এলিয়ান রহস্য | রহস্য গল্প

বাবার নতুন গাড়ি হবার পর, আমি আর মা খুব প্ল্যান করে ছিলাম, এখানে যাবো, সেখানে যাবো। কিন্তু সেইসব কিছুই হলো না। আমাদের চিফ মিনিস্টার আগের কেসের সময়েই বাবার সঙ্গে কথা বলে রেখেছিলেন, কনো একটা গোপন অভিযানে পাঠাবেন। দুদিন যেতে না যেতেই মুখ্যমন্ত্রীর দরবার থেকে বাবার কাছে ফোন এলো, তড়িঘড়ি ফরমাইস যেন বাবা, তাঁর এসিস্ট্যেন্টকে নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সাথে সাখ্যাত করেন।

গাড়ি চাপতে পারবোনা বলে মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল। মা আমাকে বোঝাচ্ছিলেন, গাড়ি তো আমাদেরই, এই কেসের পর ফিরে এসে, গাড়ি চরবো। মুখ্যমন্ত্রী কেস দিচ্ছেন। বেশ মোটা টাকার কেস হবে নিশ্চয়ই। …

কথাটা বাবার কানেও গেছিল নিশ্চয়ই। কারণ বাবার মাঝে উত্তর এলো। উনি বললেন – ভাবছি গাড়ি আর তোমাদের নিয়ে একটা বড় ট্রিপ করে আসি। হ্যাঁ মুখ্যমন্ত্রীর ফরমাইস, তাই দেখা তো করতেই হবে। মিলিকে আর নিয়ে যাচ্ছিনা। আমি একা গিয়েই বলে আসি, এই কেসটা আমি করবো না, নতুন গাড়ি হয়েছে, একটু পরিবারের সাথে ঘুরে আসবো।

মা একটু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন কথাটা শুনে। মা বলে উঠলেন, গাড়ি তো আমাদেরই থাকবে। ঘুরতে যাবে বলে, নিজের প্রফেশান ছেড়ে যাবার চিন্তা করা, এমন কথা তোমার মুখে তো মানায় না!

বাবাও গম্ভীর কণ্ঠে উত্তর দিলেন, তদন্ত করা আমার প্রফেশন তো নয়! … আমার প্রফেশান হলো রিপরটিং করা।

মা উত্তেজিত হয়ে উঠে বললেন – কিন্তু এই পাঁচছয়টা যে কেস হলো, কত কামাই হলো বলো তো?

বাবা এবার গম্ভীর কণ্ঠে বললেন – কামাই বেশি হবে বলে আমি তদন্ত করি না। যদি তেমনই হতো, তবে একটা প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি খুলে বসতাম। রথিন, অতনু আর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর একটি কলমের খোঁচা, এই তিনের বলে সেটা করতেও আমার বিশেষ সময় লাগতো না। … একবার সেটা নিয়ে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে, তাদের দেওয়া চুরি, ছিনতাই, হুমকি, পারিবারিক খুনোখুনি, এসবের তদন্ত করে কামাই করতাম। … আমি সেই কেসেই তদন্ত করতে এগিয়ে যাই, যেই কেসের সাথে দেশের, রাজ্যের, বা সম্পূর্ণ মানবজাতির ভবিষ্যৎ জরিয়ে আছে। … কনো একজনের সাথে ন্যায় করার জন্য দেশে পুলিশ আছে। পুলিশ নিজের কাজ ঠিক করলো না ভুল করলো, সেটা দেখার জন্য দেশে ন্যায়ালয় আছে। ইটস নান অফ মাই বিজনেস।

এই কথাতে মায়ের একটু ইগো হার্ট হয়ে গেছিল বোধহয়। তিনি একটু রেগেমেগেই বললেন – ও শুধু, দেশ, রাজ্য, বা মানবজাতির স্বার্থেই তুমি কেস নাও!

বাবা মাকে আর কথা আগে বাড়াতে দিলেন না। তিনি গলা চড়িয়ে বললেন – একদমই তাই। মিলিকে নিয়ে প্রথম যেই কেস করেছিলাম, কোচিতে গিয়ে, সেটা এই কারণে করেছিলাম, কারণ এর সাথে দেশের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধির সম্পর্ক ছিল, খেয়াল করে দেখ। আশ্রমে গিয়ে যেই কেস নিই, মুখ্যমন্ত্রীর ফরমাইসে, সেটাও এইজন্যই নিই, কারণ সেখানে মানবজাতির ভিত্তি, মানবধর্মকেই পলিউটেড করা হচ্ছিল, কলুষিত করা হচ্ছিল। বৎসনাভ নিয়ে কেসটা প্রথমে নিই নি। সঙ্গে ছিলাম, কনো কেউ আমাকে এপয়েন্ট পর্যন্ত করেনি। কিন্তু ছিলাম কেসে, আর বেশি করে রইলাম, যখন দেখলাম, এই কেসের উদ্দেশ্য হলো, সত্যধর্ম অর্থাৎ লকারের গহনাকে লকার থেকে কেউ বার করে আনতে চাইছিল বলেই, খুনের রহস্য।

মা আবার মুখ খুলতে গেলেন, কিন্তু আবার বাবা মায়ের মুখ বন্ধ করে দিয়ে বললেন, অভিনেত্রীর খুন। মিলি ছিল সঙ্গে, মিলিকে প্রশ্ন করো। অভিনেত্রীর ভাই আমাকে কেসটা নিতে বলেছিল। আমি কি বলেছিলাম? … বলেছিলাম, আগে যাই দেখি, যদি নেবার মত কেস হয়, তবে নিশ্চয়ই নেব। যখন দেখলাম যে এই খুনের পিছনে রয়েছে, সারা বাংলায় ড্রাগ পাচারের চক্র, তখনই কেসে সিরিয়াসলি আগে এগোলাম। এর আগের কেসেও, একই কারণ। গোপাল চুরি হোক, বা খুন, পারিবারিক কাণ্ড নিয়ে আমার কনো মন্তব্যই নেই। কিন্তু যখন দেখলাম আন্তর্জাতিক চক্র, আমাদের দেশের ঐতিহ্য হাতিয়ে নিতে চাইছে, তখনই আগে এগিয়েছি। …

একটা জোরে নিশ্বাস নিয়ে বাবা আবার বললেন, মিলির মা, আমি এই পাঁচটা কেসে এতোই টাকা উপার্জন করেছি, যা এর আগের সমস্ত উপার্জন মেলালেও, তার থেকে বেশি। কিন্তু কেন পেয়েছি জানো? কারণ আমি এই কেসগুলোতে এগিয়েইছিলাম, যেই দেশে জন্ম নিতে পেরে ধন্য হয়ে গেছে এই জীবন, সেই ভারতের সম্মান রক্ষার জন্য, সিদ্ধপুরুষদের এই রাজ্য, বাংলা, যাতে পরস্পর অবতারগন জন্ম নেন, একের পর এক সাধকের জন্ম হয়ে আমাদের এই জন্মকেই ধন্য করে দিয়েছে, তাঁর মানুষের মধ্যে নিকৃষ্ট ভাব যাতে না আসে, তাঁর মানুষদের মধ্যে উৎকৃষ্ট কিছু আসলে, তাকে যখন কেউ নষ্ট করে দিতে যায়, তার তদন্ত করে, এই দেশমাতার, এই বঙ্গভূমির, এই মানবজাতির রক্ষা করার প্রচেষ্টা করতে এগিয়ে যাই বলেই, এই টাকা আসে। এটা আমার প্রফেশান হলে, এতো টাকা আসতো না, শুধু আমার ফিজটা আসতো।

মা আর একটাও কথা বললেন না। আমার বাবা আর মা, দুইজনের মধ্যেই একটা গুন দেখেছি; ইনাদের দুইজনেরই যদি একবার অনুভব হয়ে যায় যে তাঁরা ভুল করছিলেন, তাহলে, তাঁরা কনো সময় নষ্ট না করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মাও তাই করলেন। উনি মাথা নিচু করে, বললেন ভুল হয়ে গেছিল আমার। আসলে, আমার মাথায় … সবার যেমন আসে … না না, সবাই করে বলে, আমিও করবো, এটা কনো কথা নয়। আমি ভুল করে ফেলেছি। … যেখানে আমার তোমাকে নিয়ে গর্ব করে বলা উচিত, আমার স্বামীর জন্য আজ সিনেমা জগত যেই ড্রাগের চক্র বাংলায় বসাচ্ছিল, তা বসতে পারেনি; কোথায় আমি বলবো আমার স্বামীর জন্য ধর্মকে নিয়ে যারা নোংরা বাণিজ্য করতে শুরু করেছিল, তারা ভিম্রি খেয়ে গেছে, কিন্তু আমার মাথায় টাকাটাই এলো …

বাবা এবার মায়ের কাছে এসে, মায়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন – টাকা দরকার, পেট চালানোর জন্য নিশ্চয়ই দরকার। কিন্তু সেই টাকার জন্য জীবন বাঁচার জন্য, ঈশ্বর আমাদেরকে এই জীবন দেননি, তাই না! … টাকা আমাদের জীবন দেয়নি, জীবন দিয়েছেন ঈশ্বর। এই শরীরের মধ্যে জীবন ফুঁকেছেন তিনি, আর এই শরীর পেয়েছি আমরা এই ভারতমাতার জন্য, এই বঙ্গভূমির জন্য। তাঁরাই তাঁদের মাটি দিয়ে আমাদের এই দেহের সৃজন করেছেন। তাই টাকার জন্য বাঁচা মুর্খামি, এটা বলার মত জ্ঞানী তো আমি নই, তবে হ্যাঁ এটা অবশ্যই বলতে পারি যে, শুধু বিভিন্ন উপায়ে টাকা উপার্জনের জন্য, বা যেখান থেকে টাকা পাচ্ছি, তার গুলামি করার জন্য বেঁচে থাকা, এটা সেই ঈশ্বরের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা, যিনি বিশ্বাস করে আমাদের দেহে প্রাণ ফুঁকেছেন।

মায়ের চোখে জল দেখলাম এবার। বোধহয় খানিকটা অনুশোচনায়, কিন্তু বাকিটা গর্বে। যদি শুধু অনুশোচনা থাকতো তবে বাবার চোখে চোখ রাখতেন না উনি। কিন্তু উনার চোখে, নিজের ছলছলে চোখ রাখতে, বুঝলাম সেই জলের ৭০ শতাংশ গর্বের কারণেই। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, সেই কারণেই তুমি তোমার প্রিয়লেখকের খুনিকে নিজের কাছে রেখে, তাঁর সেবা করে চলেছ। তিনি খুন তো করেন নি। আসলে যিনি লকারের গহনাকে সকলকে দেখানোর অপরাধ করতে চলেছিলেন, তিনি তাঁকে সেই অপরাধ করতে না দিয়ে, ধর্মের সেই গ্রন্থকে রক্ষা করলেন, যা পাঠ আর অনুধাবন করে ভবিষ্যতে সহস্র সাধুঋষি নির্মাণ হবে। মহাভারতের মত লকারের গহনা সকলের সামনে এসে গেলে, আজ যেমন মহাভারত নিয়ে সাম্প্রদায়িকতা হয়, তেমন বিষ মানবসভ্যতায় মিশে যেত।

আবার থেমে গিয়ে মা বললেন – হ্যাঁ ওই কেসে তো তুমি কিছুই পাওনি বলতে গেলে, কারণ ওই কেস তো তোমাকে কেউ দেয়ই নি। … শুধুই ঈশ্বরের নির্দেশে যেই মানুষরা কাজ করছেন, তাঁদের সত্য উদ্ঘাটন করে, তাঁদের সেবা করার জন্যই ওই কেস করেছিলে। পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরেছ, দেবী বিদিপ্তাকে নিয়ে এসেছ। … আমাদের সকলের জীবনকে ধন্য করে দিয়েছ। …

বাবা এবার ক্লাইম্যাক্স শেষ করার জন্য বলে উঠলেন – তাহলে হেডমিস্ট্রেস আমরা যাই! … যদি দেখি যে সমস্ত মানবজাতির কল্যাণ করার সুযোগ রয়েছে এই কেসে, তবে কেস নেবো, নাহলে নেবো না।

মা হেসে বললেন – হেডমিস্ট্রেস! …

মায়ের কিন্তু মনের গ্লানি কম হয়নি। একা একা, থুম হয়ে বসে ছিলেন। উনার চোখে বাবার জন্য সম্মান ছিল, নিজের ভাবনার প্রতি গ্লানি ছিল, আরো হয়তো কিছু ছিল, যা আমি ধরতে পারিনি। বিদিপ্তা দেবী উনার কাছে গিয়ে, উনার পাসে বসলেন।

মা বাচ্চা মেয়ের মত কেঁদে উঠে বিদিপ্তা দেবীর কাঁধে মাথা রেখে বললেন – এতো দিন ধরে উনাকে দেখেও, আমি উনাকে কিচ্ছু জানলাম না। কিচ্ছু চিনলাম না মা উনাকে। উনার মত মানুষের পত্নী হতে পারা যে কতটা গর্বের আর সৌভাগ্যের, এখনো অনুভবই করতে পারলাম না মা!

বিদিপ্তা দেবী আমার বড় দিদি, আর আমি উনার ছোট বোন। না বয়সে নয়। বয়সে তো উনি আমার বাবার থেকেও অনেক বড়। কিন্তু আমাদের সম্পর্কটা ওরকমই। উনার কথা আমার কাছে অমৃতের মত। উনি মাকে বললেন – আসলে কি জানিস তো মেয়ে! আমরা একটা মানুষকে ততটাই চিনি, যতটা সেই মানুষটার কাছে আমাদের প্রয়োজন থাকে। তার থেকে একটুও বেশি আমরা চিনি না। চেনার প্রয়োজনও পরে না। … কখন প্রয়োজন পরে জানিস এই চেনার? কখন এই চিনতে না পারলে, কষ্ট হয়, মনের মধ্যে একটা কাঁটা ফোটে জানিস!

মা কিছু না বলে জিজ্ঞাসু নেত্রে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে, বিদিপ্তা দিদি হেসে বললেন – যখন সেই মানুষটা অদ্ভুত প্রতিভাবান হন। … বিজয় আসলে সেই রকমেরই একটি প্রতিভা। বুদ্ধি, মনের গভীরতা, গভীর আধ্যাত্মিক চেতনা, সমস্ত কিছু মিলিয়ে ও একটা বিরল প্রতিভা। সাধারণ মানুষের মত তুই তো তোর যতটা ওর থেকে প্রয়োজন ততটাই ওকে চিনেছিস। কিন্তু ওর প্রতিভার ঝলক যখন যখন তুই দেখিস, তখন তখন তোর মনে হয়, মানুষটাকে চিন্তেই পারলাম না।

মা শান্ত হলেন। আর আমরা পরের দিন সকালে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে যাত্রা করলাম। বিচিত্র কেস বটে, মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া কেসটা। আমি তো বাবাকে মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তর থেকে বেড়িয়ে বললাম, এই কেস নিলে কেন বাবা!

বাবা হেসে একটাই কথা বললেন, এটা ঘোর গণ্ডগোল নয়, ঘোর নোংরামি। এই নোংরামি বিদেশে চলতে পারে, কিন্তু এই ভারতে এই সমস্ত নোংরামির কনো স্থান নেই। তাই নিলাম কেসটা।

নোংরামির কি পেলেন বাবা, তা তো বুঝতে পারলাম না। আপনারা বুঝলেও বুঝতে পারেন। তাই মুখ্যমন্ত্রী যেই কেস দিলেন, তার বিবরণ আপনাদের প্রদান করি। জায়গাটা মুর্শিদাবাদ। বহরমপুর থেকে রামপুরহাটের মাঝের একটা বড় গ্রাম। বড় এই কারণে নয় যে, সেখানে প্রচুর মানুষ থাকেন। জনবসতি সেখানের সব মিলিয়ে ১৫০ থেকে ২০০ মাত্র। কিন্তু সেখানে প্রচুর ক্ষেত, আর ক্ষেতের কারণেই গ্রামের  এরিয়াটা বড়।

এই গ্রামটার উপর আগে, মানে এই বছর দশেক আগে, চোখ ছিল একটা টেলিকম কোম্পানির। এই গ্রামটা নাকি এমন জায়গায় রয়েছে, যার তলা দিয়ে কেবিল তার নিয়ে গেলে, প্রায় কয়েক হাজার কোটি টাকা বেঁচে যেত। কিন্তু এই গ্রাম না পাবার জন্য মুর্শিদাবাদে ওই কেবিল কোম্পানির কাজই স্থগিত হয়ে গেছে। পরে অবশ্য সেই কোম্পানির মালিক মারা গেছেন। তাই এই সমস্ত কিছু বিশবাঁও জলে চলে গেছে।

কিন্তু ইদানীং যেই উৎপাত আরম্ভ হয়েছে, সেই গ্রামে, তা হলো এলিয়ানের উৎপাত। এলিয়ান মানে, অন্য গ্রহের জীব, আর ধারনা করা হয় যে মানুষের থেকে অনেক উন্নত জীব। এরা নাকি এই গ্রামের ফসল নষ্ট করে দিচ্ছে, হয়তো নিজেদের ঘাটি গাড়ার জন্য। এবার আপনারাই বলুন, এখানে নোংরামির কি দেখলেন আপনারা! আর এটাও বলুন যে, বাবা এখানে কি করতে পারেন! বাবা আমার। কনো হিম্যান বা সুপারম্যান থোরাই যে এলিয়ানদের সাথে যুদ্ধ করে, ওদের কে হারিয়ে দেবেন? নাকি বাবা এলিয়ানদের ভাষা জানেন যে, এলিয়ানদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। … কেন যে বাবা এই কেসটা নিলেন, আমার মাথায় ঢুকল না।

বাড়ি গিয়ে মাকেও কথাটা বললাম। মা বললেন – তোর বাবা যখন পুরো কেস শুনে কেসটা নিয়েছেন, তখন গোলমাল তো কিছু আছেই। আজ পর্যন্ত উনি কেস নিয়েছেন আর সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারেন নি বা মীমাংসা করতে পারেননি, এমন হয়েছে! তাহলে এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না।

মায়ের থেকে সদুত্তর না পেয়ে, বিদিপ্তা দিদির কাছে গেলাম। সেখানে তো আমার পুরো বেইজ্জতি হয়ে গেল। দিদি কিছু বললেন না। সমস্ত কেসটা শুনে প্রথমে মুখটিপে, তারপর হো হো করে হেসে উঠে বললেন – বাবার সাথে তুমি যাবে তো! সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

সত্যি বলছি, আমার মুর্শিদাবাদ যাবার একদামই ইচ্ছা ছিল না। নিজের চোখে বাবাকে অপদস্ত হতে দেখতে কার ভালো লাগে! … কিন্তু সকলে আমাকে নিয়ে এইক্ষেত্রে এতো মজা করেছে, আমি আর কনো কথাই বলিনি। বরং, বাবা কি করেন এই কেসে, তা দেখার জন্য সঙ্গে রইলাম কেবল।

বাবা সন্ধ্যার দিকে একটু বেরোলেন, কেসের ব্যাপারেই নাকি কিছু এসেন্সিয়াল কাজ আছে, সেগুলি সারতে গেলেন। পরের দিন সকালে, ট্রেনে করে রামপুরহাট। সেখান থেকে ইন্সপেক্টর সুরেশ বাঘ এসে আমাদের রিসিভ করে নিয়েগেলেন পিলসিমা গ্রামে। গ্রামে থাকার ব্যবস্থা নেই। তাই দেবগ্রাম বিডিও কোয়ার্টারের পাশে একটা খালি কওয়ারটারে আমাদের থাকার ব্যবস্থা হলো। সুরেশ বাঘ জানেন, আমরা মুখ্যমন্ত্রীর ফরমাইসে এসেছি। তাই কথাবার্তা হয়ে গেল যে পরের দিন সকালে, বাবাকে আর আমাকে নিয়ে উনি পিলসিমা গ্রামে যাবেন।

রাত্রের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করে দিয়ে, মিস্টার বাঘ নিজের জিপে উঠে বসলেন, আর কারুর সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে গেলেন – হ্যাঁ এসে গেছেন … আমি সব …

জিপ চলে গেল। বাবার মুখ থমথমে। রাত্রের খাবার খেয়ে, সেদিনের মত শুয়ে পরলাম। পরের দিন বাবা বলে রেখেছেন, সকালে কিছু জলখাবার খেয়ে, দেবগ্রাম থানার সামনে উনি চলে যাবেন। সেখান থেকেই আমরা উঠবো মিস্টার বাঘের জিপে। আমি আর বাবা সকালে উঠে স্নান করে একটু বেড়িয়ে, মুড়ি ঘুঘ্নি পেলাম, সেটাই জলখাবার। পেট ভরলও বেশ। তাই কনো কথা না বাড়িয়ে চলে গেলাম থানায়।

নটায় আশার কথা মিস্টার বাঘের। এখন সাড়ে আটটাও বাজে নি। বাবা আমাকে নিয়ে থানায় ঢুকে সেখানের ওসির সাথে আলাপ করলেন। ওসির নাম অভিজিত বালা। ঠিক বাঙালি নন, তবে বাংলা উচ্চারণ স্পষ্ট আর সম্পূর্ণ বাঙালির মত করেই বাংলা বলেন। উনি আমার সাথে অনেক কথা বলছিলেন। বেশ মজাদার লোক। বললেন এখানের থানায় বেশি কেস আসেনা। এই ছোটখাটো ঝুটঝামেলা, জমি নিয়ে মারামারি, এ ওর বউ নিয়ে পালিয়া যাওয়া এই সব। কথা বলার তেমন কেউ নেইই এখানে। বাবার সাথেও কথা হচ্ছিল।

শেষে বাবা আমাকে উনার কাছে বসিয়ে রেখে, বাইরে স্মোক করতে চলে গেলেন। স্মোক করতে বাবা গেলে এই পাঁচ দশ মিনিটের মধ্যে ফিরে আসেন। কিন্তু এই ক্ষেত্রে তেমনটা হলো না। সেই জন্য আমি একটু বাইরের দিকে বেড়িয়ে বাবার সন্ধান করলাম। বাইরে বেরোতেই দেখলাম মিস্টার বাঘের জিপ থামলো। আসলে জিপটা মিস্টার বালারই। সেটাই মিস্টার বাঘ নিয়েছিলেন, আমাকে আর বাবাকে রিসিভ করার জন্য, আর আজ গ্রাম দেখাবার জন্য।

গাড়ি থেকে নামার সময়ে, আমাকে ঠিক খেয়াল করেন নি মিস্টার বাঘ। মোবাইল ফোনে ছিলেন। বলছিলেন – আমি কি করে জানবো! … কেন পাঠিয়েছে, কেন এসেছে, খবর দেবে না সিনেমা করবে, কিছুই জানিনা। যেমন যেমন জানবো, তেমন তেমন বলবো।

আমাকে দেখেই, ফোনে কথা বলার গতি কমে গেল। ফোনে বললেন – পরে বলছি আপনাকে, এখন রাখছি। কথাটাও খুব আসতে বললেন।

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে – কি ব্যাপার, একা? বাবা আসেন নি!

বাবাকে দেখলাম থানার পাস থেকে বেড়িয়ে এলেন। গা ঝাড়তে ঝাড়তে বললেন – এখানে বুঝি লিচু হয়না, তাই না!

মিস্টার বাঘ বললেন – আপনি কি ক্ষেত দেখতে চলে গেছিলেন না কি মশাই?

বাবা – না, সিগারেটে টান মারতে মারতে লাল লাল কিছু চোখে পরলো, ভাবলাম লিচু। তাই একটু ক্ষেতে নেমে গেছিলাম।

মিস্টার বাঘ – না না, এদিকটায় লিচু হয়না। একটু উপরের দিকে গেলে, ওখানে লিচুর জঙ্গল পাবেন। … তো উঠে পরুন। চলুন আপনাদের গ্রামটা একটু দেখিয়ে নিয়ে আসি।

বাবা – মিস্টার বালাকে বলে আসি। উনি তো আপনার আগমনবার্তাই পাননি।

দুই মিনিটের মধ্যে বাবা ঘুরে এলেন ভিতর থেকে। তারপর আমরা গাড়িতে উঠে রওনা দিলাম পিলসিমা গ্রামের উদ্দেশ্যে। রাস্তা বেশি নয়, খুব বেশি হলে ৫ থেকে ৬ কিমি হবে। কিন্তু মেঠো রাস্তা, তারুপর আবার ছাগল আর গরু বাছুর আর ষাঁড়ের ভিড় মাঝে মাঝে। তাই পৌছাতে প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল।

আমরা গেলাম পিলসিমা গ্রামের প্রধানের কাছে। উনাকে সঙ্গে নিয়েই, বাবা আমি আর মিস্টার বাঘ খানিক ঘুরলাম। উনি বললেন, লাস্ট এলিয়ান এটাক হয়েছে আগের পূর্ণিমাতে। তার আগের পূর্ণিমাতে দেখা মেলেনি, আগের আগের পূর্ণিমার পরের দিন দেখা পাওয়া গেছিল। আর জানলাম আমরা যে, যেদিন যেদিন এদের দেখা পাওয়া যায়, সেদিন সেদিন গ্রামের বিভিন্ন জায়গার ক্ষেতফসল তছনছ করে দেয় ওরাই।

মিস্টার বাঘ আমাকে একটা ধানের ক্ষেতের আল ধরে নিয়ে গিয়ে, এক জায়গায় কেমন করে ক্ষেত লণ্ডভণ্ড করা হয়, তার কিছু নমুনা দেখালেন। বাবাকে দেখলাম, একটু এগিয়ে গেলেন প্রাম প্রধান, আব্দুল জিয়াউদ্দিনের সাথে। দুপুরের খাওয়া আব্দুল সাহেবের বাড়িতেই করলাম। দেশী মুরগির ঝোল, আর গ্রামের লাল চালের ভাত। জমিয়ে খেলাম। তারপর জিপে করে ফিরে এলাম।

সন্ধ্যা তখনও ঠিক করে নামেনি। আসলে গরম ভালো পরে গেছে, তাই সন্ধ্যা হচ্ছে একটু দেরি করে। বাবা আমাকে বললেন, ড্রেস করে ব্যাগ গুছিয়ে রাখতে। সন্ধ্যায় আমরা নাকি ফিরে যাবো। আমার মাথায় কিছুই ঢুকলো না। যদি ফিরেই যাবো, তবে এলাম কেন? তবে কি বাবা বুঝে গেছেন, এ আমাদের কম্ম নয়!

বাবাকে যে কিছু প্রশ্ন করবো, কেন ফিরে যাবো, ইত্যাদি, সেই সুযোগও পেলাম না। আমাকে ফিরে যাবো, ব্যাগ গুছিয়ে রাখিস বলেই, বাবা বললেন – আমি একটু আসছি, তুই ব্যাগ গুছিয়ে রাখ।

বাবার ফিরতে অনেক দেরি হলো। যখন ফিরলেন, তখন বাবার কাঁধে একটা ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রাফটার, একটা বড়ো স্ট্যান্ড, যেমন জি-এস-আই ব্যবহার করে। আমি বাবার দিকে তাকিয়ে বললাম – এই সব কি হবে?

বাবা একটু কেজুয়ালি বললেন – কাজের জিনিস কাজে লাগবে, আর কি? ব্যাগ রেডি?

আমি কিছু বলবো, অমনি একটা বাইক আমাদের বাংলোর সামনে এসে দাঁড়ালো।

পৃষ্ঠা: 1 2 3