দ্বিতীয় পর্ব – সন্ধ্যা হতেই
বাবা তড়িঘড়ি বাইরে বেড়িয়ে গেলেন, আর ঘরে আব্দুলকে নিয়ে ঢুকলেন। কি যে হচ্ছে, কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। শুধু বাবা যেমন যেমন করতে বললেন, তেমন তেমনই করলাম। উনি একটা বাইক নিয়ে এসেছিলেন। বহু পুরানো হবে বাইকটা, নয়তো ধুলো রাস্তার উপর দিয়ে নিত্য যাতায়াতের কারণে এমন ময়লা হয়ে গেছে বাইকটা। বাবা আব্দুলের পিছনে বসলেন, হাতে ড্রাফটার আর স্ট্যান্ড। আর আমার পিঠে স্কাইব্যাগ, যাতে বাবার আর আমার জামাকাপড় আছে।
মাঝে থানায় গেলাম। আমি যাইনি। আমি আর আব্দুল রাস্তাতে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। বাবা একাই গিয়ে, বাংলোর চাবিটা মিস্টার বালাকে হ্যান্ডওভার করে এলেন। তারপর বাইক ক্ষণিকক্ষণ চলতেই বুঝলাম, আমরা রামপুরহাট যাচ্ছিনা, বরং আমরা তো পিলসিমার উদ্দেশ্যে যাচ্ছি।
বাইক মাঝে একটা জায়গায় থামলো। সেই জায়গার নাম দাসদেবগ্রাম। সেখানে একটি বাড়িতে আব্দুল আমাদের নিয়ে এলেন। এটা তাঁর বোনের শ্বশুরবাড়ি। আমার হাতে বাবা একটা প্লাস্টিক ধরিয়ে দিয়ে বললেন, পোশাকের সমস্ত কিছু পরে আয়। আমিও পরলাম, সেই কোচির কেসে যেমন মোটা মেয়ে হয়েছিলাম, তেমন হলাম। বেড়িয়ে বাবাকেও দেখলাম, সেই বৃদ্ধের বেশ। কিন্তু কেন এই ছদ্মবেশ!
কনো কথা নেই, আবার বাইকে উঠে সোজা পিলসিমাতে আব্দুলের বাড়ি। বাবার কড়া নির্দেশ, পোশাক ছাড়া যাবেনা, এই পোশাক পরে ঘুমাতেও হবে। ছদ্মবেশটা এই যে, আমরা উগান্ডার অধিবাসী। সেখানের বৈজ্ঞানিক বাবা, আর আমি উনার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
রাত্রে শুতে যাবার আগে, আব্দুল ঘরে এলো। বাবা বললেন – আব্দুল, এবারে মনে হচ্ছে দেখা যাবেনা এলিয়ানদের। আকাশে এতো মেঘ!
আব্দুল – কি বলছেন সাহেব। আকাশে মেঘ থাকলেই তো ওদের দেখা পাওয়া যায়।
বাবা – বাহ, তাহলে তো ভাগ্য ভালো আমাদের, কি বলো?
সামান্য এদিক সেদিকের কথা হয়ে গেলে। শুয়ে পরলাম। পরের পরের দিনই পূর্ণিমা। এলিয়ান দেখবো নিজের চোখে। একটা হেভি উত্তেজনা আসছিল মনে।
পরেরদিন ছিল একা মিটিং। গ্রামের সকলকে নিয়ে আব্দুল সাহেব মিটিং করলেন। খাওয়াদাওয়া অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। সমস্ত দিশি খাবার। স্বাদই আলাদা। তারপরের দিন, মানে পুরনিন্মার দিন সকালে উঠে দেখি, বাবা ড্রাফটারকে ছুরি দিয়ে ছুলে ছুলে, অবিকল টেলিস্কোপের মত দেখতে একটা যন্ত্র করেছে। বিকেল বিকেল হতেই, আব্দুলের টালির চালের উপর একটা টুল নিয়ে স্ট্যান্ড রেখে, বাবার দ্বারা নির্মিত নকল দুরবিন চোখে লাগিয়ে বসার ব্যবস্থা করলেন। আমাকে বললেন – চোখ রেখে দেখ কিছু দেখতে পাস কিনা! …
আমি চোখ রাখতে দেখি, একটা ক্যামেরা লেন্স লাগানো রয়েছে ড্রাফটারের মধ্যে। তাকিয়ে দেখলাম, নিচে একটা ক্যামেরা বসানো। বাবা আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললেন, স্ট্যান্ডের উপর ভর করিয়ে ক্যামেরা ঘোরাতে থাকবি, (একটা সুইচ দেখিয়ে বললেন) যদি কিছু দেখিস, ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে বা সেরকম, তবে এই সুইচটা টিপবি, ভিডিও রেকর্ড হয়ে যাবে।
রাত্রি ৯টা, চারিদিকে একটা হইহই পরে গেছিল। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখতে দেখলাম, স্ত্রীরা শাড়ির আঁচল লুটিয়ে আর পুরুষেরা লুঙ্গি গুটিয়ে কনো একদিকে ছুটছেন। সেই দেখে, আব্দুল বাবার দিকে তাকাতে, বাবা ইশারায় বললেন – যাও, সবাই যেই দিকে যাচ্ছে। … আব্দুলও দেখলাম লুঙ্গি তুলে ছুট লাগালো।
সবাই চলে গেলে, গ্রাম পুরো শ্মশানের মত চুপচাপ। বাবা আমাকে টালির মাথায় তুলে দিয়ে বললেন, যেমন বলেছি, তেমনটাই করবি। এই বলে চলে যাচ্ছিলেন। আমি বললাম – তুমি কোথায় যাচ্ছ।
বাবা – আমার অন্য কাজ আছে। তোকে যেটা বললাম, সেটা কর।
আব্দুলের বাড়ি দোতলা। টালির ছাদ দেওয়া বাড়ি যে দোতলাও হয়, সেটা খালি টিভিতেই দেখেছিলাম। এই প্রথম সচক্ষে দেখলাম। পুরো গ্রামে এই একটাই এমন বাড়ি। এর মাথায় বসে, প্রায় পুরো গ্রামই দেখা যায়। আমি প্রথমে উপরের দিকে ড্রাফটারতা ঘোরালাম, দেখলাম যেমন টিভিতে দেখি, তেমন কালো কালো শসার, মেঘের উপরে ভাসছে, আবার একটা মেঘ সরে গেলে, অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আবার একটা অন্য মেঘ এলে ছায়া দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে লাল আর সবুজ আলোর ঝলক দিচ্ছে স্পেস সিপগুলো।
এই বিরল দৃশ্যকে ক্যামেরা বন্দি করবো না! আমি ভিডিও রেকর্ডিংএর সুইচ মেরে দিলাম। বেশ খানিক ক্ষণ সেই দৃশ্য রেকর্ড করলাম। তারপর, কি যেন খশখশ আওয়াজ আমার কানে ভেসে এলো। ক্যামেরা নিয়েই এদিক সেদিক করতে গিয়ে দেখলাম, বেশ কিছু ক্ষেতের তলায় যেন কিছু রয়েছে, আর কি প্রবল গতিতে ক্ষেতগুলো সমস্ত লণ্ডভণ্ড করা হচ্ছে। আমি আর ভিডিও বন্ধ করলাম না। একই ভিডিওতে সমস্ত কিছু রেকর্ড করতে থাকলাম।
আবার খানিক পরে দূর থেকে একটা হো হো শব্দ শুনে উপর দিকে তাকালাম। দেখলাম আকাশ পরিষ্কার। শসার দেখা যাচ্ছেনা। কিন্তু একটা লাল আলো যেন অদৃশ্য একটা আকাশের স্থান থেকে ভেসে আসছে। … আমি সেটাও রেকর্ডিং করলাম। আর রেকর্ডিং করতে করতেই, দেখলাম লাল আলোটা আসা বন্ধ হয়ে গেল। মেঘ এলো আকাশে, কিন্তু এবার আর শসার দেখা গেল না।
ভিডিও বন্ধ করে দিলাম। ভিতরে ভিতরে প্রচণ্ড থ্রিলিং লাগছিল। নিজের চোখে স্পেসসিপ দেখেছি আমি। … ভাবা যায়। … যেটাই হোক, বাবা হয়তো এই কেস শলভ করতে পারবেনা। কিন্তু বাবার দৌলতে নিজের চোখে স্পেসসিপ দেখা তো হয়ে গেল! তবে আমার ভাবনার আনন্দ খানিকক্ষণেরই ছিল। খানিক পরে, গ্রামের মেয়েদের, পুরুষদের আর্তনাদ শুনে, সামনের দিকে তাকালাম। দেখলাম, সকলে হাহুতাশ করছেন। আর বলছেন, আমাদের সব শিষ হই গিল রে। … আমরা ধনেপ্রাণে গেলুম রে!
তাকিয়ে দেখলাম, চারিদিকের ক্ষেত তছনছ হয়ে গেছে। আমি ড্রাফটার আর স্ট্যান্ডতো পারতে পারিনি, তবে ক্যামেরাটা নিয়ে নেমে এসেছিলাম। বাবা তখনও আসেনি। … ক্যামেরা নিয়ে ঘরে চলে গেলাম। প্রথম ক্যমেরাটা ব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলাম, বাবার ইন্সট্রাকশান অনুযায়ী। তারপরেও বাবা ফেরে না! … বাবা ফিরলেন প্রায় আরো এক ঘণ্টা পরে। রাত্রে আর খাওয়াদাওয়া হয়নি। হয়তো কনো বাড়িতেই সেদিন আর ভাত চাপেনই রাত্রে। তবে বাবাকে দেখলাম, বাবার জামাকাপরে ধ্বস্তাধস্তির স্পষ্ট ছাপ রয়েছে।
আমি বললাম – বাবা কোথায় গেছিলে তুমি! … কারুর সাথে কি ধ্বস্তাধস্তি হয়েছে তোমার?
বাবা – ও তেমন কিছু নয়। … তুই কি ভিডিও করেছিস কিছু?
আমি – ইয়েস স্যার।
বাবা – এখন চেপে যা, রাত্রে ঘরে বসে দেখছি।
রাত্রে বিছনায় শুয়ে শুয়ে বাবাকে ভিডিওগুলো দেখানোর সময়ে, আমার কমেন্টস সমানে বর্ষার ধারার মত ঝরতে থাকলো। আমি বললাম – এই দেখ বাবা, এলিয়ানদের স্পেস শিপ, লাল আর সবুজ আলো আসছে।
আবার ক্ষেত নষ্ট হবার দৃশ্য দেখানোর সময়ে বলতে থাকলাম, কেমন অদ্ভুত ভাবে ক্ষেত নষ্ট করছে দেখলে!
শেষ ভিডিওটা দেখানোর সময় বললাম – দেখ, স্পেস শিপ দেখা যাচ্ছেনা, কিন্তু আলো দেখা যাচ্ছে, দেখেছো কি এডভান্স টেকনোলজি!
বাবা সমস্ত ভিডিওগুলো দেখলেন, একটাও কথা বললেন না। সমস্ত দেখে, একটু চোখ বুঝে শুইয়ে রইলেন, তারপর বললেন – আমার মনে হচ্ছে … ঠিক আছে। কাল সন্ধ্যার দিকে, একটু বেরোবো। তুইও সঙ্গে থাকবি।
আমি – কি ব্যপার বলো তো? এত সুন্দর সুন্দর ভিডিও দেখালাম, তুমি কনো কমেন্ট দিলে না যে!
বাবা – হুম, ভিডিওগুলো সত্যিই খুব ভালো তুলেছিস।
আমি – আরে ধুত, আমি আমার পছন্দের কমেন্ট চাইনি। কিছু বলো ভিডিওগুলোর ব্যাপারে।
বাবা – হুম, খেয়াল করে দ্যাখ, আলোগুলো স্পেসসিপ থেকে আসছে না, স্পেসসিপে যাচ্ছে। আরো একটু খেয়াল করে দ্যাখ, স্পেস সিপ থেকে আলোটা আসছে না, তাই স্পেসসিপ দেখা না গেলেও, আলো যাচ্ছে। … আর ক্ষেত নষ্ট করার ব্যাপারে, বোধহয় তুই ভিডিওটা ঠিক করে দেখিস নি। ভালো করে দ্যাখ, দেখতে পাবি বেশ কিছু গামছা দিয়ে মাথা জরানোর ছবি। … এলিয়ানরা বুঝি মাথায় গামছা দিয়ে ক্ষেতে নামে?
বাবার কথামত আমি আবার ভিডিওটা দেখলাম, একটু স্লো মোশানে দেখতে দেখলাম, বাবা ঠিকই বলেছেন। এতো কিছু মাথায় গামছা জরানো মানুষ। … না মানুষ কিনা বোঝা যাচ্ছেনা। তবে এলিয়ান যদি গামছা না ব্যবহার করে, তবে তারা মানুষ, এটা নিশ্চিত।
বাবা চুপচাপ। আমি বললাম – আর কিছু বলো। এরপর তাহলে করনিয় কি?
বাবা – কিছু সন্দেহজনক লোককে ধরা হয়েছে, জেরা করা চলছে। … আর আমার ধারনা যে, যা বা যারা এই কাজ করছে, তারা খুব শীঘ্রই মিটিং করবে। মুখ্যমন্ত্রীকে খবর পাঠিয়ে দিয়েছি। উনাকে আসতে বলেছি, হাতেনাহাতে আসামিকে ধরার জন্য। … আমার ধারনা যদি ঠিক হয়, তবে খুব তাড়াতাড়ি আমাকে গা ঢাকা দিতে হবে। আমি গা ঢাকা দিলে, আমার সাথে কনোরকম যোগাযোগ করবি না, শুধু আমি যেমনটা বলবো মেসেজে, তেমন তেমন করবি।
বাবা চোখ বন্ধ করে, বিশ্রাম নিলেন। আমি আর কথা বাড়ালাম না। পরেরদিন সন্ধ্যায়, আমি আর বাবা, আমাদের ছদ্মবেশেই গ্রামের পথে ঘুরছিলাম। গ্রামের শেষ প্রান্তে এসে গেলে, একটা টাটাসুমো গাড়ি দেখে বাবা সতর্ক হয়ে গেলেন। আমাকে বললেন – আমি এই গাড়ির পিছনে উঠে বসছি। তুই বাড়ি ফিরে যাবি, আর আব্দুলকে বলবি, বাবা একটা বিশেষ কাজে গাঢাকা দিয়েছে। আর বলবি, ছদ্মবেশে মুখ্যমন্ত্রী আসবেন। রাত্রের মধ্যেই, ইন্সপেক্টর বালা আসবেন। আর উনি আমার জিপিএস ট্র্যাকিং করে, আমার কাছে উনাদের নিয়ে যাবেন। সঙ্গে তুইও চলে আসবি।
বাবা আর কথা বাড়ালেন না। একটা বড় ক্লিপ দিয়ে গাড়ির দরজাটা হাল্কা করে খুলে, পিছনের দরজার লকটা খুললেন। তারপর যেমন দরজা লক ছিল, তেমন করে দিয়ে, বাবা পিছনের ডালা খুলে ঢুকে ভিতর থেকে লক করে দিলেন। আমি চুপিসারে সেই জায়গা থেকে সরে গেলাম।
