস্ত করে, লাঞ্চ করলাম। মায়ের হাতে তৈরি জমাটি রেওয়াজি খাসির মাংস আর ভাত। … খেয়ে দেয়ে, মায়ের পাশে খানিক শুলাম।

একরকম মা জোর করেই আমাকে পাশে নিয়ে শুইয়েছিলেন। … তাই মা ঘুমিয়ে পরতে, আমি পাশে বাবার কাছে গিয়ে দেখি, বাবা ঘরে পায়চারি করছেন।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5 6