এলিয়ান রহস্য | রহস্য গল্প

বাবা যেমন বলেছিলেন, তেমনই গিয়ে বললাম আব্দুলকে। সন্ধ্যার শেষবেলা আর রাত্রির শুরুতে ছদ্মবেশে মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে ইন্সপেক্টর বালা ঢুকলেন। আমাকে বাবা মেসেজ করে দিয়েছেন, রাত্রের অন্ধকারে, প্রায় দুটো নাগাদ বাবা যেখানে আছেন, সেখানে জলসা বসবে।

আমরা সেই টাইম অনুসারে সেখানে চলে গেলাম। জিপিএস ট্রেস করে, পৌঁছলুম সেখানে প্রায় পৌনে তিনটে। পৌঁছে দেখি, বাবাকে একটা চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। আর উনার মাথায় একজন পিস্তল ঠেকিয়ে রয়েছে। মিস্টার বালা শূন্যে একরাউন্ড ফায়ার করলে, ঘরে থাকা সকলে চমকে উঠলেন। মুহূর্তের মধ্যে দেখলাম, প্রায় জনা ২০ জন পুলিশ, আর মুখ্যমন্ত্রীর দেহরক্ষী ব্ল্যাকক্যাটরা সকলে সেই চারজনকে তাক করে বন্দুক বাগিয়ে রেখেছেন, তাই সকলে হাত উপরে করে নিলেন।

যিনি বাবার মাথায় পিস্তলটা ধরে ছিলেন, তিনি এবার মুখ্যমন্ত্রীর দিকে বন্দুক তাক করতেই, বাবা বাঁধা হাত নিয়েই, মাথা দিয়ে একটা সজোরে গুঁতো মারলেন সেই লোককে। লোকটা একটু বেসামাল হয়ে গেলে, ব্ল্যাকক্যাটের একজন এসে, তাকে জাপটে ধরলেন, আর অন্য একজন মাথায় হাতের বন্দুকের বাঁট দিয়ে আঘাত করতে, লোকটা পুরুপুরি ভিম্রি খেয়ে গেল। তারপর মিস্টার বালা এগিয়ে গিয়ে বাবার বাঁধনটা খুলে দিতে, মিস্টার বাঘ, ইন্সপেক্টর বালার উদ্দেশ্যে কিছু বলতে গেলেন।

উত্তরে, মিস্টার বালা তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বললেন – আমাকে কিছুই বলতে হবেনা, যা বলার আগেভাগেই বিজয় বলে রেখেছে আমাকে।

মিস্টার বাঘ ভ্রু কুঁচকে বললেন – বিজয় সিনহা! সে তো চলে গেছে অনেকদিন হলো।

বাবা এবার হাসতে হাসতে, আমার দিকে ঈসারা করে দিয়ে, নিজের ছদ্মবেশ খুলতে শুরু করলেন। আমিও আমার ছদ্মবেশ ছেড়ে ফেললাম। গরমের মধ্যে এত মোটা ছদ্মবেশের পলেস্তা, প্রাণ বেড়িয়ে যাচ্ছিল। খালি হতে, বাবা বলতে শুরু করলেন – আপনারা অত্যন্ত বোকাবোকা একটা প্ল্যান করেছিলেন, মিস্টার সুতাওয়ালা।

মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে, বাবা আবার বললেন – পরিচয় করিয়ে দিই স্যার, ইনি হলেন অরবিন্দ সুতাওয়ালার ছেলে, রাকেশ সুতাওয়ালা। আপনি অরবিন্দকে চিনতেন, কারণ তিনি আপনার কাছে এই পিলসিমা গ্রামের অধিকার চাইতে অনেকবার আপনার কাছে গেছিলেন। ইনাকে চেনেন না। বাবার অবর্তমানে, এখন ইনিই কোম্পানির মালিক।

অন্যএকজনকে দেখিয়ে বললেন বাবা – ইনাকে তো আপনি চেনেনই। বিহারে বিরোধীদলনেতার ভাইপো। ইনি স্যার হলেন পিলসিমা গ্রামের দেখাশুনা করা সাব-ইন্সপেক্টর, মিস্টার বাঘ; আর ইনি হলেন মিস্টার বাঘ তথা এঁদের সকলের ইনফরমার, যিনি পিলসিমা গ্রামেরই অধিবাসী।

বাবা বলতে থাকলেন – এবার আপনাদেরকে পুরো কেসটা বলি। তবে তার আগে মিস্টার সুতাওয়ালা! … স্যার, এই সব এলিয়ান ফেলিয়ানের গল্প আমেরিকা টামেরিকাতে চলে; সেখানকার সমস্ত মানুষ আধুনিক ভেল্কিবাজির বিজ্ঞানের উপর অন্ধবিশ্বাস করে, এই পোরা দেশের মানুষ আধুনিক বিজ্ঞানের ভাষাই ঠিক করে জানেনা, কি বিশ্বাস করবে বলুন তো!

মুখ্যমন্ত্রী – বিজয় কেসটা একটু বুঝিয়ে বলো দেখি।

বাবা – হ্যাঁ স্যার। কেসের শুরু হয় তখন যখন অরবিন্দ সুতাওয়ালাকে আপনি সাফ বলে দেন যে, পিলসিমা চত্বর হলো উর্বর জমি। সেখানের মাঠক্ষেত আপনি টেলিকম হাবের কেন্দ্র করার জন্য দেবেন না। অরবিন্দ সুতাওয়ালা জাত ব্যবসাদার। তিনি জানেন, যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী সাফ বলে দিচ্ছেন, তখন অন্য উপায় করতে হবে। কিন্তু উনার ছেলে হলেন, ওই বাপের মসনদে এসে বসে পরা ব্যবসাদার। তাই কি করলে কি হয়, এই সবের ধারণা উনার নেই। … উনি প্ল্যান খাটালেন, আর হিসাব করলেন। হিসাব করলেন যে, এই পিলসিমাকে অধিগ্রহণ করে নিতে পারলে। উনার ১২০০ কোটি টাকা প্রথমে, আর তারপরে বহু শতক কোটি টাকার মুনাফা হবে।

থেমে গিয়ে, বাবা আবার বললেন – এই হিসাবটা অবশ্য, আমি ওদের আজকের মিটিংএর কথা পিছন থেকে শুনছিলাম, তাই জেনেছি। আপনারা একটু দেরি করে দিয়েছেন আসতে। তবে হ্যাঁ দুটোর সময় আসলে, এই সমস্ত কথা জানতে পারতাম না। … সেই ১২০০ কোটি টাকার মুনাফা পেতে, ৫০ কোটি টাকা অগ্রিম, আর কাজ হয়ে গেলে, আরো প্রায় ১০০ কোটি দেবেন বলে কথা দেন, বিহারের বিরোধী দলনেতাকে। ১৫০ কোটি টাকা, সামনেই ভোট। বুঝতেই পারছেন, বিশাল কাজে লাগবে, তাই লোভ সামলাতে পারেননি। … কিন্তু কথা এই যে, সেই টাকা নিয়ে উনি করবেনটা কি, বা কেনই বা তাঁকে টাকা দেওয়া হলো!

বাবা একটু পায়চারি করে – টেকনোলজি দিয়ে যেমন বিদেশ সবাইকে এলিয়ানের ভাঁওতা দেওয়া হয়, তেমনই একটা ভাঁওতা দেবার চিন্তা করলো সুতাওয়ালা। কিন্তু বিদেশে সেই ভাঁওতা দিতে অনেক খরচ করে মিস্টার রাকেশ।… হ্যাঁ মানছি, আপনি যেরকম ছায়া ফেলছিলেন, তেমনই ছায়া ফেলেন তাঁরা, কিন্তু তাঁরা আপনার মত মূর্খও ঠিক নন। তাঁরা ছায়াটা মাটি থেকে প্রজেকশন করেনা। প্রজেকশন করে, কনো অন্য আকাশযান থেকে, তাই সকলে মনে করে সত্যি সত্যি এলিয়ান। …

মুখ্যমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে – যাই হোক স্যার, এলিয়ানের ভাঁওতা তো দেওয়া গেল, কিন্তু এলিয়ান আকাশে দেখা গেলে কি আর গ্রামের লোক ভয় পাবে! তাঁরা তো এলিয়ান টেলিয়ানের কিছু বোঝেনই না। তাই কি করলেন উনি? উনি বিহারের বিরোধী দলনেতাকে পয়সা দিয়ে, কিছু ভাড়া করা লোক আনালেন, পূর্ণিমার সময়ে সময়ে। আর তাদের দিয়ে ক্ষেত নষ্ট করতে শুরু করলেন।

আমার দিকে তাকিয়ে – মিলি ভিডিওটা দেখা।

আমি ভিডিওটা দেখিয়ে দেখালাম, কিছু গামছা পরা লোক ক্ষেত নষ্ট করছেন। বাবা বললেন – ওরা গামছা মাথায় দেওয়া মানুষ না এলিয়ান ঠিক বোঝা যাচ্ছেনা তো। … একটু অপেক্ষা করুন, কেউ আসছে এখানে।

রথিনকাকার গলা পেলাম অকস্মাৎ। অদেখা সেই মানুষের গলা বললেন – আসছি না, এসে গেছি বিজয়। …রথিন কাকা এবার সামনে এসে মুখ্যমন্ত্রী স্যারের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন – স্যার, আপনার এই বিশ্বস্ত রিপোর্টার, বিজয়, আপনার থেকে কেসের কথা শুনেই সবটা বুঝে গেছিল। তাই আমাকে বলেছিল গোপনে, এই ৫-৬জন ট্রেনড্‌ অফিসারদের নিয়ে এই পিলসিমা গ্রামের পাসে ঘাটি গারতে। পূর্ণিমার দিন, বিজয়ের মার্গদর্শনে আমরা … কই নিয়ে আয়!

৬ জন সিয়াইডি অফিসার তিনজনকে নিয়ে এলেন। রথিনকাকা আবার বললেন – স্যার, এঁদের মধ্যে এই মানুষটাকে দেখছেন, এ হল সেই সমস্ত লোক, যাকে জাকির সাহাব, মানে বিরোধী দলনেতা ক্ষেত নষ্ট করতে লাগিয়েছিলেন, তাদের একজন। … বোল শালে, কেয়া করনে ভেজাথা তুঝে বোল।

সেই লোকটাও হিন্দিতে বললেন, আমি বাংলায় অনুবাদ করে বলছি – স্যার, এইবার নিয়ে তিনবার আমাদেরকে ক্ষেতের মধ্যে ঢুকে ক্ষেত আর ফসল নষ্ট করতে, আর খুব দ্রুততার সাথে নষ্ট করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এবারেও করে ফিরছিলাম, সেই সময় (বাবাকে দেখিয়ে) উনি পিছন থেকে আমাকে দলের থেকে সরিয়ে নেন। … আমিই সব থেকে পিছনে ছিলাম। আমার নাকে কি গন্ধ দিয়ে দেয়, আর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। তারপর স্যার কাস্টডিতে জ্ঞান ফেরে।

বাবা – ক্ষমা করবেন স্যার, আসল আসামিদের কাছে পৌছাতে হলে, ওদের কিচ্ছু জানতে দেওয়া যাবেনা। তাই আমি পিছনের লোকটাকে মুখে ক্লোরফর্ম দিয়ে নিয়ে যাই, আর রথিনের কাছে হ্যান্ডওভার করে দিই। দেহের শক্তিতে আমি পেরে উঠতাম না, তাই এই ক্লোরফর্মের ব্যবহার করতে হয়েছে।

এবার মিস্টার বাঘের দিকে তাকিয়ে – আর উনি যে এঁদের সাথে মিশে আছেন, তা আমি বুঝে গেছিলাম, প্রথম দিনেই। প্রথম দিনে ফোনে কথা শুনে বুঝে যাই, আমাদের আগমনের বার্তা কারুকে দিচ্ছেন উনি। পরের দিন সকালে, জিপ থেকে নামার পরে, আমি জিপ যেখানে থামবে, ঠিক তার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলাম, ওর ফোনে কথা শুনবো বলে। … মিলি আর অফিসার বালাকে আমি সিগারেট খাবার নাম করে, সরে এসেছিলাম। সেখানে আমার সন্দেহ যে সঠিক, তা কনফার্ম হয়ে যাই।

সেই কারণে, আব্দুলের সাথে কথা বলে, আর মিস্টার বালার সাথে কথা বলে, আজকের দিনে উনাকে যে ফর্স নিয়ে আসতে হবে, আর আমি যে ছদ্মবেশে গ্রামে থাকবো, সেই কথা বলে, আব্দুলের সাথে চলে আসি।… স্যার আব্দুল সবটাই জানতো, তাই ও আমাকে আর মিলিকে ওর বোনের বাড়ি নিয়ে যায়, যেখানে আমরা বেশ পালটে নিই ।

স্যার নতুন বেশ ধারণের দুটো কারণ। মিস্টার বাঘ আমাদেরকে চেনেন। তিনি প্রায়ই এই গ্রামে আসেন, তাই দেখেই চিনে ফেলবেন, আর এই মাথাদের কাছে আমি যে চলে যাইনি, সেই খবর চলে আসবে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, আমি নিশ্চিত ছিলাম যে গ্রামে একজন না একজন তো ইনফরমার থাকবেই, নাহলে এখানে কি হচ্ছে, তার খবর পেতেই পারবেনা কেউ। … তাই এই ছদ্মবেশ।

গ্রামে থাকতে আসার পরের দিনই একটা মিটিং হয়। আগের দুইবার এলিয়ান আক্রমণ হয় পূর্ণিমার রাত্রে আর পরেরটা পূর্ণিমার রাত্রের পরের দিন। তাই সেই নিয়েই একটা মিটিং আব্দুল রাখে, আমারই কথাতে। আর এই মিটিং করতে বলার কারণ ছিল গ্রামের মধ্যে কে ইনফরমার, তাকে চিনে নেবার জন্য। আব্দুলের থেকে সেই রাত্রেই আমি জেনে নি যে মিটিংএ কে আসেনি। আর যারা আসেননি, তাঁদের সংখ্যা হলো মাত্র একজন, ইমতিহান… এই যিনি আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

স্যার, এই এলিয়ানের নামে যেই ভাঁওতাবাজি পৃথিবীজুরে চলে, সবটাই ছায়ার খেলা। আমাবস্যার রাত্রে কি করে আর ছায়া দেখা যাবে স্যার! … ছায়ার মধ্যে ছায়া যে দেখাই যায়না। তাই পূর্ণিমার রাতটা বা মেঘলা আকাশের দিনগুলিকে বেছে নেওয়া হয় এই দৃশ্য সকলকে দেখানোর জন্য। বিদেশে দেখানো হয়, থ্রেট আছে দেখিয়ে, সেই থ্রেট নিয়ে ইন্ডাইরেক্ট ব্যবসা করার জন্য। আর সুতাওালা করলেন, ডিরেক্ট বিজনেস করার জন্য। … তবে ছায়া ফেলার জন্য একটা মিডিয়ামও তো আবশ্যক। এই শূন্য আকাশ তো আর মিডিয়াম হতে পারেনা। তাই যেই পূর্ণিমার রাত্রে, বা তার আগের দিন বা পরের দিন, যেদিন রাত্রের আকাশ আলো ভালো থাকে আর সঙ্গে আকাশে মেঘও থাকে, সেদিনকেই সবসময়ে বেছে নেওয়া হয়, এই এলিয়ানের নামে ভাঁওতা দেবার জন্য।

এঁরাও তাই দিলেন। আর এই পূর্ণিমাতে আকাশে মেঘ থাকবে, পূর্বাভাস আমরা লাভ করতে পারছি, আর ওরা পারবেনা! … তাই ওরা প্রস্তুত হয়। তবে স্যার বলতেই হয়, অত্যন্ত কাঁচা কাজ এদের। একটা জায়গায় ঘাটি গেরে, একজন স্পেস-সসারের ছায়া ফেলছে, আর অন্যজন লাল আর সবুজ লেজার লাইট দিয়ে দেখাচ্ছে যে স্পেসসিপ আলো ছড়াচ্ছে। … বাইরের দেশেও একই ভাবে ভাঁওতা দেয়, কিন্তু স্পেস-সিপের ছায়াটা অন্য একটা আকাশযান থেকে দেয়। আর লেজারটাও, তাই ধরা যায়না লাইট বা ছায়ার সোর্সটা কি, কিন্তু এরা মাটিতে বসেই … মানে করবে চুরি, সেখানেও কার্পণ্য। …

এরও দুটো প্রমাণ আছে স্যার। একটা এই ভিডিও। একটা ভিডিওতে মেঘের উপর মানে মেঘকে মিডিয়াম করে স্পেস-সিপের ছায়া ফেলা হচ্ছে, আর দেখুন লাইট মানে লেজারটা উপর থেকে তলায় নয়, তলা থেকে উপরে যাচ্ছে। আর অন্য প্রমাণটা … রথিন! 

রথিনকাকা বললেন – এই স্যার দুই ব্যক্তি, এদের একজন ছায়া ফেলছিলেন, আর অন্যজন লেজার।

বাবা হেসে বললেন – মিলির তোলা লাস্ট ভিডিওটা দেখুন স্যার। তখন রথিন এঁদেরকে ধরে নিয়ে ছিল। তাই ছায়া সসার তো আকাশ থেকে গায়েব। কিন্তু আকাশে মেঘ থাকার জন্য, লেজার টর্চএর লাইট তখনও দেখা যাচ্ছে। … রথিনরা ছায়া সসার প্রজেক্সানের যন্ত্র, আর ব্যবহার করা লেজার, দুইই নিজেদের কাস্টডি তে নিয়েছে।

আমি অবাক হয়ে গেলাম – বাবা এইসব আমাকে কিচ্ছু বলেনি। সেইদিন রাত্রে বাবাকে ধস্তাধস্তি করে আসতে দেখাচ্ছিল, কারণ বাবা এত কিছু করে এসেছিলেন তাই।

বাবা আবার বললেন – সেই রাত্রে, যখন সকলে এলিয়ানের আক্রমণ হয়েছে বলে ছুটে গেলেন, তখনই শুরু হয়, এই জহ্লাদদের ক্ষেতে নেমে ফসল নষ্ট করার আসুরিক কর্ম। আর সেই সময়ে আমি দেখি কি, ইমতিহান নিজের বাড়ির সামনে পায়চারি করতে করতে বিড়ি খাচ্ছে। আমার যেই সন্দেহ হয়েছিল যে ইমতিহানই সেই ইনফরমার, সেটা পাকাপাকি হয়ে গেল। সারা গ্রাম ফাঁকা। এর থেকে ভালো সময় আর হয়না, গোপন কথা ফোনে সেরে ফেলার। আমি ইমতিহানের পায়চারি করার ধরন দেখেও বুঝে যাই, সে সমস্ত গ্রামবাসির চলে যাবার অপেক্ষা করছে। তাই চুপচাপ, ওর বাড়ির পিছনে এসে গাঢাকা দিই।

আমার অনুমান সঠিক। একটু পরেই ইমতিহান ফোন করলো, আর বলতে শুরু করলো – এই বলে বাবা একটা রেকর্ডিং চালিয়ে দিলেন।

রেকর্ডিংএ ইমতিহানের গলা – স্যার, কাজ হয়ে গেছে আজকের। ফিল্ড ফাঁকা, ক্ষেতে ওরা নেমে গেছে ক্ষেত নষ্ট করতে। … স্যার আজকের টাকাটা কবে পাবো? … (খানিক চুপ … উলটো দিকের কথা হচ্ছে, যেটা রেকর্ডিংএ আসেনি… তারপর আবার ইমতিহানের গলা) … স্যার, সেটা আমি কি করে বলবো? আপনি বলেছেন, ক্ষেত নষ্ট করার ব্যবস্থা করে দিতে, আমি করে দিয়েছি। … এবার গ্রামের লোক কবে ভয় পেয়ে গ্রাম ছেড়ে চলে যাবে, সেটা আমি কি করে বলবো? (আবার চুপ… আমার কথা) ঠিক আছে স্যার, আপনি কাল সন্ধ্যায় গাড়ি পাঠিয়ে দিন। আমি চলে যাবো। … টাকাটাও নিয়ে আসবো, আর পরের আক্রমণের জন্য কথাও বলে আসবো।

বাবা রেকর্ডিং বন্ধ করে দিলেন। …এরপর আর কি! আপনাকে ফোনে জানিয়ে দিলাম, আপনি আসুন, কারণ সেই গাড়ি যেখানে নিয়ে যাবে ইমতিহানকে, সেখানে সবকটা আসামির একসাথে গোলটেবিল বৈঠক বসবে। আব্দুল গিয়ে মিস্টার বালাকে সমস্ত সূচনা দিয়ে দিল। আর আপনারা আমার মিস্টার বালাকে দেওয়া আর রথিনকে দেওয়া ট্র্যাকার ফলো করে, এখানে উপস্থিত, আর এই চার মুখ্য আসামি আপনার সামনে।

মুখ্যমন্ত্রী বালার উদ্দেশ্যে বললেন – এরেস্ট দেম।

সকলকে এরেস্ট করে নিয়ে গেলে, মুখ্যমন্ত্রী পিলসিমা গ্রামে আমাদের নিয়ে ফিরে এলেন। গ্রামবাসি এলিয়ান সঙ্কট কেটে গেছে বলে খুব আনন্দ উৎসব করলো, আর বাবাকে! … কমবয়সী তো ছেড়ে দিন, গ্রামের দাদুরাও পায়ে হাতদিয়ে প্রণাম করতে আসে। … প্রচুর পুরস্কার দিয়েছিল গ্রাম থেকে। এতো এতো সবজি, বিভিন্ন ধরনের আচার, আরো কতকি। গ্রামের মানুষ, কিনে উপহার দেয়না, কষ্ট করে যা উৎপন্ন করেন, সেই সোনার ঘামলাগানো জিনিসই তাঁদের দেওয়া উপহার। মিস্টার বালাও বাবাকে আর সকলকে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ালেন। আর আমরা সন্ধ্যা হতে, মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ে চেপে ফিরলাম।

বাবা বলেছিলেন, আমরা রথিন কাকার গাড়িতে উঠছি, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর আবদার, আমরা যেন উনার সাথে ই যাই। … পথে বাবাকে, একটা ১০ লাখ টাকার সরকারি চেক দিলেন, আর প্রশ্ন করলেন – আচ্ছা বিজয় এলিয়ান বলে কি কিছু সত্যি করেই হয়না! ভিন গ্রহে কি প্রাণ নেই?

বাবা বললেন – স্যার, ভিন গ্রহ ব্যাপারটা কি? একটা কল্পনা, এই কল্পনা যে যেমন পৃথিবী আছে, তেমন পৃথিবীর মত অন্য গ্রহও থাকবে, যাতে প্রাণ থাকবে। … আসলে বিজ্ঞান নিচ হতে হতে, অধমে পতিত হতে হতে, এতটাই নিচে নেমে গেছে যে, এখন তা মনে করে যে, কিছু গ্যাস ইত্যাদির মিশ্রণ হলেই প্রাণ সঞ্চার হবে। … কিন্তু এই ভাবনা ভাবার সময়ে একবারও নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখেনা যে, তাঁরা মরা মানুষকে বাঁচিয়ে তুলতে পারেনা। … আসলে স্যার প্রাণ কি? প্রাণ হলো চেতনার প্রবাহ।

বাবা বলতে থাকলেন – চেতনার উৎস হলেন একমাত্র ঈশ্বর। অর্থাৎ ঈশ্বরকে যতক্ষণ আমরা ধারনা করতে পারি, ততক্ষণই প্রাণ। যেই সেই ধারনা শেষ, অমনি আমরা মৃত। আধুনিক বিজ্ঞান, কিছু চেতনাকে সুপারকম্পিউটারে কোডিং করে, একটা মেশিনে সেই কালেক্টিভ কন্সাসনেশ মানে চেতনাকে ঢুকিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স তৈরি করে ভাবছে, তাঁরা ভগবান হয়ে গেছে, প্রাণ ফুঁকে দিয়েছে তাঁরা। … এটা মুর্খামি ছাড়া আর কি স্যার!

মুখ্যমন্ত্রী বিস্মিত নেত্রে দেখছেন খালি বাবার দিকে, আর বাবা বলতে থাকলেন – স্যার, আমার অঙ্ক কশা সবার আগে হয়েছে না আমার থেকেও আগে কেউ অঙ্ক কশে নিয়েছে, এই ভাবনা থেকেই, আমরা অন্যের খাতায় উকুঝুকি মারি। অর্থাৎ আমরা যতটা বেশি ইন্সিকিওর্ড, ততটাই আমরা অন্যের খাতায় চোখ দিই। তেমনই আধুনিক বিজ্ঞানের নিজের উপর কনো বিশ্বাসই নেই, তাই সমানে অন্য গ্রহের দিকে উঁকিঝুঁকি মেরে চলেছে। … আসল কথা এই স্যার যে, আমরা নিজেদের এট্মস্ফেয়ার ছেড়ে কনোদিনই বেড়তে পারিনি এখনও, আর কনোদিন পারবোও না। … আপনি মুখ্যমন্ত্রী হবার আগে, কেন্দ্রের মন্ত্রীও ছিলেন। আপনি ভালো করেই জানেন, এই সমস্ত চন্দ্র অভিযান, মঙ্গল অভিযান, এগুলো আসলে কি। …

মুখ্যমন্ত্রী হেসে বললেন – হ্যাঁ, সবাই যখন মিথ্যা বলে, তখন মিথ্যা বলারই প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়; এও সমস্ত অভিযানও সেই রকমই।

বাবা – তাহলে বুঝতে পারছেন তো, আমরা শ্রেষ্ঠ জীব নই, আমাদের থেকেও শ্রেষ্ঠ আছে, আর তারা কেন শ্রেষ্ঠ? যান্ত্রিক ভাবে তারা আমাদের থেকে শ্রেষ্ঠ। এর অর্থ বোঝেন স্যার! …

মুখ্যমন্ত্রী মাথা নাড়লে, বাবা আবার বললেন – স্যার, যদি মানুষকে শ্রেষ্ঠ জীব বলে চিহ্নিত করা হয়, তবে মানুষের মধ্যে তো প্রশ্ন আসবে, আমরা কেন শ্রেষ্ঠ? কি আছে আমাদের মধ্যে যার কারণে আমরা শ্রেষ্ঠ? আর একবার সেই প্রশ্ন মনে এসে গেলে কি হবে? মানুষ অন্তর্মুখী হয়ে উঠবে, আর অন্তর্মুখী হয়ে গেলে কি হবে? যান্ত্রিকতার থেকে মানুষের মন উঠে যাবে, আর আত্মার অধ্যায়ন বা আধ্যাত্মের প্রতি মানুষের মন চলে যাবে। আর একবার যদি তা চলে যায়, বুঝতে পারছেন, আজকে যাদের কাছে সমস্ত পয়সা, তা তো টেকনোলজির জন্যই। সেই সমস্ত ব্যবসা শেষ, সেই সমস্ত কোষাগার শূন্য হয়ে যাবে। … তা যাতে না হয়, তাই এই এলিয়ানের গল্প, আর এই বোঝানো যে যান্ত্রিকতা বা টেকনোলজিতে উন্নত হওয়াই আমাদের লক্ষ্য। … অর্থাৎ বর্তমান বিজ্ঞান কি করছে স্যার! ঝুরি ঝুরি মিথ্যা কথা বলছে, আর মানুষজাতিকে ভ্রমিত করে ব্যবসা করছে, যান্ত্রিকতার ব্যবসা।

মুখ্যমন্ত্রী সমস্ত কথা শুনে বললেন – কি ধাতু দিয়ে তুমি তৈরি বিজয়। তুমি আমার কাছে দিনকেদিন একটা আশ্চর্য মানুষ হয়ে উঠছো। … আচ্ছা এই ভাবেই কি এলিয়ানের ভাঁওতা দেওয়া হয়!

বাবা – হ্যাঁ স্যার। মেঘকেই মিডিয়াম করা হয়, আর মেঘের উপরেই স্পেস-সসারের ছায়া ফেলে, তাতে লেজার কাস্টিং করে, যা কনো কালেই সত্য ছিলনা, তাকেই সত্য বলে প্রতিপন্ন করা হয়। আর যেই গুহায় এই সমস্ত আঁকা দেখতে পান, তাও এঁদেরই আঁকা। … এককথায়, এই সমস্তই ব্যবসার ছক স্যার। বাস্তবে মানুষই শ্রেষ্ঠ ঈশ্বরনির্মিত জীব, আর তা ততদিন শ্রেষ্ঠ থাকবে, যতদিন না মানুষের থেকেও অধিক দ্রুততার সাথে কেউ সমাধিস্থ হতে পারবে। সমাধি মানে জানেন তো! … সম্পূর্ণ ভাবে শূন্যে বিলীন হয়ে যাওয়া, যেখানে আমিও নেই, আর আমার ব্রহ্মাণ্ডও নেই।

পৃষ্ঠা: 1 2 3