তৃতীয় পর্ব – চার নম্বর
বাড়ি ফিরে গিয়ে বাবাকে দেখলাম, চুপচাপ খালি শুয়ে থাকেন। দুদিনের পর রথিনকাকা এসে বাবাকে সমস্ত কেসের ডিটেলস্ দিলেন। তারপর বাবা উঠলেন।
রথিনকাকা প্রশ্ন করলেন – এই দুইদিন কি করলে?
বাবা – সম্ভাবনাগুলোর তালিকা তৈরি করছিলাম।
রথিনকাকা – কিসের সম্ভাবনা?
বাবা – মোটিভের।
রথিনকাকা – কোন মোটিভ, প্রত্যক্ষ না পরোক্ষ?
বাবা – প্রত্যক্ষ। যতক্ষণ না সেটার হদিশ পাওয়া সম্ভব হচ্ছে, ততক্ষণ পরোক্ষের কনো ছাপও অনুভব করতে পারবে না।
রথিনকাকু ভ্রুকুঁচকে – মানে?
বাবা – মানে এই যে, পরোক্ষ কারণটা খুনির ব্যক্তিগত জীবনের সাথে যুক্ত হয়। আর সেই পরোক্ষ নিজজীবনের ঘটনার থেকে ফ্রাস্ট্রেটেড হয়ে, খুনি যেই কষ্ট নিজে পেয়েছেন বলে মনে করেন, সেই কষ্ট সবাইকে দেবার চেষ্টা করে, এটাই সিরিয়াল কিলারের সাইকোলজি। … তাই যতক্ষণ না, প্রত্যক্ষ, অর্থাৎ ভিক্টিমকে কি ধরনের বা কি মোটিভের কষ্ট দিচ্ছে আততায়ী, সেটা না ধরতে পারছো, ততক্ষণ তার নিজের পার্সোনাল লাইফের সেই ঘটনা, যেখানে রয়েছে পরোক্ষ মোটিভ, সেটার নাগালও পাবেনা।
রথিনকাকু – আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলো তো! এই এতো ডিপ আন্ডারস্ট্যান্ডিং তুমি পেলে কোথা থেকে? … না ডিটেকটিভদের রচয়িতারা, অর্থাৎ সত্যজিৎ রায়, সরবিন্দুবাবু, আরথার কোনান ডোয়েল, ইনারা প্রচুর বই পড়তেন, আর তাই নিজেদের ডিটেকটিভ চরিত্রকেও দেখিয়েছেন প্রচুর বই পড়তে। কিন্তু ভাই, আমি তো তোমাকে চিনি। তুমি তো বই বেশি পড়ো না, আর বেশি পড়তে পছন্দও করো না!
বাবা – রথিন, একটা জিনিস জানো কি, পুরাণে বর্ণিত যেই ব্রহ্মাণ্ডের রচনা করার জন্য একই আত্মা, তিনগুনে বিভক্ত হয়ে ত্রিদেব হয়েছেন, সেই ব্রহ্মাণ্ডের অস্তিত্বটা কোথায়?
রথিনকাকু – যা বাবা! আমি কি কথা বলছি, আর তুমি কি উত্তর দিচ্ছ! … বললেই হয়, সিক্রেটটা সিক্রেটই রাখবে। আমায় বলবে না!
বাবা – আহা বড্ড অকারণ মাথা খাটাও তোমরা। … যেটা প্রশ্ন করলাম, সেটার উত্তর দাও না।
রথিনকাকা – অতো জানিনা ভাই।
বাবা – হুম, সেই ব্রহ্মাণ্ডটা হলো (নিজের শরীরের দিকে উপর থেকে তলা পর্যন্ত আঙুল দেখিয়ে) এটা। … রথিন, এর মধ্যে স্থিত চেতনা হলেন তিনি যাকে পুরাণ কি বলেছে? বিষ্ণুমায়ে, অর্থাৎ যার কারণে বিষ্ণু মায়া করতে পারেন। … এর মধ্যে স্থিত আত্মাই হলেন ত্রিদেবের স্বরূপ, আর এর মধ্যের ত্রিগুণ হলেন ত্রিদেব স্বয়ং। এর মধ্যে থাকা মন হলেন আকাশতত্ত্ব অর্থাৎ দেবরাজ ইন্দ্র; এর মধ্যের বুদ্ধি হলেন জলতত্ত্ব অর্থাৎ বরুণ; এরই মধ্যের প্রাণবায়ু সহ পঞ্চবায়ু হলেন পবন, এরই মধ্যে অনল বা উর্জ্জা হলেন অগ্নি; আর এই মাটির শরীর হলো ধরিত্রী। … আর এতে যা যা ২৪ গুন রয়েছে, যা দিয়ে সমস্ত দেহ ও পঞ্চভুত চলতে থাকে, তাই হলো চতুর্বিংশতি তত্ত্ব। … আর দেবতারা যে হোম থেকে আহার পায়? … হোম কি? বিশ্বাস, আস্থা, বাসনা, কামনার অঙ্গিকার। … ভেবে দেখো, মন, বুদ্ধি, প্রাণ, উর্জ্জা, সমস্ত কিছু তাদের প্রতিই আশ্রিত। … আর অসুর কারা? … বিকার রথিন, বিকার। … বিকার কাকে আক্রমণ করে? প্রথম মন, বুদ্ধি অর্থাৎ দেবতাদের, তারপর ত্রিদেবকে … আর বিকারকে কে দমন করে? ত্রিগুণ যদি না পারে, তবে স্বয়ং চেতনা। … এই তো পুরাণের ব্রহ্মাণ্ডের কথা, তাই না রথিন?
রথিনকাকা – অরে বিজয়! আমার না সমস্ত ঘেঁটে যাচ্ছে। … আচ্ছা এসব আমায় কেন শোনাচ্ছ বলো তো! … বেশ পুরাণে বর্ণিত ব্রহ্মাণ্ড হলো এই সম্পূর্ণ শরীর, মন, বুদ্ধি, আত্মা চেতনার জগত। … তার সাথে আমার প্রশ্নের কি সম্পর্ক একটু বুঝিয়ে বলবে?
বাবা একটু মৃদু হেসে – ভাই রথিন, যদি ব্রহ্মাণ্ডটাই এটা হয়, তবে তোমার অজানা কি থাকতে পারে? … এমন কি আছে ব্রহ্মাণ্ডে, যা তুমি জানো না? … (আবার হেসে) বই আমাদের জ্ঞান নয় রথিন, জ্ঞান অর্জনের মার্গ দেখায়। … কোন মার্গে চললে, জ্ঞান অর্জন হবে, তা বলে। জ্ঞান প্রদান করার ক্ষমতা, মন, বুদ্ধি, শরীর, আত্মা কারুর নেই। … স্বয়ং ঈশ্বরীই হলেন জ্ঞানদা। … অর্থাৎ একমাত্র তোমার আমার চেতনাই আমাদের জ্ঞান প্রদান করেন। … বই আমাদের বলে দেয়, কি ভাবে তাঁর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করা যায়। জ্ঞান প্রদান করে না বই।
রথিনকাকা – বাবা, আমার ঘাট হয়েছে। … আর কোনোদিন এইরকম প্রশ্ন করবো না! … উত্তর তো পেলাম, কিন্তু যা উত্তর দিলে তুমি, এর মানে উদ্ধার করতে আমাকে আরেকবার মানুষ হয়ে এসে তোমার শিষ্যত্ব গ্রহণ করতে হবে। তবে যদি বুঝি। আজ চললাম।
বাবা – ঠিক আছে, এসো। কেসটা স্টাডি করে নিয়ে, আমি খুব শীঘ্রই তোমাকে পরবর্তী প্ল্যানের কথা বলছি।
রথিনকাকা চলে গেলেন। আর বাবাও সমস্ত নথিকে এদিক সেদিক করে দেখতে শুরু করে দিলেন। মা মাঝে বললেন – এখানে ছড়িয়ে বসা যাবেনা। … যাও নিজের ঘরে গিয়ে বসো; ওখানে কেউ তোমাকে বিরক্ত করবে না।
বাবাও দেখলাম চলে গেলেন নিজের ঘরে। আর তারপর সেই রাত্রে ঘুমিয়ে ছিলেন কিনা জানিনা। আমার তো মনে হয়, দুইতিনদিন ঠিক করে ঘুমানই নি। … বাবাই আমাদের বাড়িতে সকালে প্রথম উঠতেন ঘুম থেকে। এখন বিদিপ্তাদিদি ওঠেন। … কিন্তু এই তিনদিন দেখলাম, মা বাবাকে রোজ সকালে ডেকে দেন। উনিও জানেন, বাবা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকছেন, তাই আটটার সময়ে, চা চাপাবার ঠিক আগে বাবাকে ডেকে বলতেন – উঠে পর, চা চাপাবো।
তিনদিন ধরে আমি বাবার আশেপাশে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম, যদি বাবা কিছু মুখ ফাঁক করে কেসের ব্যাপারে বলে দেন। জানি সেটা বাবার স্বভাববিরুদ্ধ। উনি যেই কাজ করেন, তাতে এতটাই মনযোগী থাকেন যে, আশেপাশে কে ঘুরছে, কি করছে, সেই ব্যাপারে সমস্ত হুঁশ তো থাকে, কিন্তু মনোযোগ দেন না। … মানে ব্যাপারটা এরকম যে, এই দুইদিন কখন কখন আমি বাবার ঘরে গেছি, কি জামা পরে গেছি, আমার মনে নেই, কিন্তু বাবার সেই সম্বন্ধে সম্পূর্ণ স্মৃতি থাকে। …
অদ্ভুত এই স্কিল, যেটা কপি করেও করতে পারিনা আমি। বাবার ইন্দ্রিয়ের সামনে যা কিছু আসে, বাবা নিজের স্মৃতিতে অকপটে স্টোর করে রেখে দেন, কিন্তু কনো বিচারই করেন না সেগুলোর। যখন সেগুলোর প্রয়োজন পরে, বাবা স্মৃতি থেকে সেগুলো বার করে করে, রোমন্থন করে নেন। … অনেকটা কম্পিউটারের মতন। যা কপি পেস্ট করা হয়, সমস্ত স্টোর করে রেখে দেয়, কিন্তু কনো ভাবে তাদের ট্র্যাক রাখেনা। যখন প্লে করা হয়, তখন দিব্যি খুলে দেয়। … কিন্তু এখানে একটা কম্পিউটারের সাথে বাবার পার্থক্যও আছে। কম্পিউটারের মেমরির লিমিট আছে, কিন্তু বাবার নেই; আর কম্পিউটারের মেমরির অনেক কিছুই সময়ের সাথে সাথে কোরাপ্ট হয়ে যায়, কিন্তু বাবার তা হয়না।
যাইহোক, এই তিনদিন পরে, আমার আশেপাশের উপস্থিতিকে বাবা গুরুত্ব দিলেন। তাই আমি কাছে গিয়ে বসলাম। বাবা জানেন আমি কি জানতে চাইছি; তাই বিবৃতি দিতে থাকলেন কেসের।
উনি বললেন – সিরিয়াল কিলারের সিরিয়াল মার্ডারের মোটিভ জানতে গেলে, কি খুঁজতে হয় তাঁর করা ক্রাইমের থেকে?
আমি – কমন ফ্যাক্টরগুলো। কারণ সেই কমন ফ্যাক্টরগুলো সব মিলিয়েই তাঁর সিগনেচার হয়।
বাবা – ভেরি গুড। এই তিনটে খুনের ব্যাপারে কি কি কমন ফ্যাক্টর তুই জানিস ইতিমধ্যে?
আমি – এই তো, সব কটা বাচ্চা, মানে তিনটে বাচ্চাই ক্লাস সিক্সে পড়তো। তিনজনেরই ডেডবডি স্কুল ইউনিফর্মে পাওয়া যায়, আর … আর … আর কি? আর তো কিছু জানি না?
বাবা – হুম। যা জানিসনা সেগুলোর মধ্যে প্রথম হলো এই যে, তিনটে বাচ্চার ক্ষেত্রেই কনোরকম বাড়ির লোকের সাথে যোগাযোগ করা হয়নি, বা কনো টাকা চাওয়া হয়নি। … অর্থাৎ কেন খুন করা হয়েছে?
আমি – খুন করার জন্যই খুন করা হয়েছে। … মানে অন্য কনো উদ্দেশ্য নেই, খুন করাটাই উদ্দেশ্য।
বাবা – উমহুম, ভুল হলো। অন্য কনো উদ্দেশ্য নেই, এমন বলা সম্ভব নয়। বা বলা উচিত, উদ্দেশ্য প্রত্যক্ষ নয়, কিন্তু তা তো আছেই, কারণ সিরিয়াল কিলার নিজের ব্যক্তিগত জীবনে যা ঘটেছে, সেই মোটিভকে পিছনে রাখে, আর সমাজের কনো একটা অভ্যাসের বিরোধিতা করছে সে, সেটাই সামনে রাখে। … কিন্তু এখনও সেই উদ্দেশ্য সামনে আসেনি আমাদের। … হ্যাঁ, যোগাযোগ বাড়ির লোকের সাথে করা হয়নি, এবং কনো রকম টাকা চাওয়া হয়নি বা হুমকি দেওয়া হয়নি। এর মানে টাকার জন্য কাজ করা হচ্ছে না। অজানা অন্য কনো উদ্দেশ্য আছে।
একটু থেমে গিয়ে, আবার বললেন – পরবর্তী কমন ফ্যাক্টর একটা রয়েছে। হতে পারে সেটা কাঁকতলিয়, বা হতে পারে কিলার ইন্টেন্সানালি বা মোটিভ বোঝানোর জন্যই এমন স্যাম্পেল তুলেছে। … সেটা হলো, যেই তিনটি বাচ্চাকে মারা হয়েছে, সবকটা ক্লাসের কৃতি ছাত্র। … সকলে ভীষণ ভালো স্টুডেন্ট, এবং ক্লাসে ফার্স্ট হতো, এমন বয়ান দিয়েছে, তাদের মাবাবা।
আমি – বিজরিয়ার ছেলে ফার্স্ট হতো, সেইবারে সেকেন্ড হয়েছিল, আর তার জন্য বাড়িতে বকাঝকা করা হয়েছিল।
বাবা – হুম, … আরো বল… এই ব্যাপারে।
আমি – আর কি … হ্যাঁ, বিজরিয়া বললেন, সেকেন্ড হওয়া আর ফেল করা, দুটোই এক। … মানে …
বাবা – মানে কি, বল।
আমি বুঝতে পারলাম আমি কনো ক্লু-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, তাই বাবা আমাকে আরো বলতে বলছেন। তাই একটু ভেবে বলার চেষ্টা করলাম – মানে এই যে, সন্তানের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হতো।
বাবা – একজ্যাক্টলি। সন্তানের উপর মাবাবা অত্যন্ত চাপ সৃষ্টি করতো। আর এটাই হলো তিনটে খুনের মধ্যে আরো একটা, আর লাস্ট খুঁজে পাওয়া কমন ফ্যাক্টর।
আমি – কিন্তু খুনি জানলো কি করে সেটা?
বাবা – ভেরিগুড কয়েসচেন। খুনি কি করে জানছে যে কার উপর তাদের বাবামা বেশি প্রেশার ক্রিয়েট করছে? সোর্সটা কি?
আমি – আচ্ছা বাবা, বাচ্চাগুলো কি একই স্কুলের?
বাবা – না, সেটা হলে তো মিটেই যেত। সরাসরি সেই স্কুলের সঙ্গে যুক্ত সমস্ত টিচার, হাউজকিপার সবার উপর সন্দেহ পরতো।
এই বলে বাবা মাথাটা সোফায় এলিয়ে দিলেন। আমি আবার বললাম – এর মানে, কিলারের এটা আপত্তি যে মাবাবা বাচ্চাদের উপর অমানুষিক প্রেশার সৃষ্টি করে, তাদের ইঁদুর দৌড়ের প্রতিযোগী করে তোলেন। … তাই তো?
বাবা – হুম, কিন্তু এখন সেটা ভাবার বিষয় নয়। ওটা লাস্টে ভাবার বিষয়, মানে সিরিয়াল কিলার কেন সিরিয়াল কিলিং শুরু করলেন, সেই তথ্য উদ্ধারের সময়ে এটা ভাবার। এখন ভাবার হলো কি ভাবে স্কুলগুলোর সাথে, আর বাচ্চাগুলোর সাথে কিলার কানেক্টেড। … বাড়ির খবর পাচ্ছে, মানে বাড়িতে কি বলা হচ্ছে সেই খবর পাচ্ছে। আবার স্কুলে ফার্স্ট না হয়ে সেকেন্ড হয়েছে, সেই খবরও পাচ্ছে। … কি করে?
আমি – বাড়ির কাজের লোক? সে তো বাড়িতেই এই খবর পাচ্ছে, তাই না!
বাবা – হুম, গুড পয়েন্ট। … তিনটে বাড়ির কাজের লোক আর ড্রাইভারদের তুলতে বলি প্রথমে, তারপর দেখতে হবে যে তারা কনো একই মানুষের সাথে কানেক্টেড কিনা। যদি কানেক্টেড হয়, তবেই আমরা ঠিক দিকে এগচ্ছি।
বাবা দেরি না করে, রথিনকাকাকে ফোন করে বলে দিলেন, কাজের লোক আর ড্রাইভারদের কাস্টডিতে একসঙ্গে করার জন্য। একদিনের মধ্যেই রথিনকাকা কাজ করে ফেললেন। আর বাবার কথা মত, একটু মিডিয়াকে জানিয়েই করলেন কাজটা। …
আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম – মিডিয়াকে জানিয়ে করতে বললে কেন বাবা?
বাবা – যদি কিলার এই পরিবারগুলোর ক্ষতি করার মানসিকতা থেকে তাদের বাচ্চাকে খুন করার চেষ্টা করে, তবে এই পরিবারগুলোর উপর সে নজরদারি তো করছেই। … আর তাই যদি হয়, তবে এই পরিবারের উপরে সে কনো রকম একটা প্রেশার ক্রিয়েট করার চেষ্টা করবেই। … আর যদি তা না হয়, তবে আমরা ভুল পথে যাচ্ছি, সেটা বোঝাতে সে আরো একটা খুন করবে।
আমি – এটা কেরকম খেলা বাবা! … তুমি আর খুনি, দুইজন দুইজনকে জানোও না, চেনোও না; কিন্তু দুজনেই দুটো আলাদা আলাদা মেরুতে বসে, একে অপরের সাথে গেম খেলে যাচ্ছ!
বাবা – হুম, গেম না খেললে, তার কাছে আমরা কনোদিনও পৌছাতে পারবোনা মিলি। … চল, একটু ভবানীভবন থেকে ঘুরে আসি।
আমরা সেখানে গিয়ে জানলাম, কাজের লোকরা সকল পরিবারের নিজের এপয়েন্ট করা, আর তাদের মধ্যে কনোরকম যোগসূত্র নেই। না তারা একে অপরকে চেনে; না তাদেরকে কেউ একই ব্যক্তি সাপ্লাই করেছে, আর না যারা সাপ্লাই করেছে, তারা একে অপরের সাথে কনোভাবে কানেক্টেড।
আর একই জিনিস ড্রাইভারদের ক্ষেত্রেও। … কেউ কনোভাবেই একে অপরের সাথে কানেক্টেডই নয়। না প্রত্যক্ষ ভাবে, না পরোক্ষ ভাবে। … আমাদের সন্দেহ ভুল দিকে যাচ্ছে। … বাবা সকলকে ছেড়ে দিতে বলল। সবটাই বেকার হয়ে গেল।
বাবা ভয় পেলেন কিনা জানিনা, তবে আমি এবার একটু ভয় পেয়ে গেলাম। আমরা ভুল পথে গেলে, আবার খুন করবে, বাবা বলেছিলেন। আবার একটা বাচ্চা খুন হবে! … এইটা ভেবেই হাতপা ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
বাবা বাড়িতে এসে সোফায় বসে পরলো। … আমি অনেকক্ষণ পরে উনার কাছে যেতে, উনি বললেন – অদ্ভুত ভাবে খুন না! … ঘুম পারিয়ে, ঘুমের মধ্যে গলার নলি কেটে খুন। …
আমি – এই অদ্ভুত পদ্ধতি কেন?
বাবা – হয়তো এটা ওর সিগনেচার। … আর তা না হলে …
আমি – তা না হলে কি?
বাবা – তা না হলে … বাচ্চাদের কষ্ট দিতে না চাওয়া। (বাবার ভয়েস নেমে গেল; যেন কনো একটা নতুন আলো দেখতে পেলেন উনি)… মানে, বাচ্চাদের প্রতি খুনি দুর্বল। … আসলে … আসলে খুনি বাচ্চার বাবামাকে শিক্ষা দিতে চায়! …
আচমকা বাবা উঠে পরে বললেন – চল তো মিলি, চার বছর আগের খুন হওয়া বাচ্চার পরিবারে, আর দুই বছর আগের খুন হওয়া বাচ্চার পরিবারের সাথে একবার কথা বলতে হবে। চল।
আমি – এখনই?
বাবা – শুভশ্র শীঘ্রম।
আমি আর বাবা চলে গেলাম সল্টলেক। বাড়ির এড্রেস ক্রাইম ফাইল থেকেই পেয়েছিলাম। তাই সরাসরি বাড়িতে গিয়ে কলিংবেল বাজালাম। নেমপ্লেট লাগানো, অনুপ মাহাতো, সিএ, এফএস, আরো কি লেখা। বেল বাজতে বাড়ির কাজের লোক বেড়িয়ে এলেন। বাবাকে উনি চেনেন। সিয়াইডির দপ্তরে রিসেন্টলি বাবাকে দেখেছেন।
আমাদের নিয়ে গিয়ে ঘরের ভিতরে বসালেন। বেশ বিত্তবান পরিবার দেখেই বোঝা গেল। আমরা বসে রয়েছি, তখন একজন মহিলা সামনে এলেন।
বাবা – সুপ্রতিম মাহাতোর মা!
ভদ্রমহিলা – হা, আপ ঈশ কেসকো রি-ওপেন কিউ কিয়ে?
বাবা – আপনার কনো আপত্তি!
ভদ্রমহিলা – না না আপত্তি তো একদমই নয়। … একমাত্র সন্তান আমাদের। … এমনিই সর্বহারা হয়ে গেছি, সে চলে যেতে। যেই রাক্ষস আমার ছেলেকে খেয়ে নিয়েছে, আমি তো তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে দেখতে চাই।
বাবা – কেস বন্ধ হয়ে গেল কেন?
মিসেস মাহাতো – পুলিশ বলেছিল, কনো কূলকিনারাই পাচ্ছে না তারা। …
বাবা – কি কি করেছিল পুলিশ?
মিসেস মাহাতো – যেই স্কুল বাসে করে সুপ্র স্কুল যেত, তার ড্রাইভারকে ধরেছিল। কিন্তু ড্রাইভার বলে, সে কি করতে পারে? সুপ্র সেদিন বাসে ওঠেই নি। … বাসের মধ্যে সিসিটিভি ক্যামেরা দেখা হয়, সেখানেও দেখা যায় যে সুপ্র সেদিন স্কুল থেকে ফেরার সময়ে বাসে ছিলই না। … স্কুল অথরিটিকে জেরা করা হয়। তারাও সিসিটিভি দেখায় যে, সেদিন সুপ্র স্কুলের কম্পাউন্ড থেকে বেড়িয়ে বাসে ওঠার লাইনে ছিলই না।
বাবা – মানে স্কুল থেকেই গায়েব?
মিসেস মাহাতো – হ্যাঁ।
বাবা – ঠিক আছে, দেখছি আমি। … আর আপনার হাসব্যান্ড কে দেখছি না তো?
মিসেস মাহাতো – পুলিশ যখন হাল ছেড়ে দিল, তারপর থেকে সর্বক্ষণ মনে তোলপাড় করতে করতে, উনার স্ট্রোক হয়। এখন উনার বাঁদিকটা পুরোপুরি প্যারালাইজ হয়ে গেছে, আর ডান দিকেরও বেশ কিছুটা। ডান হাত চলে, তাই সই করতে পারেন। সেই কারণেই সিএ ফার্মটা চলছে এখনো।
বাবা – অনেক ধন্যবাদ। … আর নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনার ছেলের খুনি ধরা পরবেই। একটু দেরি হতে পারে, তবে পাওয়া যাবেই।
মিসেস মাহাতোর চোখটা একটু ছলছল আর একটু জ্বলজ্বল করে উঠলো। আমরা সেখান থেকে চলে গেলাম, ভবানীভবনে। বাবা আর আমি গেলাম রথিনকাকার চেম্বারে। আমাদের দুইজনকে ওখানে সকলে চেনে। আর বাবার বিশাল খাতিরদারি ওখানে। আমরা ঘরে ঢুকতে, রথিনকাকা ল্যাপটপ থেকে মুখ উঠিয়ে – কি ব্যাপার পিতাপুত্রি একসাথে। … কনো দিশা পেলে নাকি?
বাবা – খুনির দিশা পবো না এর থেকে, তবে খুনির সম্বন্ধে অনেক কিছু জানতে পারবো। … মানে খুনি কি করতে পারে, কি করতে পারেনা, এই সব।
রথিনকাকা – একটু খুলে বলোতো!
বাবা – আমি নই, চারবছর আগে, মিস্টার মাহাতোর ছেলের খুনের তদন্তকারী পুলিশ অফিসার ছিলেন, সমীর খাঁ। উনি এখন কোথায় আছেন, একটু দেখে বলো।
রথিনকাকা – দাঁড়াও বলছি।
প্রায় পনেরো মিনিট রথিনকাকা ল্যাপটপে মুখ গুজে থেকে, মাথা তুলে বললেন, এখন তিলজলাতে পোস্টিং। …
বাবা – একবার ডেকে পাঠাও।
রথিনকাকা ফোন করে সরাসরি খাঁ সাহেবকে ফোনে ধরলেন, তারপর রিপোর্ট করতে বললেন ভবানীভবনে। প্রায় আধঘণ্টা পরে, এই বছর ৪০-৪৫ এর এক পুলিশ অফিসার ঘরে এসে, স্যালুট করে বললেন – ইয়েস স্যার, এন্সপেক্টর খাঁ রিপোর্টইং।
রথিনকাকা – মিট হিম। বিজয় সিংহ। উনি মিস্টার মাহাতোর ক্লাস সিক্সের বাচ্চা খুনের তদন্ত করছেন। উনি কিছু বলবেন আপনাকে।
খাঁ সাহেব আমাদের দিকে মুখ করে বসে বললেন – স্যার সিন, আমি আপনার একজন ভক্ত। বলুন স্যার, কি করতে পারি আমি। … আচ্ছা কোন কেসের কথা বলছেন আপনি?
বাবা – ক্লাস সিক্সের বাচ্চা, স্কুল থেকে উধাও। তারপরে লাস পাওয়া যায়। ঘুম পারিয়ে গলার নলি কেটে খুন, আর একটা আঙুল কাটা।
খাঁ – ওকে ওকে, সল্টলেকের কেস, মিস্টার মাহাতো, সিএ ফার্ম আছে উনার।
বাবা – একজ্যাক্টলি। … আচ্ছা একটা কথা বলুন, স্কুল থেকে উধাও হয়েছিল বাচ্চা। তো স্কুলে নিশ্চয়ই আপনি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। কি জেনেছিলেন? স্কুলে সেদিন কনো প্রগাম, বা সেই ধরনের কিছু ছিল?
খাঁ – হ্যাঁ স্যার ছিল। সেদিন ওদের স্কুলে একটা সায়েন্স সো ছিল।
বাবা – তাহলে নিশ্চয়ই যারা সায়েন্স সো করতে এসেছিলেন, তাঁদের সাথেও যোগাযোগ করেছিলেন আপনি!
খাঁ – হ্যাঁ স্যার করেছিলাম, ওদের একটা পেটি মিসিং হয়েছিল সেদিন। … যতদূর মনে আছে স্যার, একজন ওদের মহিলা কর্মী স্কুল থেকে ফেরার সময়ে, ওদের ইনফর্ম না করেই চলে যায়। তার সাথে যেই কিট ছিলো, সেটা মিসিং হয়ে যায়।
বাবা – পরে নিশ্চয়ই স্কুলের বাথরুম থেকে সেটা উদ্ধার হয়, তাই তো?
খাঁ – হ্যাঁ স্যার, তবে কিট পাওয়া যায়নি, অনলি কিটের ভিতরে যা যা ছিল, সেগুলো পাওয়া গেছে।
বাবা – আর সেই কর্মী যে মাঝখান থেকে চলে গেছিল?
খাঁ – স্যার, উনি নাকি সেদিন অসুস্থ ছিলেন, আর উনার কথা হল উনি সেদিন আসেনই নি। … তবে সেই ট্রুপের মালিক এবং অন্য কর্মচারীদের থেকে জেনেছিলাম, সে এসেছিল। … আমরা জেরা করে জেনেছি, সেই এমপ্লয়ির ফুড পয়েজেন হয়েছিল, এবং উনি সেদিন বিছনা থেকে উঠতেও পারেন নি, উনার বাড়ির লোকও একই কথা বলেন। … আর সেই থেকে একটা কনফিউসান তৈরি হয়। আর শেষে কোম্পানির মালিক, সেই কর্মীকে কোম্পানি থেকে তারিয়ে দেয়।
বাবা – হুম। … তারপর আর কি করেছিলেন আপনি?
খাঁ – স্যার, এরপর তো কেসের কনো দিশাই দেখতে পেলাম না। … কি করবো, কাকে ধরবো, কিচ্ছু বুঝতে পারলাম না। … সেই মেয়েটিকে থানায় তুলে এনেছিলাম। মহিলা পুলিশ দিয়ে ওর মুখ থেকে কথা বার করারও চেষ্টা করি। … তবে আমার শেষে মনে হয়, মেয়েটা সত্যিই বলছিল, ওর সেদিন ডিসেন্ট্রিই হয়েছিল। ওষুধের দোকানেও খবর নিয়ে জেনেছি যে মেয়েটির ভাই, মেয়েটির কথা বলে ওষুধ নিয়ে গেছিল।
বাবা – ওকে, থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ। … আমার আর কিছু জানার নেই।
খাঁ চলে গেলেন। বাবার দিকে রথিনকাকা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। বাবা বললেন – কি? ওই ভাবে তাকিয়ে রইছো কেন?
রথিনকাকা – আরে! কিছু বলো, কি বুঝলে সেই ব্যাপারে।
বাবা – ও হ্যাঁ! … প্রস্থেটিক্স।
রথিনকাকা – প্রস্থেটিক্স!
বাবা – হুম, আততায়ী প্রস্থেটিক সার্জারি জানে।
রথিনকাকা – ভাই তোমার না এই স্টেপজাম্প আমি কিচ্ছু বুঝিনা। … খাঁ যা বলল, তার সাথে প্রস্থেটিক্সের কিসের সম্বন্ধ!
বাবা – সেই সায়েন্স গ্রুপের কর্মীকে আগের দিন কনো ভাবে খাবারের মাধ্যমে ফুড পয়েজেনিং করা হয়, তারপর প্রস্থেটিক্স ব্যবহার করে, সেই কর্মীর রূপ ধরে চলে যায় আততায়ী। তারপর, বাথরুমে বাচ্চাকে নিয়ে যাওয়া হয়, মানে মিস্টার মাহাতোর ছেলেকে, আর সেখানে খুমের ওষুধ বা ইনজেকশন দেওয়া হয়। … তারপর, সেখানে কিটের সমস্ত সামগ্রী খালি করে, সেই কিটব্যাগে করেই মাহাতোর ছেলের ঘুমন্ত দেহকে স্কুলের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আর তাই মাঝরাস্তায় সে কেটে পরে। মাঝখান থেকে সেই কর্মচারীটি মিথ্যা অভিযোগে চাকরিটা হারায়। … আরে ওয়েট ওয়েট… একবার খাঁকে ফোন লাগিয়ে আমাকে দাও। একটা কথা জানার আছে।
রথিনকাকা – বুঝলাম।
বাবা – পরে বুঝবে, আগে ফোনটা লাগাও।
রথিনকাকা – হ্যাঁ হ্যাঁ, লাগাচ্ছি। …
ফোন করে, রথিনকাকা বললেন – খাঁ, সিন তোমার সাথে একটা কথা বলতে চায়। একবার বাইক পার্ক করে, ফোনে কথা বলে নাও।
বাবাকে ফোন দিলে, বাবা প্রশ্ন করলেন – আচ্ছা ইন্সপেক্টর খাঁ, আপনি তো সেই কর্মীটিকে থানায় তুলে এনেছিলেন না! …
(উল্টো দিকের কথা)
বাবা – আচ্ছা, মেয়েটার গায়ের রঙ, চেহারা আর হাইট কেমন ছিল?
(উল্টো দিকের কথা)
বাবা – আচ্ছা ঠিক আছে। থ্যাঙ্ক ইউ। সেটাই খালি জানার ছিলো।
বাবা ফোন রেখে দিলেন। রথিনকাকা – কি চলছে বলো তো তোমার মাথায়?
বাবা – আততায়ী প্রস্থেটিক্স করে নিজের মুখ ঢেকে দিতে পারেন, কিন্তু চেহারা তো ঢাকা সম্ভব নয়। তাই নিশ্চয়ই আততায়ী, সেই পুরো গ্রুপের মধ্যে যার চেহারা নিজের সাথে সব থেকে বেশি মেলে, তাকেই টার্গেট করেছিল। অর্থাৎ সেই কর্মীর চেহারা জেনে গেলে, আততায়ীর চেহারাও জানা হয়ে গেল, তাই না!
রথিনকাকা – হুম, রাইট। … এতো ফাস্ট মাথায় এসব আসে কি করে তোমার! … যাইহোক, তা কি জানলে?
বাবা – আততায়ী ফরসা, লম্বা, তা প্রায় ৫ ফুট ৮-৯ ইঞ্চি, আর ভারি চেহারার। … অর্থাৎ, আততায়ী মহিলা না হয়ে, পুরুষ! … হুম পুরুষ হবার সম্ভাবনাই বেশি। … এই চেহারার মহিলা তো রেয়ার তাই না। … আর লম্বা যদি হয়েও যায়, মানে যদি গুজরাটি বা পাঞ্জাবি হয়েও যায়, তারা তো ডায়েট কন্সার্ন, তাই চেহারা ভারি হবে না। … অর্থাৎ পুরুষই হবে আততায়ী।
রথিনকাকা – না মিলি, মানতেই হবে। … আমি এতো মানুষ দেখেছি, এরকম ইনটেলিজেন্ট খুব কম দেখেছি, বা বলতে পারিস, দেখিই নি।
বাবা – হুম, দেখো নি ঠিকই। কিন্তু আছে। … আমাদের আততায়ীই সেই প্রকার ইনটেলিজেন্ট। … ঠিক আছে, আজ উঠি রথিন। পরের খুন হয়েছে, মিস্টার মহাপাত্রের ছেলের। সেখানে গিয়ে দেখি, গল্পটা কি।
আমরা বাড়ি চলে এলাম। সন্ধ্যায় যাবো ঢাকুরিয়া। সেখানে মিস্টার মহাপাত্রের ফ্ল্যাট। … বাবা ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিলেন। এখানে ভদ্রলোকের ওষুধের ব্যবসা। … ডিস্ট্রিবিউটার। … আর উনার ছেলের মৃত্যুর শোকে, উনার স্ত্রী আজ দেড় বছর হয়েছে দেহত্যাগ করেছেন।
আমরা সন্ধ্যায় সেখানে গেলাম। দরজা খুললেন ভদ্রলোকের কাজের লোক। বাবাকে আগে দেখেছেন উনিও সিয়াইডি দপ্তরে। … আমাদের বসাতেই, ভদ্রলোক পাসের ঘর থেকে বেড়িয়ে এলেন। বয়স ৪০ এর বেশি নয়। কিন্তু বার্ধক্য যেন তাড়াতাড়ি উনার জীবনে এসে গেছে।
বাবা – আপনার এমন শরীরের অবস্থা!
ভদ্রলোক – আর শরীর! … সবই তো চলে গেছে। … মরিনি, তাই বেঁচে রয়েছি খালি।
বাবা – হুম, একটু ডিস্টার্বই করছি। আপনার পুরনো অপ্রিয় স্মৃতিগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছি। হয়তো, সেগুলোকে ভুলে থাকছিলেন। আমার প্রশ্নের জন্য হয়তো, দুইতিন রাত সেই স্মৃতি আপনাকে ঘুমাতে দেবে না!
মিস্টার মহাপাত্র – ঘুম আর এমনিই নেই। ঘুমের ওষুধ আজ দুই বছর হয়ে গেছে, লাগাতার চলছে। মাঝে মাঝে তো মনে হয়, একদিন বেশি করে খেয়ে নিয়ে মরে যাই। … স্মৃতি রোমন্থন করতে হবেনা মিস্টার সিন। আপনিও তো একজন বাপ। বাবার স্মৃতি থেকে সন্তানের স্মৃতির একটি দিনও কি কখনো মুছতে পারে!
বাবা – ঠিকই। … আমার প্রশ্ন কি আমি করতে পারি!
মহাপাত্র – হ্যাঁ করুন।
বাবা – আচ্ছা, আপনার ছেলেও কি স্কুল থেকে বেপাত্তা? … নাকি স্কুল থেকে সে বেড়িয়েছিল?
মহাপাত্র – না, স্কুলের মধ্যে থেকেই। … স্কুলবাসে না আসার জন্যই তো আমার স্ত্রীকে স্কুলবাসের ড্রাইভার ফোন করেছিল যে আমাদের বাচ্চা স্কুল থেকে আসেনি, আমরা আগে গিয়ে নিয়ে এসেছি কিনা।
বাবা – আপনার ছেলে ভারতীয় বিদ্যাভবনে পড়তো না!
মহাপাত্র – না না, পাঠভবন।
বাবা – হ্যাঁ হ্যাঁ, সরি। … আচ্ছা ভারতীয় বিদ্যাভবনের সাথে আপনার ছেলে কি কনো ভাবে যুক্ত ছিল? … মানে আগে কি ওই স্কুলে!
মহাপাত্র – না তো? ভারতীয় বিদ্যাভবন আমাদের এখান থেকে অনেকটাই দূরে। … আমরা সেখানে ছেলেকে এডমিশন করানোর কনো চেষ্টাই করিনি কনোদিন।
বাবা –ওকে। … আচ্ছা আপনার ছেলের স্কুলে, সেইদিন কনো ফাংসান ছিলো?
মহামাত্র – উমম, … হ্যাঁ ছিলো তো। ফুড ফেস্ট ছিলো। … অনেকেই খাবার স্টল দিয়েছিল সেদিন।
বাবা – ওকে, থ্যাঙ্ক ইউ।
আমরা বেড়িয়ে গেলাম। বাবা আমাকে বললেন – পেটার্ন এক। … একবার রথিনের সাথে কথা বলতে হবে। ফোন করে বাবা বললেন, মহাপাত্রের ছেলের খুনের তদন্ত কে করছিলেন?
রথিনকাকা – পাণ্ডে। … কিছু লাগবে?
বাবা – কাল অফিসে একটু ডাকো।
রথিন – সকাল সকাল চলে এসো। ওকে বলে দিচ্ছি।
আমরা সকাল ৯টায় ভবানীভবনে হাজির। পাণ্ডেও এসে গেছিল। বাবার সাথে হাইহ্যালো হবার পর বাবা বললেন – মহাপাত্রের ছেলে খুন হবার দিন পাঠভবনের স্কুলের বাথরুম থেকে কিছু উদ্ধার হয়!
পাণ্ডে – হ্যাঁ স্যার, প্রচুর চাউমিন উদ্ধার হয়।
বাবা – কোন স্টলের প্রডাক্ট, জেনেছিলেন?
পাণ্ডে – হ্যাঁ স্যার, তবে স্টলের মালিক বলেন যে তিনি স্টল দিতেই পারেন নি, কারণ উনার মেয়ের উপর কনো একটা অ্যাটাক হবার জন্য, মেয়ের হস্টেলে, অর্থাৎ বীরভূমে উনি চলে গেছিলেন। … আমরা খবর নিয়ে দেখেছিলাম, ভদ্রলোক ঠিকই বলেছিলেন। আর উনিও সেদিন ওখানেই সারাদিন ছিলেন।
বাবা – হুম, ভদ্রলোককে কেমন দেখতে? মানে… উচ্চতা, চেহারা, গায়ের রঙ?
পাণ্ডে – ফরসা, উচ্চতা এই ৫ ফুট ৯ হবে… হ্যাঁ, … আর চেহারা বেশ ভালো।
বাবা – ঠিক আছে, থ্যাঙ্ক ইউ। আমার আর কিছু জানার নেই।
রথিনকাকা – প্রস্থেটিক্স… আর সেই একই লোক, তাই তো?
বাবা – হুম, একই রঙ, একই হাইট, একই চেহারা। (একটা জোরে নিশ্বাস)
রথিনকাকার ফোন বেজে উঠলো। রথিনকাকা ফোনে কথা বলে, উঠে দাড়িয়ে পরলেন। ফোন রেখে বললেন – চলো বিজয়, ফর্থ ক্রাইম হয়ে গেছে। … স্পটে যেতে হবে।
বাবা – সে কি! … ওকে … হুম, থার্ড কওয়ারটারলি পরীক্ষার রেজাল্ট কবে আউট হয়েছে যেন?
রথিনকাকা – এটা আবার কি প্রশ্ন! … হয়েছে, এই দিন ১৫ আগে। কিন্তু কেন?
বাবা – আবার কেউ ফার্স্ট হতো, সেকেন্ড হয়েছে। … চলো স্পটে যাই।
