আক্রোশ | রহস্য গল্প

মৌলবি কেসের পর, মায়ের কথা অনুসারে, আমি বাবার সমস্ত ৭টা কেসকে ক্ষতিয়ে দেখছিলাম। বোঝার চেষ্টা করছিলাম, বাবা কি করে কেসে অগ্রসর হন। কোন দিশায় বাবার বুদ্ধি চলে; বাবার ধ্যানধারনা, সমস্ত কিছুকেই অনুসরণ করার চেষ্টা করছিলাম। কতটা পারছিলাম বলা খুব মুশকিল, কারণ মাঝে মাঝেই মাথা হ্যাং হয়ে যাচ্ছিল। দুইতিনবার তো মাথা যন্ত্রণার ওষুধও খেতে হয়েছে।

এরই মধ্যে বাবাকে তিন তিনবার তলব করা হয়। কখনো মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে, তো কখনো সিয়াইডি দপ্তরে। বাবা যান, আর ফিরে আসেন। বাবার কেসগুলো ফলো করছিলাম বলে বুঝতে পারলাম কিনা জানিনা, তবে কেমন যেন বুঝে গেলাম যে বাবাকে একটা কেস দেবার চেষ্টা হচ্ছে, আর বাবা সেই কেসটা কিছুতেই নিচ্ছেন না। বাবা পারিবারিক কেস নেন না। হয়তো একটা পারিবারিক কেসই বাবাকে দেবার চেষ্টা হচ্ছে। সেই কারণেই নিশ্চয় বাবা কেসটা নিচ্ছে না। না, আমি শিওর নই যে তেমনটাই হচ্ছে, মানে বাবাকে কেস দিচ্ছে, আর বাবা নিচ্ছেন না, এই ব্যাপারে আমি শিওর তো নই, তবে আমার অনুমান তেমনই।

এইসমস্ত ব্যাপারে মা বাবাকে একদমই ঘাঁটান না, আমিও না। তাই কি হচ্ছে, কেন তিনবার করে বাবা যাচ্ছেন আর বেজার মুখে ফিরে আসছেন, সেটা অজানাই থেকে গেল আমাদের। এরই মধ্যে, বেশ কয়েকদিন ধরে, বাবাকে দেখলাম, তিনটি পুরনো কাগজ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ধরে সময় খরচ করতে। অহেতুক সময় নষ্ট করা বাবার ডিএনএ তে লেখা নেই। তাই কিছু তো ব্যাপার হবে। উৎসাহ খুব হচ্ছিল জানার। কিন্তু বাবাকে প্রশ্ন করলে, বাবা উত্তর দেবেন না দেবেননা, তাই প্রশ্ন করি নি।

একদিন বাবা কাগজগুলো নিয়ে নাড়ছিল, সেই সময়ে মা চেঁচিয়ে উঠলেন – স্নানটান করার দরকার নেই আজ, নাকি!

অনেকক্ষণ ধরেই মা বলছেন, কিন্তু বাবা কর্ণপাতই করছিলেন না, তিনটে খবরের কাগজ নিয়ে মেতে ছিলেন। এবারে মা চেঁচিয়ে উঠতে, বাবাকে দেখলাম, কাগজগুলোকে না গুছিয়েই, স্নানে চলে গেলেন। শীতকাল, তাই ফ্যানের হাওয়ায় কাগজ উড়ে যাবার চিন্তা নেই। স্নানটা করে এসে হয়তো গুছিয়ে রাখবেন, কারণ এখন যদি গোছাতে যান কাগজগুলো, তাহলে মা রুদ্রমূর্তি ধরলেও ধরে নিতে পারেন, আর একবার যদি তা হয়ে যায়, তবে সারাদিনটা মায়ের গজগজ এমনই ভাবে চলবে যে, আর কনো কাজে মন বসানো সম্ভব হবে না।

যা হয়, তা ভালোর জন্যই হয়। আমার কাছে বাবার এই কাগজ না গুছিয়ে স্নানে চলে যাওয়াটা একটা সুবর্ণ সুযোগ। আমি কাগজতিনটে চোখ বোলাতে শুরু করলাম। দেখলাম, তিনটে কাগজই বহু পুরনো। একটি চার বছর আগের, একটি দুই বছর আগের, আর একটা আগের বছরের। … যেই খবরটা বাবা ভাজ করে রেখে পড়ছিলেন, এবার সেগুলোর উপর চোখ বোলালাম। … দারুণ ইন্টারেস্টিং। তিনটেতেই একটি একটি করে ক্লাস সিক্সে পড়া বাচ্চা-খুনের কথা লেখা আছে। অদ্ভুত মিলও তিনটে কেসে। তিনটে ক্ষেত্রেই, বাচ্চাটাকে আগে ঘুম পারানো হয়েছে, তারপর ঘুমন্ত অবস্থায় গলার নলি কেটে খুন করা হয়েছে। আরো একটা জিনিস পড়ে একটু আঁতকেই উঠলাম।

চার বছর আগের খুনের ক্ষেত্রে, মৃত বাচ্চার একটি আঙুল ছিলো না, দুই বছর আগেরটায় দুটো আঙুল ছিলনা, আর আগের বছরেরটায় তিনটে আঙুল। … এ কেমন হিংস্রতা! … ওইটুকু বাচ্চা খুন, সেটা নিজেই একটা হিংস্রতা, তার সাথে এই আঙুল কেটে নেওয়া!!

বাথরুমে জলের আওয়াজ বন্ধ হয়ে গেছে। না, আর দেরি করা যাবেনা। যেমন করে বাবা বিছনায় কাগজগুলো রেখেছিলাম, সেটা দেখে রেখেছিলাম। ঠিক সেই ভাবে কাগজগুলো রেখে, সেই ঘর থেকে উঠে চলে গেলাম। … বাবা কিছু বুঝেছিলেন কিনা জানিনা, তবে আমাকে কিছু বলেন নি সেই ব্যাপারে।

বাবা মাঝে মাঝে বলেন, আমাদের ইন্দ্রিয়ের সামনে যা কিছু আসে, তা সময় আর প্রকৃতিই নিয়ে আসে, আর আমাদের সেই সমস্ত কিছুকে নিজেদের মস্তিষ্কে তুলে রাখতে বলে, কারণ তা হয় দূরভবিষ্যতে নয় শীঘ্রই কাজে লাগবে। … বাবা খুব বলেন কথাটা, যা সামনে এসেছে, তাকে অস্বীকার করো না, আর যা সামনে আসেনি, তার প্রতি আসক্তি দেখিওনা। … উনি এটিকে সুখী জীবনের মন্ত্র বলেন। এখন তো মাও এই মন্ত্রে বিশ্বাস করেন। … আমি এখন তা মানলেও, তখন মানতাম বলা ভুল হবে, তবে হ্যাঁ, অভ্যাস করতাম সেটার।

তবে বাবা ঠিকই বলতেন। সত্যি আমাদের ইন্দ্রিয়ের সামনে যা আসে, তা প্রকৃতি আর সময়ই আনে। আর তার হাতেনাতে প্রমাণ পেলাম, সেই দিনই, যেইদিন বাবার থেকে লুকিয়ে খবরের কাগজগুলো পড়েছিলাম। আমি আর মা, দুপুরবেলা চুল এলিয়ে শুয়ে নবকল্লোলের পূজাবার্ষিকীর একটা গল্প পড়ছিলাম; মায়ের ফোনটা বেজে উঠলো। আমার দিকেই ফোনটা ছিল, তাই উঠিয়ে দেখলাম, রথিনকাকুর ফোন। মাকে বলতে, মা আমার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে ধরে লাউডস্পিকারে দিলেন, যেমন মা সবসময়ে দিয়ে থাকেন।

মা – হ্যাঁ, হ্যলো! … কি ব্যাপার? কনো ভালো খবর না কি? বিয়ে থাওয়া করছো এবার?

রথিনকাকা – আরে না না, ওই সব ঝক্কি আমি নিতে পারবো না। ওর জন্য অনেক ক্ষমতা লাগে। এতো শক্তি আমার নেই। … একটা বিশেষ কারণে ফোন করলাম মধু। … শোন না, মিলিকে নিয়ে আজকে একবার সন্ধ্যায় তোকে, মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে যেতে হবে। আমি নিয়ে আসবো তোদের। গাড়ি পাঠিয়ে দেব। আমি এখানেই থাকবো।

মা – কি ব্যাপার! … কনো গণ্ডগোল কিছু?

রথিনকাকা – আরে আর বলিস না। তিনবার বিজয়কে মুখ্যমন্ত্রী ডেকে একটা কেস নেবার জন্য রিকোয়েস্ট করছে। বিজয় কিছুতেই সম্মতি দিচ্ছেনা। … শেষবার তো মুখের উপর বলে দিলো ও, একটু পড়াশুনা করছি কেসটা নিয়ে। যদি ঠিক বুঝি, তবেই কেসটা নেব। … আর অন্যদিকে হিউজ প্রেশার। … তাই তোদেরকে একবার মুখ্যমন্ত্রী ডেকেছেন। যদি হোমমিনিস্টারকে রাজি করিয়ে কেসটা বিজয়কে দেওয়া যায়। তাই একবার তলব।

মা আর কথা বাড়ালেন না। আমি আর মা, সন্ধ্যায় রেডি হলাম। বাবা খবরের কাগজ তিনটে থেকে মাথা উঠিয়ে বললেন – মুখ্যমন্ত্রীর তলব!

মা – হ্যাঁ, রথিনদা গাড়ি পাঠাচ্ছে।

বাবা – হুম।

আমি – কেসটা নেবে না নেবেনা!

বাবা – তিনভাগের একভাগ কেস দিচ্ছে। তদন্ত করে সমাধান করা সম্ভবই হবে না। যদি পুরো কেস দেয়, তবেই নেব।

আমি আর মা চলে গেলাম। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে আমাদের রথিনকাকাই নিয়ে গেলেন। মুখ্যমন্ত্রী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – হ্যালো মিলি। … মায়ের দিকে হাতজোর করে বললেন – নমস্কার মিসেস সিংহ।

মা যে এমন রসিকতা করতে পারেন আমি জানতাম না। তিনি হেসে বললেন – মিসেস সিংহ না বলে, একবারে সিংহী বললেই তো হয়। … বলুন স্যার, আমি কি করতে পারি আপনার জন্য!

মুখ্যমন্ত্রী – আসলে, একটা কেস আছে। এক বছরের পুরনো। কেসের সমাধান তখন করা যায়নি, তাই কেস ক্লোজ করে দয়া হয়েছিল। কেসটা একটা বাচ্চা খুনের ব্যাপারে। … কিন্তু কথাটা হচ্ছে, বাচ্চাটা মিস্টার বিজরিয়ার, … জানেনই তো, বড় ব্যবসাদার। … আমাদের পার্টি ফান্ডে সব থেকে বেশি কন্ট্রিবিউশান উনারই থাকে। … পরের বছরই নির্বাচন, হাতে আর মাত্র ৮-৯ মাস। এখন উনি এসে বলছেন, যদি উনার ছেলের কেস শলভ না করা হয়, তবে উনি পার্টিফান্ডে একটা টাকাও দেবেন না, আর অন্য ব্যবসাদের দিতেও দেবেন না। …বড্ড চাপে পরে গেছি। … আমার নিজের পার্টির শীর্ষকর্তারাও আমাকে চাপ দিচ্ছে। এককথায়, রাতের ঘুম খেয়ে নিয়েছে এই বিজরিয়া।

মা – রথিনদারা তো আছেন স্যার। উনিই কেন?

মুখ্যমন্ত্রী – পুলিশের কম্ম নয় এই কেস শলভ করা, সেটা তো এক বছর আগেই তারা প্রমাণ করে দিয়েছে। আর সিয়াইডিও নাজেহাল হয়ে গেছে কেসটা নিয়ে, কিন্তু কনো কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছেনা। … এখন একমাত্র বিজয়ই ভরসা মিসেস সিংহ।

মা – কিন্তু উনি আমার কথা এই সব ক্ষেত্রে একদমই শোনেন না। … আসলে…

আমি মাঝখান থেকে বললাম – স্যার, আমি কিছু বলবো?

মুখ্যমন্ত্রী – হ্যাঁ নিশ্চয়ই, তুমি তো বাবার এসিস্ট্যান্টও। বলো না কি বলবে।

আমি – স্যার, আপনি কি কেসটা সম্বন্ধে কিছু জানেন? নাকি শুধুই মিস্টার বিজরিয়ার ছেলে খুন হয়েছে, সেটুকুই জানেন?

মুখ্যমন্ত্রী – যা জানি, রথিনদের মুখ থেকেই জানি। সেই অনুসারে, উনার ছেলেকে ঘুম পারিয়ে, গলা কেটে খুন করা হয়েছে।

আমি – আর হাতের থেকে তিনতে আঙুলও কেটে নেওয়া হয়েছে!

মুখ্যমন্ত্রী – হ্যাঁ, হ্যাঁ … আরে তুমি এই কেসের কথা জানো?

আমি – না আসলে, বাবা কেসটা নিয়ে বেশ কিছুদিন পড়াশুনা করছেন, সেই সুত্রেই, একটু জেনেছি। আর যা জেনেছি স্যার, ঠিকই বলেছেন, এই কেস শলভ করা পুলিশের কম্ম নয়, কারণ খুন একটি হয়নি।

মুখ্যমন্ত্রী আর রথিনকাকা একই সাথে বললেন – খুন একটি হয়নি? মানে কি?

আমি – বাবাকে দেখলাম একটি চার বছরের পুরনো, একটি দুই বছরের পুরনো আর একটি এক বছরের পুরনো পেপার নিয়ে একসাথে ঘাটাঘাটি করতে। বাবাকে না জানিয়েই একটু পেপারগুলো ঘাটতে দেখি, এই তিন সময়ে তিনটি একই বয়সের বাচ্চা খুন হয়েছে, আর মজার কথা একই ভাবে। … অর্থাৎ এটি একটি সিরিয়াল কিলিং। … কিন্তু মজার কথা হচ্ছে, এই তিনটি খুনের মধ্যে এতটাই সময়ের গ্যাপ যে, পুলিশ এই তিনটি কেসকে এক সিরিজে আনার কথা ভাবতেই পারেনি। … আর আমি আমার বাবাকে যতটা চিনি, সেই থেকে বলছি স্যার, বাবা এই কেস নেবেন না।

মুখ্যমন্ত্রী – কেন?

আমি – কারণ শুধু মিস্টার বিজরিয়ার ছেলের খুনের তদন্ত করতে গেলে, মানে যেটা এক বছর আগের খুন, শুধু সেটার তদন্ত করতে গেলে, এই কেসের মীমাংসা করা অসম্ভব, কারণ সিরিয়াল কিলারকে ধরতে গেলে, তাঁর মোটিভ জানা আবশ্যক, আর তাঁর করা সমস্ত খুনকে মিলিয়ে না দেখলে, সেই মোটিভ জানা অসম্ভব। … তাই যদি বাবাকে এই কেস দিতে হয়, তবে স্যার, আপনাকে এই তিনটে কেসই রি-ওপেন করতে হবে। তবেই বাবা কেসটা নেবেন। কারণ তখনই কেসটা যতটা ঘটেছে, সেটা পুরো হবে। যদিও কেসের এখনও অনেক কিছু ঘটা বাকি।

মুখ্যমন্ত্রী – মানে তুমি বলছো মিলি, এখনো খুন হবে?

আমি – হ্যাঁ স্যার, এখনও পর্যন্ত আততায়ী নির্বিঘ্নে খুন করে গেছে, আর তাকে ধরার চেষ্টাও কেউ দেখায় নি। কিন্তু যেই মুহূর্তে সে জেনে যাবে যে তাকে ধরার চেষ্টা করছে কেউ, সে নিশ্চয়ই নিজের মোটিভকে সামনে রাখতে চেষ্টা করবে।

মুখ্যমন্ত্রী – কিন্তু মোটিভ সামনে রাখলে তো সে ধরা পরে যাবে?

আমি – না স্যার, সামান্য খুনি আর সিরিয়াল কিলারের মধ্যে যে এটাই পার্থক্য। সাধারণ খুনি নিজের মোটিভকে লুকিয়ে রাখতে চায়। আর সিরিয়াল কিলার সবসময়ে নিজের মোটিভটাকেই সামনে রাখতে চায়। … আসলে বাবার থেকে যতটা জেনেছি স্যার, সেই অনুযায়ী, একটি সিরিয়াল কিলারের খুন করার দুটি মোটিভ থাকে, প্রথমটি যেই মোটিভটা সে প্রদর্শন করতে চায়, আর দ্বিতীয়, যেটি সে প্রদর্শন করতে চায়না, অর্থাৎ যেটি ব্যক্তিগত মোটিভ। … বাবা বলেন, একবার সিরিয়াল কিলারের পিছনে কেউ পরে গেলে, সিরিয়াল কিলার নিজের সেই মোটিভ, যেটা সে দেখাতে চায়, সেটা দেখানোর জন্য যেই ক্রাইমটা সে সময়ে নিয়ে নিয়ে করতো, এবার সে খুব ফ্রিকুয়েন্ট সেই ক্রাইম করে। … এমন করার কারণ এই যে, যিনি তদন্ত করছেন, তিনি সেই মোটিভে ভিম্রি খেয়ে গিয়ে, তার আসল মোটিভ থেকে, সমানে দূরে চলে যায়। … তাই স্যার যাই এই কেস বাবা নেবেন, তাই আরো খুন হবে। আর সেই চিন্তা করেই, বাবা কেসটা নিতে চাইছেন না।

মুখ্যমন্ত্রী এবার একটু সিটে নিজের শরীরটা এলিয়ে দিলে, মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন – তুই এতো কথা কি করে জানলি, বাবার সাথে তো তোর কথা হয়নি!

আমি – বোধহয় বাবার কেসগুলো নিয়ে এই মাস দেড়েক চর্চা করার ফল এটা। বাবার প্রতিটা কথা যেন আমার কানের কাছে বাজছে।

রথিনকাকাও এবার একটা চেয়ারে বসে পরে বললেন – মিলি তো পুরোপুরি তৈরি হয়ে গেছে! … (মুখ্যন্ত্রির দিকে তাকিয়ে) তবে স্যার, মিলি যেমনটা বলল, বা বলতে পারেন, মিলির মুখ দিয়ে বিজয় যেটা আমাদের বলল, সেটা একদামই সত্যি। এটাই একটা সিরিয়াল কিলারের হিডেন ক্রিমিনাল সাইকোলজি।

আমি আবার বললাম – হ্যাঁ স্যার, বাবা সবসময়েই বলেন সিরিয়াল কিলার সম্পূর্ণ অন্য ধারার খুনি হয়। সমস্ত খুনি সাইকোলজিকালি দুর্বল হয়, কিন্তু সিরিয়াল কিলারের কাছে সাইকোলজিকাল স্টেডিনেশই তার স্ট্রং পয়েন্ট, তাই দুধে অফিসারদেরকেও ঘোল খাইয়ে দেয়।

মুখ্যমন্ত্রী – মিলি, তুমি তো আমাকে উভয় সঙ্কটে ফেলে দিলে! … একদিকে বিজরিয়ার ছেলের মৃত্যুতদন্ত না করলে, কুর্সি ছাড়তে হতে পারার চিন্তা। … অন্যদিকে, যদি এই কেস নিয়ে এগোনো হয়, তবে আরো খুন হলে, আওয়াজ উঠবে যে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা বলে কিছু নেইই। … কি করি এখন!

আমি এবার একটু সংযমী হয়ে বললাম – স্যার, যদি কিছু মনে না করেন কিছু কথা বলতে চাই। … মানে কথাগুলো বাবার থেকেই শিখেছি। কিন্তু আমার মনে হয়, এইখানে এই কথাগুলি আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে। … তাই যদি অনুমতি দেন। … আসলে কথাগুলো অপ্রিয়ও হতে পারে আপনার কাছে।

মুখ্যমন্ত্রী – বিজয়ের কনো কথাই আমার কাছে অপ্রিয় নয় মিলি। হ্যাঁ, বড্ড কড়াপাকের সত্য হয়, ওর কথাগুলো, কিন্তু অস্বীকার করার কনো জায়গা নেই যে ওর প্রতিটি কথা সম্পূর্ণ ভাবে সত্য। … তাই নিশ্চিন্তে বলো।

আমি অভয়লাভ করে বলতে শুরু করলাম – স্যার, এটা ঠিকই যে এই খুনের তদন্ত করতে গেলে, আরো খুন হবে। তবে আপনিও জানেন, বাবা নিশ্চিত ভাবে সফল হবেনই। তবে হ্যাঁ একটু সময় লাগবে এই কেসে। আন্দাজ মত, প্রায় মাস ছয়েক বা সাতেক তো সময় লাগবেই। … হ্যাঁ এটাও ঠিক যে, সেই সময়ের মধ্যে বিরোধীরা আওয়াজ তুলবেই যে, রাজ্যে আইন শৃঙ্খলা বলে কিছু নেই। … তবে স্যার, বাবা বলেন, ভোট জেতার উপায় হলো পুঁজিপতিদের ধনদান। … আর সেটি করবেন বিজরিয়া। …

আমি আবার বললাম – তাই স্যার বিজরিয়াকে এই কথা আপনাকে বোঝাতে হবে যে মাস ছয়েক সময় লাগবে, কিন্তু তিনি যেন পার্টিফান্ডে টাকা দেন। … আর দ্বিতীয় কথা এই যে, বিরোধীদের আওয়াজ যে আইনশৃঙ্খলা নেই, সেই সমস্ত থেমে যাবে যদি, বাবা যখন কেসের মীমাংসা করবেন, সেটা ফলাও করে কাগজে লেখা হয়, বা নিউজে বলা হয়। … তবে স্যার, হঠাৎ করে তো আর ভাইরাল নিউজ হয় না। … তাই স্যার, বিরোধীরা যে কেম্পেনিং করবে যে রাজ্যে আইনশৃঙ্খলা নেই, এতে আপনার ভোটব্যাঙ্কই শক্তিশালী হবে। … অর্থাৎ কথা এই যে, বিরোধীদের এই কেম্পেন রাজ্যের সকল মানুষকে এই কেসের নিষ্পত্তির দিকে আকর্ষিত করে দেবে। আর তারপর নিষ্পত্তির খবর আপনার ব্যবস্থায়নে আইনশৃঙ্খলা যে কতটা শক্তিশালী, তা প্রমাণ করে দেবে।

মুখ্যমন্ত্রী রথিনকাকার দিকে তাকিয়ে বললেন – এই মেয়ে বলে কি? … হ্যাঁ রে মেয়ে, এতো জটিল রাজনীতির অঙ্ক, তুই তোর বাবার থেকে জেনেছিস?

আমি – হ্যাঁ স্যার। যা কিছু শিখেছি, তা তো উনার থেকেই।

মুখ্যমন্ত্রী – হ্যাঁ রে, তোর বাবার রাজনীতিতে ইন্টারেস্ট নেই তো? … যদি রাজনীতিতে বিজয়ের ইন্টারেস্ট থাকে, তাহলে তো আমাদের হাতে হ্যারিকেন! … এই জটিল রাজনীতির অঙ্ক আমাদের বুঝতেই কালঘাম ছুটে গেছে। …

আমি হেসে – না স্যার, বাবার রাজনীতিতে অংশগ্রহণের কনো ইন্টারেস্ট নেই। আপনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।

রথিনকাকার দিকে তাকিয়ে – তাহলে রথিন একটা কাজ করো। বিজয়ের সাথে আলোচনা করে আমাকে দিনটা বলো। আমিও সেদিন বিজরিয়াকে নিয়ে, সিয়াইডি দপ্তরে পৌঁছে যাবো। সেদিন সেখানেই গোলটেবিল বৈঠক করে, সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে যাবে। …

রথিনকাকা – ওকে স্যার।

মা আর আমি উঠে পরলাম। … মুখ্যমন্ত্রী বললেন – আরে, এককাপ চা তো খেয়ে যান!

মা – স্যার, উনি বাড়িতে চা না খেয়ে বসে আছেন। … অন্য একদিন না হয়!

মুখ্যমন্ত্রী – বেশ, এই কেসের নিষ্পত্তির পর, আমার বাড়িতে, তোমাদের সকলের, ইঙ্কলুডিং রথিনের নিমন্ত্রণ রইল, তবে চায়ের নয়, লাঞ্চের। … বিজয়কে বলে দিয়ো কিন্তু।

আমরা উঠে গেলাম। রথিনকাকা আমাদের গাড়িতে তুলে দিলেন, আর তুলতে তুলতে বললেন – আজ মিলি আমাকে চমকে দিয়েছে। পুরোপুরি ভাবে বিজয়ের ঝলক দেখতে পেলাম আজ মিলির মধ্যে। মা কথা না বাড়িয়ে শুধু হাসলেন।

তবে গাড়িতে মা আমাকে বললেন – দেখলি, বাবার কেস অনুসরণ করলে, কেমন হয়ে যায় মানুষ!

আমি – আমি নিজে দেখেও অবাক মা!

বাড়ি এসে বাবাকে সমস্ত কথা বললাম।  বাবা নীরব দর্শকের মত সমস্তটা শুনলেন। শুনে একটু মুচকি হেসে চলে গেলেন জায়গা থেকে। মা রান্নাঘরে চলে গেলেন চা চাপাতে। আমি বাবার পিছনে পিছনে চলে গেলাম, আশা করছিলাম বাবা একটু প্রশংসা করবেন আমার। … কিন্তু কিচ্ছু বললেন না। তাই অগত্যা আমিই বললাম – তুমি কি করে জানলে যে আমি তোমার কাগজগুলো পড়ে ফেলেছি?

বাবা – মাথায় কলুর মত তেল মাখিস, আর দিনরাত মাথা চুলকাস। হাতে তো সবসময়েই নারকেল তেলের চ্যাটচ্যাটে ভাব!

আমি সেই কথা শুনে খবরের কাগজগুলর দিকে এগিয়ে গিয়ে, একটা পেপার হাতে তুলে নিলাম। একটু খতিয়ে দেখতে হলো, তবে নজরে এলো, তেল চ্যাটচ্যাটে আঙুলের হাল্কা ছাপ। … বিস্ময়ে বাবার দিকে তাকালাম। আর মনে মনে বললাম, তুই প্রশংসার আশা করছিলিস! … আর করিস! … মনই উত্তর দিয়ে দিলো – এই মানুষটার সামনে তো কিছুতেই নয়।

রাত্রি নয়টা নাগাদ রথিনকাকুর ফোন এলো বাবার কাছে। হাত দেখিয়ে বাবাকে রিকুয়েস্ট করলাম, ফোনটা লাউডস্পিকারে দেবার জন্য। বাবা স্পিকারে দিলেন। তাই দুইজনেরই কথা বলছি –

রথিনকাকা – বিজয়, আমাকে বলো নি তো, এই কেসটা একটা সিরিয়াল কিলারের কেস!

বাবা – ঘটনাটার বিবৃতি তোমার মুখ থেকে শুনে, আমার কথাগুলো খুব শোনা শোনা লেগেছিল, কিছুতেই কানেক্ট করতে পারছিলাম না। … শেষে, একদিন হঠাৎই মনে পরলো, এমন একটা কেস বছর চারেক আগেও ঘটেছে। … ক্লাস সিক্সের বাচ্চাকে আগে ঘুম পারানো হয়েছে, তারপর গলার নলি কাটা হয়েছে। … ইন্টারেস্টিং কেসের খবরের কাগজ, আমি একটা ডেস্কে স্টোর করে রেখে দিই। … সেখান থেকে হাতরে চারবছর আগের সেই কেসটা খুঁজে পেলাম।

রথিনকাকা – তারপর?

বাবা – তারপর, সেই কেসের ক্ষেত্রে দেখলাম বাচ্চার মৃত্যুর পর, তার একটা আঙুল কাটা হয়েছে। আর তোমার কেসে তিনটে আঙুল। … যদি সিরিয়াল কিলিং কেস হয়, তবে এই দুটোর মাঝেও আরেকটা খুন হতেই হবে, কারণ সিরিয়াল কিলার একটা আঙুল কেটে, তারপরের কেসে তিনটে আঙুল কিছুতেই কাটবেনা। … কিন্তু সেই পেপার আমার কাছে ছিলো না। … তাই, আমার পরিচিত ক্রাইম রিপোর্টারদের ফোন করে করে, খবর নিলাম যে এমন কনো কেস হয়েছে যেখানে ক্লাস সিক্সের বাচ্চা খুন হয়েছে, আর তার দুটো আঙুল কাটা অবস্থায় পাওয়া গেছে লাস! … অখিল বলে একজন অমৃতলালে কাজ করা বন্ধু আমাকে বলল, হ্যাঁ আছে। … দুইদিন পরে, সেই পেপারের একটা কপি খুঁজে আমাকে হস্তান্তর করলো।

রথিনকাকা – তারপর কি হলো?

বাবা – খবরটা পড়তে গিয়ে দেখি, একই ভাবে ক্লাস সিক্সের বাচ্চা, একই ভাবে স্কুল ইউনিফর্ম পরা, ঘুম পারানো হয়েছে, তারপর গলার নলি কেটে খুন করা হয়েছে। আর তার দুটো আঙুল কাটা হয়ে গেছে। অর্থাৎ এটা সিরিয়াল কিলারের কাজ। … কিন্তু আমি এই কেসটাতে এগোতে চাইছিলাম না, কারণ সিরিয়াল কিলার যেই মোটিভ প্রদর্শন করার জন্য খুন করে, সেই মোটিভটা যখন কেউ ধরতে চেষ্টা করে, যতক্ষণ না সেই মোটিভটা সে ধরে ফেলে, ততক্ষণ খুন করতেই থাকে। … তাই চাইছিলাম যাতে আর খুন না হয়, আর তাই এই কেস নিয়ে এগতেই চাইছিলাম না!

রথিনকাকা – তুমি কি ধাতু দিয়ে তৈরি, আমাকে একটু বলবে? … শালা, আমরা এতো পড়াশুনা করে এই চাকরি করি, দিনরাত এই সমস্ত নিয়ে চর্চা করছি, তারপরেও আমাদের মাথায় এইসব আসেনা কেন?

বাবা – সেই কারণেই তো আসেনা। … তোমরা কি একটা কেস নিয়ে ব্যস্ত? না তো। একাধিক কেস নিয়ে চিন্তা হচ্ছে তোমাদের। চলতি কেস ছেড়ে, চার বছর আগে কে, কি করে খুন হয়েছিল, সেই চিন্তা কি করে আসবে!

রথিনকাকা – কিন্তু ভাই বিজয়, এই কেসটা করতেই হবে। … জানি আরো খুন হবে। কিন্তু তাও।

বাবা – পরের বছর নির্বাচন। এমন খুন হলে, আইনশৃঙ্খলার অভাব বলা হবে। তখন মুখ্যমন্ত্রী বিগড়ে যাবেন, নয়তো উনার পার্টির ইনভেস্টাররা বিগড়ে যাবেন। … না না, বুঝতে পারছো না রথিন। … এর অনেক সাইড এফেক্ট।

রথিনকাকা – সেসব তোমার মেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মুখোমুখি বসে, উনার মুখের উপর বলে দিয়েছে। জানো বিজয়, আজ মিলির মধ্যে আমি তোমাকে দেখতে পাচ্ছিলাম। … এক্সিলেন্ট তৈরি হচ্ছে মিলি। … শোনো সেই সমস্ত কথা শুনে, মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন সিয়াইডি দপ্তরে, উনি বিজরিয়াকে নিয়ে আসবেন, আর আমি তুমি মিলি থাকবো। … সেখানে বসে, বিজরিয়াকে বলা হবে, যে আরো খুন হবে, আইনশৃঙ্খলা রাজ্যে নেই, সেইসব স্লোগান উঠবে। তারপরে কি উনি ইনভেস্ট করবেন পার্টিতে? যদি রাজি থাকেন, তবে এই কেস রি-ওপেন করা হবে।

বাবা একটা জোরে নিশ্বাস ফেলে – হুম, সে তো বুঝলাম … কিন্তু অতো গুলো প্রাণ! … ঠিক আছে, বুঝতে পেরেছি। মৃত্যুর দেবী আরো মৃত্যু চাইছেন। আমি তুমি কে হই, উনার ইচ্ছার বিরোধিতা করার! … ঠিক আছে। তুমি মুখ্যমন্ত্রীর সাথে কথা বলে আমাকে জানাও। আমি আর মিলি ভবানীভবন পৌঁছে যাবো। …

রথিনকাকা – আরে তুমি একটা তারিখ তো বলো?

বাবা – আমাদের হাতে কেস না থাকলে আমরা বেকার। … যেদিন, যখন, যেখানে ডাকবে, পৌঁছে যাবো। … বিজরিয়া বড় বিজনেসম্যান, মুখ্যমন্ত্রী হাজার কাজে ব্যস্ত। উনারা যেদিন সময় করবেন, সেদিনই আমি আর মিলি উপস্থিত হয়ে যাবো।

রথিনকাকা – ওকে, আমি কনফার্ম করে, জানাচ্ছি তোমাকে।

বাবা – ঠিক আছে। রাখলাম।

ফোনটা রেখে, আমার দিকে বাবা তাকিয়ে একটা হাসি দিলেন, আর কাছে এগিয়ে এসে বললেন – থ্যাঙ্ক ইউ।

আমি – বাবা, যা কিছু, সব তো তোমার থেকেই!

বাবা – ও তুই বুঝবিনা। … মা বাবার, বা গুরু-গুরুমাতার অন্যের মুখ থেকে নিজের সন্তান বা শিষ্যের গুণগান শুনতে যে কি ভালো লাগে, তোর সেটা এখনো বোঝার সময় হয়নি।

পৃষ্ঠা: 1 2 3 4 5