পঞ্চম পর্ব – সিয়াইডি দপ্তরে
ঘরে সকলেই এসেছেন। আমরা ঢোকার সামান্য পরে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয় এলো। সকলে সেই ঘরে গিয়ে বসলাম, যেই ঘরে প্রথমদিন এসে বসেছিলাম। খানিকক্ষণ পরে, অতনুকাকু এসে উপস্থিত হলেন। বাবা বললেন – বাবাই ডেকেছেন উনাকে। এখানে উনার সাহায্যও আবশ্যক।
কি যে হচ্ছে, কেউই ঠিক করে বুঝতে পারছি না। … মুখ্যমন্ত্রী বললেন – বিজয় আর কারুর জন্য কি অপেক্ষা করার আছে আমাদের!
বাবা – না না, শুরু করা যাক। …
এই বলে বাবা সবে শুরু করতে যাবেন, অমনি শঙ্কর দরজা নক করে এসে বললেন – বিজয় স্যার, চলে এসেছি।
বাবা – আরে উনাদের পাঠিয়ে দাও। … মুখ্যমন্ত্রী স্যারও এখানে রয়েছেন। চাড্ডা একবার উনাকে থ্যাঙ্কইউ তো বলে যাক। … আর উনার মেয়ে খুব বড় গাইনো। উনার মতামতটা আমাদের একটু প্রয়োজন। উনাকেও পাঠিয়ে দাও।
মিস্টার চাড্ডা, আর উনার সুকন্যা ঘরে ঢুকলে, বাবার দিকে তাকিয়ে উনি আনন্দের সাথে বললেন – কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব বিজয় স্যার। …
বাবা হেসে – আরে আমাকে নয়, চিফ মিনিস্টার স্যারকে থ্যাংকস জানান। উনি যদি তেড়েফুঁড়ে না উঠতেন, এই খবর আমি পেতেই পারতাম না। … আহা আপনারা দাঁড়িয়ে কেন, বসুন না।
দুটি চেয়ারে উনারা দুইজন বসলে, মুখ্যমন্ত্রী বললেন – বিজয়, এই কেস অত্যন্ত কনফিডেন্সিয়াল; বাইরের কারুর উপস্থিতি কি এখানে থাকা উচিত!
বাবা – বাইরের কেউ তো এখানে নেই স্যার! … হ্যাঁ মিস্টার চাড্ডা আছেন। উনি পুরো ব্যাপারটা থেকেই অনভিজ্ঞ ঠিকই। তবে এখন অভিজ্ঞ হয়ে যাবেন।
মুখ্যমন্ত্রী রথিনকাকা আর আমার মুখের দিকে তাকালে, আমরা দুইজনেই মুখের ভাবে বুঝিয়ে দিলাম, বাবার কথার সাথে আমরা দুইজনেও অনভিজ্ঞ।
বাবা – আহা, বুঝতে পারলেন না তো। … এক মিনিট স্যার। … আরে মিস্টার চাড্ডা, আপনি যেই গাড়িটার নম্বর দেখেছিলেন না কাল। সেই গাড়িটা আজকে পাওয়া গেছে। … আপনি বাইরে গিয়ে একবার নম্বরটা মিলিয়ে আসুন। বাইরেই রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী একটু ঝাঁঝিয়ে – বিজয়, মিস্টার চাড্ডা উনার মেয়েকে পেয়ে গেছেন। ব্যাস, উনার কেস শেষ। …
বাবা – হ্যাঁ স্যার। সরি স্যার। … আমি আসল কথায় আসি এবার। … অতনু, সব কিছু এনেছ সাথে!
অতনু আঙ্কেল – হ্যাঁ।
বাবা – রথিন একটু ওর ল্যাপটপতা প্রোজেক্টরের সাথে কানেক্ট করে দাও না!
রথিনকাকা সেই কাজ শেষ করে, বাবার দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে তাকালেন। মুখ্যমন্ত্রীরও দৃষ্টিভঙ্গি তেমনই। আমারও সত্যি বলতে বাবর উপর বিরক্ত লাগছিল। আসল কেস ছেড়ে, ওই চাড্ডার মেয়ে খুঁজতে বেরিয়েছেন উনি।
বাবা এবার সত্যি সত্যিই স্টার্ট করতে গেলে, ধরমরিয়ে ঘরে মিস্টার চাড্ডা ঢুকলেন। এবার উনাকে দেখে সকলেই বিরক্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু উনি কনোদিকে না তাকিয়ে বললেন – বিজয় স্যার, ওই গাড়িটাই তো …
বাবা রথিন কাকার দিকে তাকিয়ে ঈসারা করে, কাঁচের দরজাটা লক করিয়ে দিলেন। আর বললেন – হ্যাঁ, আপনি একদমই ঠিক মিস্টার চাড্ডা, ওই গাড়িটাই আপনাদের সাথে শিলিগুড়ি থেকে এসেছে। কারণ ওই গাড়িটা আপনার মেয়ের নয়, ওটা মিস্টার সম্রাট গিলের। …
এবার আমরা সকলে বাবার দিকে চমকে গিয়ে তাকালাম। বাবা হেসে বললেন – হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। … আর আরো বড় ঠিক হলো এই যে, এখন এই ঘরে, সেই সম্রাট গিল বসে রয়েছেন।
রথিনকাকা – বিজয় তুমি রসিকতা করছো!
বাবা – রসিকতাই তো করছি, তাই না মিস চাড্ডা!
মিস চাড্ডা – আমি এইসবের কি জানি!
বাবা – ঠিকই তো, আপনি এই সবের কিই বা জানেন। … আপনি তো এমবিবিএস করেছেন পাঞ্জাব মেডিকাল কলেজ থেকে, তাই না!
মিস চাড্ডা – হ্যাঁ
বাবা – আর গাইনকলজিতে এমডি করেছেন দিল্লি এইমস থেকে। … তাই তো?
মিস চাড্ডা – হ্যাঁ।
বাবা – কোন সালে পাস করেছেন আপনি যেন?
মিস চাড্ডা – ২০১৪
বাবা – হুম। কিন্তু ২০১৪এর রেকর্ডে আপনার নাম নেই কেন গাইনো ডিপার্টমেন্টের লিস্টে? … অতনু লিস্টটা একটু দেখাও।
বাবা লিস্ট দেখিয়ে – দেখুন, কোথাও আপনার নাম নেই। কেন? … কিন্তু মজার কথা জানেন, আপনার নাম নেই তা নয় কিন্তু। ২০১৪তেই আপনার নাম রয়েছে, প্রপ্সথেটিক ডিপার্টমেন্টে! … কি করে হলো বলুন তো এমন?
মিস চাড্ডা এবার গলা চড়িয়ে বললেন – আপনি কি বলতে চাইছেন! আমি প্রস্থেটিক ব্যবহার করে, এই সমস্ত খুন গুলো করেছি!
বাবা – আরি বাপরে! … আপনি কি করে জানলেন, এই খুনগুলো প্রস্টেটিক্স ব্যবহার করে করা হয়েছে! … অবশ্য আপনি জানবেন না তো কে জানবেন! … খুনগুলো তো আপনিই করেছেন!
মিস চাড্ডা এবার ধরফরিয়ে পালানর চেষ্টা করলে, বাবা চেঁচিয়ে উঠলেন – দরজা বন্ধ, আর সকলে আপনার দিকেই বন্দুক তাক করে রয়েছেন। পালাবার চেষ্টা করলে, গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাবেন। … আর আমি চাইনা, আপনার এই ভাবে মৃত্যু হোক।
মিস্টার চাড্ডা এবার গলা উঁচিয়ে কিছু বলতে গেলেন – আমার মেয়ে!
এতক্ষণ সকলে বাবার উপর চেঁচাচ্ছিলেন, এবার বাবা গলা ওঠালেন। … উচ্চস্বরে বললেন – যে যেখানে আছেন, একপাও নড়বেন না। এখন শুধু আমি বলবো। আর সকলে শুনবে।
সকলে কেমন যেমন থতমত হয়ে গেলেন, মুখ্যমন্ত্রীও। সকলের মুখ খোলা কি খোলা রয়ে গেল। আমারও। বুঝতেই পারছিলামনা, বাবা এই অসাধ্য সাধনতা করলেন কি করে!
বাবা এবার সকলের উদ্দেশ্যে বলতে শুরু করলেন – আসলে কি জানেন তো মিস চাড্ডা, আপনি নিজেকে বড্ড চালাক মনে করেন। এটাই সমস্ত ক্রিমিনালদের দোষ জানেন তো। এরা নিজেদের এতো চালাক আর অন্যকে এতো বোকা মনে করে না! সেই জন্যই এরা ধরা পরে যায়। … আচ্ছা মিস চাড্ডা বা মিস্টার গিল, আপনিই দুটো, … তাই যেকোনো নামে আপনাকে ডাকলেই হলো। আমাকে একটা কথা বলুন তো, আপনাকে পাকামো মেরে, আপনার বাবাকে মস্কোর ওই হাসপাতালের নাম বলার কি দরকার ছিলো, যেখান থেকে ডক্টর জোন্স এসেছেন!
মিস চাড্ডা মাথা নামিয়ে নিলেন – ম্যাডাম, ডাক্তার জোন্স তো নেই। কাল্পনিক একজন। তো হাসপাতালটাও কাল্পনিক একটা নাম দিতে পারতেন। তাহলে তো আমরা সেখানে খবর নিয়ে জানতেই পারতাম না যে আপনি ৭ বছর আগে সেখানে গিয়ে, নিজের ব্রেস্ট অপারেট করে বাদ দিয়েছেন, আর ইউটেরাসও। … কি দরকার ছিলো, মিথ্যের মধ্যে একটু সত্যির ছোঁয়া দেবার! … বাবাকে পুরো মিথ্যে বলতে বিবেকে লাগছিলো নাকি!
মিস চাড্ডার মুখ লাল। আর মুখই তুললেন না উনি। সকলের মুখ হা। কি হচ্ছে, কেউ কিচ্ছু বুঝতে পারছেন না। … সেই মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে বাবা বললেন – আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। এমন করে আমার দিকে তাকাতে হবেনা; আমি প্রথম থেকে সবটা বলছি। … তো শুরু করি শিলিগুড়ি থেকেই। ইন শর্ট আগে বলে দিই, খুন এখানে মিসেস মাহাতো, আপনার ছেলের থেকে শুরু হয়নি। … খুনের লীলা শুরু হয়েছিল, মিস্টার আর মিসেস কাপুর থেকে, অর্থাৎ মিস্টার চাড্ডা আপনার বড় মেয়ে আর বড় জামাইয়ের থেকে। … সুনেইনা, আমি যদি কিছু ভুল বলি, প্লিজ রেক্টিফাই মি। … প্লিজ। যেই দোষ আপনি করেন নি, সেই দোষ আপনি নিজের মাথায় প্লিজ নেবেন না।
বাবা আবার সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন – এই সমস্ত কিছুর শুরু হয় তখন থেকে যখন মিস্টার চাড্ডার বড়মেয়ের আর বড়জামাইয়ের একটা সেরগেটেড মাদারের প্রয়োজন পরে। … নিজের গর্ভ দিতে রাজি হয়ে, মিস সুনেইনা চাড্ডা চলে এলেন শিলিগুড়িতে, নিজের দিদি আর জামাইবাবুর কাছে। … গর্ভ ধারণ করেন, একটি ফুটফুটে ছেলের জন্ম দেন। একপ্রকারে মা তিনিই। তাই মায়ের মতই নিজের সন্তানের দেখভাল করতেন। … কিন্তু মায়ের অধিকার উনাকে দেওয়া হতো না। … তবে তাতে উনার কনো আপত্তি ছিল না।
বাবা একটু ঘরের মধ্যে পাক খেতে খেতে বলতে থাকলেন – কিন্তু আপত্তি তখন হতে শুরু করলো যখন থেকে উনার সন্তান, বা উনার দিদির সন্তান স্কুল যেতে শুরু করলো। সিবিয়াই অফিসার মিস্টার চাড্ডার পরের জেনারেশনে, একমাত্র সুনেইনাই ইনটেলিজেন্ট। তাঁর গর্ভে থাকার কারণেই হোক, বা অন্য কারণেই হোক, উনার ছেলে হন ইনটেলিজেন্ট। আর তাই স্কুলে ফার্স্ট আসতে শুরু করার থেকেই, প্রেশার ক্রিয়েট করতে শুরু করে দেয় ওর বাবামা, মানে অফিসিয়ালি যারা ওর বাবামা। … আর তখন থেকে সুনেইনার মাথা খারাপ হতে শুরু করে।
একটা হাফ ছেড়ে বাবা চেয়ারে বসে বলতে থাকলেন – নিজের গর্ভে ধারণ করা ছেলে, তার উপর দিনের পর দিন প্রেশার বাড়তে দেখে, সুনেইনার মধ্যে কিলার ইন্সটিংটের জন্ম হতে শুরু করে। একটা সময়ের পর, সেই প্রেশার এতটাই বেড়ে গেল যে, সুনেইনার মধ্যে দিদি জামাইবাবুকে খুন করার বিচারও এসে যায়। … যাতে খুনের দোষ উনার ঘারে না আসে, তাই উনি গল্প ফাঁদতে শুরু করলেন। …
না না, নিজেকে বাঁচানোর জন্য নয়। বাবামাকে খুন করে ফেলার পর, উনিও যদি জেলে চলে যান, তবে তো উনার ছেলে অনাথ হয়ে যাবে। সেই কারণেই এই গল্প ফাঁদলেন। মস্কোতে উনি দুইবছর প্র্যাকটিস করেছিলেন, যেই মেডিকাল কলেজে, সেই কলেজেরই নাম নিলেন, আর বলতে থাকলেন যে সেখান থেকে একটা গাইনো ডাক্তার এসেছে, ডক্টর জোন্স, আর তিনি এখানে থাকছেন।
বড় জামাই আর বড় মেয়ে দুইজনেই কর্পোরেটএ কাজ করেন। প্রচণ্ড প্রেশার, তাই বাবার সাথে তেমন কথাই হয়না। তাই বাবা, অর্থাৎ মিস্টার চাড্ডা নিজের ছোট মেয়ের কথাকেই বিশ্বাস করতে থাকেন। … কিন্তু ছোট মেয়ে, মানে সুনেইনা খুন করবে ঠিক করলেও, কিছুতেই খুন করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। … ভয় হয় উনার, হাত কাঁপে। … আগে কনোদিন করেন নি না, আর খুন করা কি চাড্ডি খানি ব্যাপার! কিন্তু সেই সুযোগও হয়ে গেল।
বাবা একটু মুচকি হেসে – সুযোগ বলা ভুল হবে, বলা উচিত, উনার ভয়টা একদিন হঠাৎই একটা ঘটনার কারণে উড়ে গেল। … উনার ছেলে, ক্লাসে সেকেন্ড হলো। … বাড়িতে বাবামায়ের ভয়ঙ্কর বকুনি, হয়তো মারও পরে। হয়তো কেন, সাতবছর আগে, উনার ছেলে, সম্রাট কাপুরের মৃতদেহে একদিন পুরনো মারের দাগ পাওয়া গেছিল, একরডিং টু পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট। … কি করে মারা গেল সে! … বাড়িতে মার খেয়ে, মনের দুঃখে রাস্তায় অসংযত ভাবে চলছিল। অজান্তেই গাড়ির সামনে এসে যায়, আর আর্মির ট্রাকের ধাক্কায় স্পটডেড।
বাবা একটু গম্ভীর হয়ে গিয়ে – সুনেইনা আর নিজের ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। … তাঁর মাতৃত্বে আঘাত লেগেছিল। … তাঁর মমতায় আঘাত লেগেছিল। এবার তার কিলার ইন্সটিংট সপ্তমে উঠে যায়, আর সে নিজের দিদি আর জামাইবাবুকে এসিড খাইয়ে মেরে ফেলে। … কিন্তু আমি এই সব জানলাম কি করে, তাই না! … সুনেইনা, মানে মিস্টার গিল বাচ্চাদের খুন করে আঙুল কেটে দিতো। … তাই আমি সার্চ করি যে এমন কি কি কেস আছে, যেখানে মৃতের আঙুল কেটে দেওয়া হয়েছে। … সেই কেস পড়তে পড়তেই, আমি মিস্টার কাপুর আর মিসেস কাপুরের মৃত্যুর খবর পাই। সাত বছর আগে এসিড খাইয়ে মেরে ফেলা হয়। …
প্রথমে মনে করা হিয়েছিল, সন্তানের মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে স্বামীস্ত্রী এসিড খেয়ে মরেছেন। কিন্তু দুই দেহের পাশাপাশি মৃতদেহকে রাখা হলে, নজর যায় পুলিশের যে, মহিলা ও পুরুষটির, দুইজনেরই একটি করে হাতের পাঁচটি আঙুলই কাটা। … অর্থাৎ সেটা মার্ডার। … ইনভেস্টিগেট স্বয়ং মিস্টার চাড্ডা করেন, কারণ তখনও তিনি রিটায়ার করেননি। … উনি জানতেন যে সেখানে একটা ডাক্তার থাকতেন। তাই তিনি কেসের রিপোর্ট সাবমিট করেন যে সেই ডাক্তার এই খুন করে, উনার ছোট মেয়েকে নিয়ে পালিয়ে যায়। দীর্ঘদিন উনি মস্কোতে খুঁজেও পাননি, তাই শেষে বিশ্বাস করেন যে এখানেই পশ্চিমবঙ্গে সেই ডাক্তার উনার ছোট মেয়েকে নিয়ে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাই এখানে এসে মুখ্যমন্ত্রীকে চাপ দিতে থাকেন যে তাঁর মেয়েকে খুঁজে দেবার জন্য।
কিন্তু সেই ডাক্তার তো নেই। খুনটা তো করেছেন, ইনিই। কিন্তু সেটা তো তিনি জানেন না। মেয়ের উপর বিশ্বাসের জন্য, তিনি এটাও ভাবতে পারেন নি যে তাঁর মেয়ে খুন করেছে, বা তাঁকে মিথ্যা বলেছে। নাহলে একজন সিবিয়াই অফিসার একটু খবর লাগালেই ডাক্তার জোন্স বলে কেউ নেই, সেটা জানতে পারতেন না! … কিন্তু সন্তানমোহ! … হায়।
আবার একটা নিশ্বাস নিয়ে – যাই হোক। এই খুন করার সময়েই সুনেইনার মধ্যে একটা অন্য প্রতিক্রিয়া হয়। উনার মনে হয়, এমনটা তো স্রেফ উনার সাথেই হয়নি। প্রচুর এমন বাচ্চা আছে, যারা পড়াশুনায় বেশ ভালো, আর তাদের বাড়ি থেকে বিশাল প্রেশার আসে, আর তাদেরকে রেসের ঘোড়া করে দেওয়া হয়। তাই উনি ঠিক করেন যে, এবার তিনি সেই বাচ্চাগুলোকেই মেরে দেবেন, যাদের উপর এমন প্রেশার ক্রিয়েট করা হয়। বাচ্চারাও সেই প্রেশার থেকে মুক্ত হয়ে যাবে, আর মাবাবা বুঝতে পারবে যে, যেই সন্তানের উপর প্রেশার ক্রিয়েট করছিলেন তাঁরা, সেই সন্তানই যদি না থাকে, তবে কেমন লাগে।
আর সেই কারণে তিনি কলকাতায় চলে আসেন, কারণ কলকাতায় তেমন বাচ্চার আর তেমন মাবাবার সংখ্যা অনেক বেশি। … নিজের কাজ করার জন্য, প্রথম নিজের একটা ফেক আইডেন্টিটি তৈরি করেন – কি যেন! সম্রাট গিল। … তারপর সমস্ত ফেক আইডেন্টিটি করিয়ে, পয়সা তো ছিলই, আর প্রস্থেটিক্সও ছিল। উনি একটা অনন্য মেকআপ নিলেন। … কি ভাবে?
মাঝে উনি মস্কোতে, নিজের পরিচিত মেডিকাল কলেজ গিয়ে, নিজের ব্রেস্টকে শরীর থেকে অপরেট করে বাদ দিয়ে আসেন, আর নিজের ইউটেরাসও, যাতে উনার প্রতি মাসের দুর্বলতা ফেস করতে না হয়, আর পুরুষ বা স্ত্রী, যা কিছু উনি সাজতে পারেন। … তারপর, বেশ কিছু স্কুলবাস নামালেন। সিসিটিভি তাতে থাকে, আর সর্বক্ষণ তাতেই মুখ গুজে থাকতেন উনি। বাচ্চাদের কথা শুনতেন। আর সেই কথা থেকেই, উনি একটা একটা করে ভিক্টিম সিলেক্ট করতে থাকলেন।
কন্ডিশান উনার ছেলের মতই হতে হবে, মানে ক্লাস সিক্সে পড়বে, ফার্স্ট হবে, সেকেন্ড হয়েছে বলে বাড়িতে মারধর করা হবে। তবেই তিনি তাঁকে ভিক্টিম করবেন। তাই তাঁর সিরিয়াল কিলিংএর কনো সময়ের ঠিক থাকে না, কারণ কখন এমন ভিক্টিম পাওয়া যাবে, তার তো কনো ঠিকই নেই। … সেই কারণে উনার করা খুনগুলোকে সিরিয়াল মার্ডার বলে পুলিশ আইডেন্টিফাই করতেই পারলো না। … আর উনি প্রস্থেটিক্স-এর সাহায্য নিয়ে, একের পর এক বাচ্চাকে, স্কুলের বাথরুমে ঘুম পারিয়ে, বাড়িতে নিয়ে এসে, ঘুমন্ত অবস্থায় গলা কেটে, আঙুল কেটে বাদ দিয়ে, ভাগারে গিয়ে পাচার করে আসতেন।
আমি যে এই কেস নিয়েছি, সেই খবর উনি পেয়ে যান। কিন্তু উনার আন্দাজও আমি পাইনি। তাই উনি নিজের মত করেই চতুর্থ খুন, অর্থাৎ মিস্টার সাহার ছেলেকে হত্যা করলেন। … কিন্তু তারপরেই আমি আর সিয়াইডি টিম যখন উনার বাসের ড্রাইভারদের একসাথে কাস্টডিতে নিই, তখনই সে বুঝে যায় যে, এবার আমরা তাঁর কাছে পৌঁছে যাবো। … তাই উনি উনার লাস্ট ক্রাইম করার সিদ্ধান্ত নেন। … আর লাস্ট ক্রাইম হলো উনার নিজের ভাইয়ের ছেলে, অর্থাৎ মিস্টার চাড্ডার নাতি। … কেন?
বাবা একটু মুচকি হেসে – আসলে, এই ছোট ভাই আর ছোট ভাইয়ের বউই তো, ওঁর বড়দি আর জামাইবাবুকে শিখিয়েছিল যে ছেলের উপর প্রেশার ক্রিয়েট করতে। … তাই এই ছেলে কৃতি না হলেও, এর বাবামাকে যে সন্তান হারানোর কষ্ট দেবেনই উনি, সেটা তো উনি ঠিকই করে রেখেছিলেন। … তাই, মিস্টার গিলের পোশাক ছাড়ার আগে, উনি এই শেষ ক্রাইমটা করে নিতে চাইছিলেন। … কিন্তু দুটো ভুল।
চেয়ার ছেড়ে উঠে পরে – প্রথম, ভুলে যাওয়া যে ওর বাবা একজন এক্স সিবিয়াই অফিসার ছিলেন। তাই উনি যে ড্রাইভারের থেকে এড্রেস নিয়ে উনার কাছে পৌঁছে যাবেন, সেটা তিনি ওভারলুক করে গেলেন। … আর দ্বিতীয় এই যে, উনি নিজের ক্রাইমের সিরিয়াল ভেঙে সেই বাচ্চাকে মারার চেষ্টা করলেন, যে ক্লাস সিক্সে নয় ক্লাস ফাইভে পড়ে, আর যে কৃতি ছাত্র বা ছাত্রী নয়। …
রথিনকাকা – তুমি বুঝলে কি করে, গিলই সুনেইনা!
বাবা – হুম, বিগ কয়েশ্চেন। … ওই যে বললাম, সিরিয়াল ব্রেক। … সিরিয়াল ম্যাচ করছেনা, অথচ মাস্টার চাড্ডাকে খুনের চেষ্টা করে, ঘুম পারিয়ে অপহরণ। … এটা প্রথম সন্দেহ। সন্দেহ হয় যে, খুনি তারমানে এই মাস্টার চাড্ডার সাথে সংযুক্ত, কনো না কনো ভাবে তো পার্সোনাল কানেকশান আছে এই বাচ্চার সাথে খুনির। … তারপরে! … তারপর আমার মাথায় সমস্ত কিছু ক্লিক করে গেল। … শিলিগুড়ি সেন্ট জেভিয়ারসের ব্যাজ নিজের মিস্টার গিলের পাগড়ীতে লাগিয়ে ঘুরতেন। … মনে পরে রথিন, সেইদিন মিস্টার চাড্ডাকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, আপনার বড় মেয়ের ছেলে কোন স্কুলে পড়তেন? … লাস্ট, ওই যে কেসটা আগে দেখে রেখেছিলাম, স্বামীস্ত্রীর মিলিয়ে দশটা আঙুল কেটে নেওয়া হয়েছিল। … ছেলেটির নাম সম্রাট ছিল। … সুনেইনা, এখানে এসেও নিজের নাম রাখে সম্রাট গিল।
তারপর, আর কি। … এতক্ষণ ধরে যেই গল্প বললাম, সেই গল্পটা পুরোপুরি মাথায় খেলে গেল। … কিন্তু যদি এরেস্ট করতে শিলিগুড়ি যাওয়া হয়, তবে পাখি উড়ে যাবে, প্রস্থেটিক্স-এর সাহায্য নিয়ে এমন রূপ ধরবে, আর চেনাই যাবেনা। … তাই মিস্টার চাড্ডাকে বললাম, আপনার মেয়েকে পাওয়া গেছে। শিলিগুড়ি ফার্ম হাউজে সে আছে। … শঙ্করকে উনার সাথে পাঠাই, আর উনাকে সহ, উনার গাড়িটাও নিয়ে আসি, যেই গাড়ির নম্বর মিস্টার চাড্ডা দেখে রেখেছিলেন, আর সেটাই সুনেইনা বা মিস্টার গিলের গাড়ি বলে এখন উনি আইডেন্টিফাই করে এলেন।
খানিকক্ষণের জন্য নীরবতা ঘরে। তারপর মিস্টার বিজরিয়া বলে উঠলেন – ব্র্যাভো বিজয়। … আই মাস্ট সে, ইউ আর সিমপ্লি ব্রিলিয়ান্ট। …
সকলে তারপর বাবার তারিফ করতে শুরু করলেন, শুধু মিস্টার চাড্ডা, আর সুনেইনা ছাড়া। … রথিনকাকু বাবার কাছে গিয়ে বললেন – আই এম সরি বিজয়। আমি তোমাকে ভুল বুঝছিলাম।
বাবা – ইটস ওকে। … মিস্টার চাড্ডা, আই এম সরি।
মিস্টার চাড্ডা – ইউ মাস্ট নট বি। … ইউ আর গুড, রিয়েলি ভেরি গুড। … আমি এরকম মাস্টারমাইন্ড কখনো স্বচক্ষে দেখিনি, আমার এন্টায়ার সিবিয়াই কেরিয়ারে।
বাবা – আই এম সরি মিস সুনেইনা চাড্ডা। … আই এম রিয়েলি সরি।
বাবার এই কথাতে সকলে বাবার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকলেন। আমিও ছিলাম তালিকায়। এই ক্রিমিনালটাকে বাবা কেন সরি বলছেন!
বাবা আবার বললেন – আমি বুঝতে পারছি, আপনার মনের মধ্যে দিয়ে কি গেছে। সন্তানকে তো তখনই হারিয়েছেন, যখন জন্ম দিয়েছেন। নিজের সন্তান আপনাকে ম’সি বলে ডাকে। … তারপর তার উপর অত্যাচার দেখেছেন। মৃত্যু, বা যাকে হত্যাই বলা চলে, সেটাও দেখেছেন। … আপনার মন সম্পূর্ণ ভাবে ভেঙে গেছিল, বুঝতেই পারছি। … আপনি সঠিকই অনুভব করেছেন যে, এই কৃতি সন্তানদের উপর, ভয়ঙ্কর ধরনের প্রেশার ক্রিয়েট করে বাবামা। আর শুধু কৃতি ছাত্র কেন, সকল ছাত্রদের উপরই। একপ্রকার নিজদের পোষা জিব করে রেখে দেন। উঠতে বললে উঠবে, শুতে বললে শোবে, পড়তে বললে পড়বে, সাতার কাটতে বললে সাতার কাটবে। … কিন্তু ম্যাডাম, আপনার বক্তব্য যতই ভালো হোক, আপনার প্রসেস একদমই খারাপ, বা বলা উচিত জঘন্য এবং ঘৃণ্য।
সুনেইনা বাবার দিকে মুখ তুলে তাকাতে, বাবা বললেন – আপনি পালাতে যাচ্ছিলেন। পালালে আপনাকে সকলে গুলি করে ঝাঁঝরা করে দিতেন। … এমনকি আমি যদি কালকে রথিনকে বলে দিতাম যে মিস্টার গিল আপনিই, আর আপনি শিলিগুড়িতে, তাহলে শঙ্কর নয় রথিন নিজে যেত, আর আপনার ডেডবডি নিয়ে আসতো। … এতটাই আক্রোশ আপনার উপর সকলের তৈরি হয়ে গেছিল। … তাই কাল রথিনকেও বলিনি, আর আজকে এই ঘরে ঢোকার আগে, সম্পূর্ণ কেস আমি কারুকেই বলিনি। … কারণ, আমি চাইছিলাম, আপনি জীবিত থাকুন।
হ্যাঁ ম্যাডাম। … আপনার লম্বা জেল হবে; হয়তো ১৬-১৭ বছরের জেল হবে। কিন্তু আপনি এখন নিজের থারটিস-এ। ১৬ বছর পর ফিফটিসে যাবেন। তখনও আপনার কাছে আপনার ভুল ঠিক করার সুযোগ থাকবে।
সুনেইনা এতক্ষণের প্রথম কথা বললেন – আমি কিই বা আর করতে পারতাম!
বাবা – খুন করে, কিই বা করতে পারলেন? সেই বাবা মায়ের মনের থেকে এই নিজের সন্তানদের পোষা কুকুর মনে করা বন্ধ করতে পারলেন! … না ম্যাডাম, হিংসা দিয়ে কখনোই কনো সমস্যার সলিউসান হয়না। এক্ষেত্রেও হয়নি। … আপনার কাছে প্রচুর পয়সা আছে। … আপনি চাইলেই ৫-৬টা অনাথকে নিজের কাছে রেখে, সেই মাতৃত্ব দিতে পারতেন। আপনি ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। নিজে তাঁদেরকে পড়িয়ে, বড় করে, সমাজের সামনে নিদর্শন রাখতে পারতেন, কি ভাবে সন্তানের সাথে ব্যবহার করতে হয়। … কি পারতেন না!
সুনেইনা – সরি স্যার। … এই বলে কেঁদে ফেললো সে।
বাবা – জেল থেকে বেড়িয়ে, আমি তোমাকে সেই রূপে দেখতে চাই সুনেইনা। তাই তোমাকে কারুর গুলিতে মরতে দিতে চাইনি। … বাট আই এম সরি, তোমার বিচার সঠিক হলেও, তোমার পদ্ধতি এতটাই খারাপ যে আমাকে তোমায় ধরিয়ে দিতে হলো।
সুনেইনা – স্যার, যা করেছি, তার ফল তো আমাকে ভোগ করতেই হবে। কিন্তু আমার মনে মাতৃত্ব ছিল। তাই বাচ্চাদের মারার সময়ে কষ্ট দিতে চাইনি। ঈশ্বর সেটাও দেখেছেন। তাই তো আপনাকে আমার সামনে এনে, আমার ভুল আমাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল। স্যার, আই প্রমিস, যদি আমার ফাঁসি না হয়, তবে আমি আপনাকে নিরাশ করবোনা। আপনি যেমন বলেছেন, তেমনই করবো।
রথিনকাকারা সুনেইনাকে এরেস্ট করলো। আর সেখান থেকে নিয়ে গেল। মুখ্যমন্ত্রী বাবার কাছে, বাবাকে জরিয়ে ধরে বললেন – আই এম রিয়েলি প্রাউড অফ ইউ।
মিসেস মাহাতো, মিস্টার মহাপাত্র সকলেই তেমন বলে চলে গেলেন। মিস্টার বিজরিয়া একটা চেক কেটে বাবার হাতে ধরিয়ে দিলেন, আর বললেন – কথা, কথা। … এন্ড আই মাস্ট সে, ইউ আর সিমপ্লি এক্সিলেন্ট। …
বাবা চেকের দিকে তাকিয়ে বললেন – এক কোটি টাকা!!
মিস্টার বিজরিয়া – তেমনই তো কথা দিয়েছিলাম। … ইউ ডিজার্ভ ইট অলসো।
রথিনকাকা বাবার হাত ধরে বললেন – আই এম সরি বিজয়। … আই এম রিয়েলি সরি।
বাবা – তোমার যায়গায় আমি থাকলেও, আমিও এমনই করতাম। কিন্তু যদি বলে দিতাম, এতোটাই আক্রোশ জন্মে গেছিল তোমাদের সকলের, যে তুমি সুনেইনাকে এঙ্কাউন্টার করে দিতে। … তাই বলিনি। … আই এম সরি ফর ড্যাট।
মুখ্যমন্ত্রী – কিন্তু একজন ক্রিমিনালের প্রতি এমন সহানুভূতি কি ঠিক বিজয়?
বাবা – স্যার, পয়সার জন্য যারা খুন করে, খ্যাতি, নাম যশ, পাওয়ার, এই সবের জন্য যারা খুন করে, তাদের জন্য নো মার্সি। … কিন্তু সুনেইনা অপরাধী তো অবশ্যই; এতগুলো খুন করেছে। কিন্তু সমস্তটাই করেছে মাতৃত্বের জন্য। … আর সমাজের একটা নোংরা দিককে দেখে, চোখ ফেরাতে পারেনি বলে। … স্যার, এরা মন থেকে ক্রিমিনাল নন। এদেরকে পথ দেখালে, এরা সমাজকে অন্য চেহারা দিয়ে দিতে পারে। ভাবুন স্যার, যে মাতৃত্বের জন্য এতো বড় ক্রাইম করে ফেলল, সে চাইলে সমাজে নতুন হিল্লোল তুলতে পারেনা। … ব্যাস এদেরকে একটু সাপোর্ট করার দরকার। কিছু দিয়ে নয়, মেন্টাল সাপোর্ট। বাকি এরা একাই একশো।
মুখ্যমন্ত্রী – এটাই তোমার বিশেষত্ব বিজয়। অসাধারণ বুদ্ধির সাথে সাথে, তোমার ভিতরের মানুষটা সদাই জাগ্রত থাকে। … এমনই থেকো সব সময়ে।
সকলে চলে গেলেন। এবারে আমাদের বাড়ি ফেলার পালা। সাথে রয়েছে এক কোটি টাকার চেক। … সুনেইনার ১৮ বছরের জেল হয়েছিল। ছাড়া পেয়ে সত্যিই সে অনাথাশ্রম খুলেছিল। এড্রেস খুঁজে খুঁজে আমাদের বাড়িতেও এসেছিল সে। কিন্তু বাবা তখন আর জীবিত ছিলেন না। … তাই আমাকেই নিমন্ত্রণ করে গেছিল। … বাবা ঠিকই ছিলেন; সুনেইনা আজ একজন সমাজে নামকরা সমাজসেবিকা। … অনাথআশ্রমের সাথে সাথে বাবামায়েদেরকেও উনি শেখান, কি ভাবে সন্তানকে স্নেহ করে, তাকে সঙ্গ দিতে হয়। … সেটা দেখে বাবার কথা খুব মনে পরছিল সেদিন।
